Class 7 History Chapter 7/ জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি: সুলতানি ও মুঘল যুগ — Best 75+ Complete Q&A Notes. সপ্তম শ্রেণীর ইতিহাস সপ্তম অধ্যায়:

Class 7 History Chapter 7/ জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি: সুলতানি ও মুঘল যুগ  — Best 75+ Complete Q&A Notes. সপ্তম শ্রেণীর ইতিহাস সপ্তম অধ্যায়:

Table of Contents

ভূমিকা:

মধ্যযুগীয় ভারতের ইতিহাস কেবল যুদ্ধবিগ্রহ, রাজবংশের উত্থান-পতন কিংবা রাজনৈতিক টানাপোড়েনের বিবরণ নয়; এটি ছিল ভারতীয় সমাজ, সাহিত্য ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনের অধ্যায়। পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) সপ্তম শ্রেণীর ইতিহাস পাঠ্যবইয়ের সপ্তম অধ্যায়ে সুলতানি ও মুঘল যুগের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

ত্রয়োদশ শতকে ভারতে তুর্কি শাসন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে যে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়, তা অষ্টাদশ শতকের মুঘল সাম্রাজ্যের পতন পর্যন্ত এক বিশাল সামাজিক ও সামাজিক সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে পরিচালিত হয়েছিল। এই দীর্ঘ কালপর্বে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন ঐতিহ্য এবং মধ্য এশীয় ইসলামীয় ভাবধারা—এই দুয়ের মেলবন্ধনে গড়ে উঠেছিল এক সমন্বয়ী ‘ইন্দো-ইসলামীয়’ ধারা, যা তৎকালীন জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতিকে এক অনন্য পরিচিতি দেয়।

এই অধ্যায়ে মূলত তৎকালীন ভারতীয় সমাজের বহুমুখী দিক উন্মোচিত হয়েছে। একদিকে শাসকশ্রেণীর বিলাসবহুল দরবারি আচার-আচরণ ও জীবনযাপন, অন্যদিকে গ্রামীণ ভারতের সাধারণ কৃষক, শ্রমজীবী ও কারিগরদের বাস্তব সংগ্রাম ফুটে উঠেছে। ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রে ভক্তি আন্দোলন এবং সুফি দর্শনের প্রসার মধ্যযুগীয় মানুষের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতিতে এক বৈপ্লবিক আন্দোলন এনেছিল।

শ্রীচৈতন্যদেব, কবীর, গুরু নানক এবং সুফি পিরদের প্রচারিত মানবতাবাদী বার্তা গোঁড়া জাতিভেদ প্রথা দূর করে সমাজে সমতার বার্তা ছড়িয়ে দেয়। একই সাথে বাংলায় অনুবাদ সাহিত্য, মঙ্গলকাব্য এবং বৈষ্ণব পদাবলীর জোয়ার স্থানীয় লোকভাষাকে এক উচ্চ মর্যাদায় আসীন করে। শিল্প ও স্থাপত্যে কুতুবমিনার, তাজমহল, চাহার বাগ ও পিয়েত্রা দুরার ব্যবহার যেমন নান্দনিক উৎকর্ষের পরিচয় দেয়, তেমনই পারসিক চক্র বা চরকার মতো নতুন প্রযুক্তি কৃষি ও বস্ত্রশিল্পকে এক নতুন গতি প্রদান করেছিল। ফলে তৎকালীন মানুষের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি কেবল অতীতের ইতিহাস নয়, বরং আধুনিক ভারতীয় সমাজ ও কৃষ্টির ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি

জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি: ১ নম্বরের অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

১. সুহরাবর্দি সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?

উত্তর: বদরউদ্দিন জাকারিয়া।

২. বাংলায় ভক্তি আন্দোলনের প্রসার কার চেষ্টায় জোরদার হয়?

উত্তর: শ্রীচৈতন্যদেবের চেষ্টায়।

৩. ‘চৈতন্য চরিতামৃত’ গ্রন্থ কে রচনা করেন?

উত্তর: কৃষ্ণদাস কবিরাজ।

৪. ইসলামীয় স্থাপত্যশিল্পের মূল বৈশিষ্ট্য কী ছিল?

উত্তর: খিলান ও গম্বুজের ব্যবহার।

৫. কুতুবমিনার বানানোর কাজ কে শেষ করেন?

উত্তর: সুলতান ইলতুৎমিশ।

৬. শের শাহের সমাধি-সৌধটি কোথায় অবস্থিত?

উত্তর: বিহারের সাসারামে।

৭. সম্রাট জাহাঙ্গিরের আত্মজীবনীর নাম কী?

উত্তর: তুজুক-ই-জাহাঙ্গিরি।

৮. টেরাকোটার কাজ করা মন্দির কোথায় দেখা যায়?

উত্তর: বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরে।

৯. আদিনা মসজিদ কে তৈরি করেন?

উত্তর: সিকান্দার শাহ পাণ্ডুয়ায় আদিনা মসজিদ তৈরি করেন।

১০. গৌড়ের সবচেয়ে বড়ো মসজিদ কোনটি?

উত্তর: বড়োসোনা মসজিদ।

১১. বৈজু বাওরা কে ছিলেন?

উত্তর: বৈজু বাওরা ছিলেন সেই যুগের বিখ্যাত সংগীত শিল্পী।

১২. ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্য কে রচনা করেন?

উত্তর: বড়ু চণ্ডীদাস।

১৩. রামায়ণ ও মহাভারত কারা বাংলায় অনুবাদ করেন?

উত্তর: রামায়ণ বাংলায় অনুবাদ করেন কৃত্তিবাস ওঝা এবং মহাভারত অনুবাদ করেন কাশীরাম দাস।

১৪. হুমায়ুননামা কে রচনা করেন?

উত্তর: ফারসি ভাষায় হুমায়ুননামা রচনা করেন গুলবদন বেগম।

১৫. আবুল ফজল কোন্ কোন্ গ্রন্থ রচনা করেন?

উত্তর: আকবরনামা ও আইন-ই-আকবরি।

১৬. ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’ কে রচনা করেন?

উত্তর: মালাধর বসু।

১৭. কার রচিত কোন্ কাব্যে আলাউদ্দিন খলজির চিতোর অভিযানের কথা রয়েছে?

উত্তর: সৈয়দ আলাওল রচিত পদ্মাবতী কাব্যে।

১৮. ভারতে ‘চরকা’ যন্ত্রটির প্রথম উল্লেখ কোথায় পাওয়া যায়?

উত্তর: ভারতে ‘চরকা’ যন্ত্রের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ইসামির ফুতুহ-উস-সালাতিন গ্রন্থে।

See also  ভূমিরূপ: (Landform) ভূমিরূপের ৩টি প্রধান ধরন ও এদের সৃষ্টির চমৎকার রহস্য:

১৯. ভারতে কবে ‘ব্লক’ ছাপাইয়ের সূচনা হয়?

উত্তর: খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতক থেকে ভারতে ব্লক ছাপাইয়ের সূচনা হয়।

২০. জৌনপুরী রাগ কে তৈরি করেন?

উত্তর: হোসেন শাহ শরকি নিজে সংগীত রাগ তৈরি করেছিলেন, একে হোসেনি বা জৌনপুরী রাগ বলে।

২১. ‘সুফ’ কথার অর্থ কী?

উত্তর: পশমের তৈরি এক টুকরো কাপড়।

২২. অসমে কে ভক্তিবাদের প্রচার করেছিলেন?

উত্তর: শ্রীমন্ত শঙ্করদেব।

২৩. মির্জা নাথান কে ছিলেন?

উত্তর: সম্রাট জাহাঙ্গিরের সেনাপতি।

২৪. বিজাপুরের গোলগম্বুজ কে নির্মাণ করেন?

উত্তর: মহম্মদ আদিল শাহ।

২৫. হাম্পি কোন্ রাজ্যের রাজধানী ছিল?

উত্তর: বিজয়নগর।

২৬. নৃত্যের জন্য ‘কুমিল’ পোশাক কে তৈরি করেন?

উত্তর: মণিপুরের মহারাজা ভাগ্যচন্দ্র।

২৭. রাজতরঙ্গিনী কে রচনা করেন?

উত্তর: কবি কলহন।

২৮. বাবরের আত্মজীবনীর নাম কী?

উত্তর: তুজুক-ই-বাবরি।

২৯. ‘কিতাব-উল-হিন্দ’ গ্রন্থটি কে রচনা করেন?

উত্তর: অল বিরুনি।

৩০. কোথায় প্রথম কাগজ আবিষ্কার হয়?

উত্তর: চিনদেশে।

৩১. ভারতে প্রথম ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা কারা করেন?

উত্তর: ইউরোপীয় মিশনারিরা।

৩২. ‘চরখি’ কী?

উত্তর: তুলো ধুনবার বা বুনবার যন্ত্র।

৩৩. ‘শিরিন কলম’ কার ছদ্মনাম ছিল?

উত্তর: চিত্রশিল্পী খোয়াজা আবদুস সামাদের ছদ্মনাম ছিল শিরিন কলম।

৩৪. কৃষিপণ্যকে ভিত্তি করে কোন্ শিল্প চলত?

উত্তর: কারিগরী শিল্প।

৩৫. মধ্যযুগে সমাজ কীরূপ ছিল?

উত্তর: মধ্যযুগে সমাজ ছিল যৌথ পরিবারভিত্তিক।

৩৬. মধ্যযুগে কোন্ খেলা খুব জনপ্রিয় ছিল?

উত্তর: কুস্তি খুব জনপ্রিয় খেলা ছিল।

৩৭. শিখদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোনটি এবং এটি কোন্ লিপিতে লেখা?

উত্তর: শিখদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থের নাম গুরু গ্রন্থসাহিব। এটি গুরুমুখি লিপিতে লেখা।

৩৮. মীরাবাঈ রচিত অমূল্য সম্পদ কোন্‌গুলি?

উত্তর: মীরাবাঈ রচিত পাঁচশোরও বেশি ভক্তিগীতি, ভারতীয় সংগীত ও সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ।

৩৯. ‘দোহা’ কাকে বলে?

উত্তর: হিন্দি ভাষায় রচিত দুই পংক্তির সংক্ষিপ্ত কবিতাকে বলে দোহা।

৪০. ভারতে চিশতি সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?

উত্তর: মইনউদ্দিন চিশতি।

আরো পড়ুন: Class 8 History Chapter 7 (অষ্টম শ্রেনী ইতিহাস | সপ্তম অধ্যায়) ভারতের জাতীয় আন্দোলনের আদর্শ ও বিবর্তন:

জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি: ২ নম্বরের সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

১. সুলতানি ও মুঘল যুগে কারিগরী শিল্পের ভিত্তি কী ছিল?

উত্তর: সুলতানি ও মুঘল যুগে কৃষিপণ্যকে ভিত্তি করে গ্রামে কারিগরী শিল্প চলত। চিনি এবং নানান সুগন্ধি আতর তৈরির শিল্প ছিল বিখ্যাত। এই শিল্পগুলি বংশগত ছিল, তাই পুরোনো যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেও শিল্পদ্রব্যগুলির মান অসাধারণ হতো।

২. বহলোলি মুদ্রা কী?

উত্তর: বহলোলি মুদ্রা হলো সুলতান বহলোল লোদির আমলে চালু হওয়া এক বিশেষ ধরনের মুদ্রা। সুলতান ইব্রাহিম লোদির রাজত্বকালে জিনিসের দাম খুব সস্তা থাকায়, মাত্র একটি বহলোলি মুদ্রা দিয়ে লোকেরা দশ মণ খাদ্যশস্য, পাঁচ সের তেল এবং দশ গজ মোটা কাপড় কিনতে পারত।

৩. ভক্তিবাদের দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য কী কী?

উত্তর: ভক্তিবাদের দুটি মূল বৈশিষ্ট্য ছিল— ১) ভগবানের কাছে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করা, এবং ২) ঈশ্বরলাভের জন্য জ্ঞান বা যোগ ছেড়ে ভক্তের ভক্তি বা গভীর ভালোবাসাকেই প্রাধান্য দেওয়া।

৪. অলভার ও নায়নার কাদের বলা হতো?

উত্তর: খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকের গোড়ায় দক্ষিণ ভারতে ভক্তি আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। সেখানকার বিষ্ণু ভক্তদের ‘অলভার’ এবং শিব ভক্তদের ‘নায়নার’ (বা নায়নমার) বলা হতো। তাঁরা সরল তামিল ভাষায় নিজেদের ঈশ্বরের প্রতি ভালোবাসা জানাতেন।

৫. প্রশ্ন: গুরু নানক কে ছিলেন?

উত্তর: গুরু নানক (১৪৬৯-১৫৩৮ খ্রি.) ছিলেন মধ্যযুগের অন্যতম প্রধান ভক্তি সাধক। তিনি কোনো ভেদাভেদ না মেনে সব মানুষকে আপন করে নিয়েছিলেন এবং লঙ্গরখানা চালু করেছিলেন। তাঁর দর্শন ও বাণীর উপর ভিত্তি করেই পরবর্তীকালে শিখ ধর্ম গড়ে ওঠে।

৬. কবীর কে ছিলেন?

উত্তর: কবীর ছিলেন পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকের একজন বিখ্যাত ভক্তিসাধক, যিনি বারাণসীতে এক মুসলিম তাঁতি পরিবারে পালিত হন। তিনি সব ধর্ম ও ভগবানকে এক বলে প্রচার করতেন এবং দোহার মাধ্যমে লোক-দেখানো আচারের বিরোধিতা করতেন।

৭. মীরাবাঈ কে ছিলেন?

উত্তর: মীরাবাঈ (১৪৯৮-১৫৪৪ খ্রি.) ছিলেন রাজস্থানের এক ক্ষত্রিয় বংশের কন্যা ও মেওয়ারের শাসককুলের বধূ। তিনি সমস্ত সাংসারিক বন্ধন ত্যাগ করে শ্রীকৃষ্ণ বা গিরিধারীর প্রতি একনিষ্ঠ ভক্তিতে জীবন উৎসর্গ করেন।

৮. সুফি সাধকদের কটি সিলসিলা ভারতে প্রভাবশালী ছিল?

উত্তর: ভারতে সুফি সাধকদের মূলত দুটি গোষ্ঠী বা সিলসিলা খুব প্রভাবশালী ছিল— ১) দিল্লি ও গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চলে ‘চিশতি’ সম্প্রদায়, এবং ২) সিন্ধু, পাঞ্জাব ও মুলতানে ‘সুহরাবর্দি’ সম্প্রদায়।

৯. ‘বা-শরা’ এবং ‘বে-শরা’ সুফি কাদের বলা হতো?

উত্তর: ‘বা-শরা’ বলতে তাদের বোঝাত যারা ইসলামীয় আইন (শরা) মেনে চলত (যেমন: চিশতি ও সুহরাবর্দি)। অন্যদিকে ‘বে-শরা’ বলতে তাদের বোঝাত যারা এই আইন মানত না (যেমন: কালানদার সম্প্রদায়)।

১০. পির ও মুরিদ বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: সুফি সাধনায় ‘পির’ বলতে গুরুকে এবং ‘মুরিদ’ বলতে শিষ্যকে বোঝানো হয়। সুফি সিলসিলার প্রধান ব্যক্তি হতেন একজন পির, যিনি খানকা বা আশ্রমে থেকে তাঁর মুরিদ বা শিষ্যদের ধর্মভাবনা ও দর্শন শিক্ষা দিতেন।

১১. শ্রীচৈতন্য কে ছিলেন?

উত্তর: শ্রীচৈতন্য ছিলেন ষোড়শ শতকের বাংলার একজন শ্রেষ্ঠ সমাজ ও ধর্ম সংস্কারক। তিনি নবদ্বীপে জাত-ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদের বিরুদ্ধে বৈষ্ণব ভক্তি আন্দোলনের প্রচার করেন। তাঁর প্রচারিত সহজ-সরল ভক্তিধর্ম ও নামকীর্তন সমগ্র বাংলায় এক বিপুল সামাজিক জাগরণ তৈরি করেছিল।

১২. নামকীর্তন ও নগরকীর্তনের পার্থক্য কী?

উত্তর: ‘নামকীর্তন’ হলো ঘরে বা একটি নির্দিষ্ট স্থানে বসে ভগবানের নামগান করা। অন্যদিকে ‘নগরকীর্তন’ হলো নগরের পথে পথে শোভাযাত্রা করে ঘুরে ঘুরে নেচে-গেয়ে ভগবানের নাম প্রচার করা।

১৩. শ্রীমন্ত শঙ্করদেব কে ছিলেন?

উত্তর: শ্রীমন্ত শঙ্করদেব ছিলেন উত্তর-পূর্ব ভারতের অসমে ভক্তি আন্দোলনের প্রধান রূপকার। তিনি ছিলেন একেশ্বরবাদী এবং কৃষ্ণের উপাসক। তাঁর প্রচারিত ‘নাম ধর্ম’ ব্রহ্মপুত্র নদের দু-পাড়ে কৃষক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল।

১৪. দীন-ই ইলাহি কী?

উত্তর: দীন-ই ইলাহি কোনো আলাদা নতুন ধর্ম ছিল না। এটি ছিল মুঘল সম্রাট আকবরের প্রতি চূড়ান্ত অনুগত কয়েকজন অভিজাতদের মধ্যে প্রচারিত একটি মতাদর্শ। বিভিন্ন ধর্মের গুরুদের সাথে আলোচনা করে যুক্তিসঙ্গত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে তিনি এই মতাদর্শ তৈরি করেছিলেন।

See also  কৌটিল্যের রাষ্ট্রতত্ত্ব: 5 Genius Principles of Power and Diplomacy.

১৫. সুলতানি আমলের স্থাপত্যের মূল বৈশিষ্ট্য কী ছিল?

উত্তর: সুলতানি আমলের স্থাপত্যে ভারতীয় ও ইসলামীয় শিল্প মিলেমিশে ইন্দো-ইসলামীয় শিল্পরীতি তৈরি হয়। এর মূল বৈশিষ্ট্য ছিল খিলান ও গম্বুজের ব্যবহার। ইঁট ও পাথরের গায়ে চমৎকার সুন্দর কারুকার্য এবং জ্যামিতিক নকশা এই যুগের স্থাপত্যের অন্যতম দিক ছিল।

১৬. কুতুব-চত্বর বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: দিল্লিতে কুতুব মিনার, সুলতান ইলতুৎমিশের সমাধি এবং সুলতান আলাউদ্দিন খলজির তৈরি আলাই দরওয়াজা—এই সমস্ত বিখ্যাত ঐতিহাসিক স্থাপত্যগুলিকে একসঙ্গে ‘কুতুব-চত্বর’ বলা হয়।

১৭. ‘চাহার বাগ’ কী?

উত্তর: মুঘল আমলে বাগান তৈরির একটি বিশেষ রীতি হলো ‘চাহার বাগ’ (চার বাগ)। এই পদ্ধতিতে একটি বাগানকে জল চলাচলের নালা দিয়ে সমান চার ভাগে ভাগ করা হতো। বাবর, জাহাঙ্গির ও শাহ জাহানের আমলে এই ধরণের বাগান খুব জনপ্রিয় ছিল।

১৮. পিয়েত্রা দুরা কী?

উত্তর: মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গিরের আমল থেকে স্থাপত্যের দেওয়ালে শ্বেতপাথরের উপর মূল্যবান রত্ন বসিয়ে যে বিশেষ ধরনের রঙিন কারুকার্য করার চল শুরু হয়, তাকে ‘পিয়েত্রা দুরা’ (Pietra Dura) বলে।

১৯. জোড়-বাংলা এবং চালা-ভিত্তিক মন্দির কী?

উত্তর: বাংলার বৃষ্টির জল যাতে ছাদ থেকে সহজে গড়িয়ে পড়ে, তার জন্য মন্দিরের ছাদ ঢালু করে বাঁকানো হতো, একে চালা বলা হতো। দুটি চালা-ভিত্তিক কাঠামো পাশাপাশি জুড়ে যে মন্দির তৈরি হতো, তাকে ‘জোড়-বাংলা’ মন্দির বলা হয়।

২০. ক্যালিগ্রাফি ও মিনিয়েচার বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: ‘ক্যালিগ্রাফি’ হলো বইয়ের পাতায় অত্যন্ত সুন্দর ও শৈল্পিক অক্ষরে লেখার কলা। অন্যদিকে, ‘মিনিয়েচার’ হলো বইয়ের পাতাকে অলংকৃত করার জন্য আঁকা খুব ছোটো আকারের অণুচিত্র বা ক্ষুদ্র চিত্র।

২১. ‘সবক-ই হিন্দ’ কী?

উত্তর: মধ্যযুগের বিখ্যাত ফারসি সাহিত্যিক ও দার্শনিক আমির খসরু ফারসি কাব্য রচনার ক্ষেত্রে নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এক সম্পূর্ণ নতুন রচনাশৈলী বা স্টাইল আবিষ্কার করেন। এই নতুন ফারসি রচনাশৈলীকেই ‘সবক-ই হিন্দ’ বলা হয়।

২২. মঙ্গলকাব্য কী?

উত্তর: মধ্যযুগে বাংলায় চণ্ডী, মনসা, ধর্মঠাকুর প্রভৃতি লৌকিক দেব-দেবীদের মহিমা প্রচার করে যে কাহিনীমূলক কাব্য রচিত হতো, তাকে মঙ্গলকাব্য বলে। উদাহরণ: চণ্ডীমঙ্গল, মনসামঙ্গল, ধর্মমঙ্গল।

২৩. শিবায়ন কী?

উত্তর: মধ্যযুগে বাংলায় দেবতা শিবকে নিয়ে যে সাহিত্য লেখা হয়েছিল, তাকে ‘শিবায়ন’ বলে। পুরাণের শিবের সাথে বাংলার গরিব কৃষক পরিবারকে মিলিয়ে এই কাব্যগুলি লেখা হয়।

২৪. নাথ সাহিত্য কী?

উত্তর: নাথ-যোগী সম্প্রদায়ের ধর্ম-কর্ম, আচার-আচরণ এবং জীবন দর্শন নিয়ে বাংলায় যে সাহিত্য রচিত হয়েছিল, তাকে নাথ সাহিত্য বলে। এতে সন্ন্যাস-জীবন যাপনের উপর জোর দেওয়া হয়েছে।

২৫. মধ্যযুগে ভারতে কাগজের ব্যবহার কীভাবে শুরু হয়?

উত্তর: খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে চিনে প্রথম কাগজ আবিষ্কৃত হয়। খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ভারতে কাগজ তৈরি করার প্রযুক্তি চিন থেকে প্রথম নিয়ে আসে মধ্য এশিয়ার মোঙ্গলরা। এরপর খুব দ্রুত ভারতে কাগজের ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ে।

২৬. সাকিয়া বা পারসিক চক্র কী?

উত্তর: খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতক নাগাদ পারস্যদেশ থেকে ভারতে আসা ‘সাকিয়া’ বা পারসিক চক্র হলো কাঠের তৈরি একটি সেচ যন্ত্র। এতে বেল্ট ও গিয়ার লাগানো থাকত, যার মাধ্যমে পশুশক্তি ব্যবহার করে কুয়ো বা খাল থেকে সহজে জল তোলা যেত।

২৭. ‘সমা’ কী?

উত্তর: খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে সুফি পিররা ঈশ্বর সাধনার অংশ হিসেবে যে বিশেষ ধরনের আধ্যাত্মিক সুফি কীর্তন বা গানে মেতে উঠতেন, তাকেই ‘সমা’ বলা হতো।

২৮. ‘শিরিন কলম’ কার উপাধি ছিল এবং কেন?

উত্তর: ‘শিরিন কলম’ অর্থাৎ ‘মিষ্টি কলম’ উপাধি ছিল মুঘল চিত্রশিল্পী খোয়াজা আবদুস সামাদের। তাঁর হাতের লেখা এবং আঁকার সূক্ষ্মতা ও সৌন্দর্য এতটাই মধুর ছিল যে তাঁকে এই উপাধি দেওয়া হয়।

২৯. আকবরনামা ও আইন-ই-আকবরি কে রচনা করেন?

উত্তর: মুঘল সম্রাট আকবরের রাজত্বকালের ইতিহাস, প্রশাসন এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে লেখা ‘আকবরনামা’ এবং ‘আইন-ই-আকবরি’ গ্রন্থ দুটি রচনা করেছিলেন বিখ্যাত ঐতিহাসিক আবুল ফজল।

আরো পড়ুন: ভক্তিবাদ ও সুফিবাদ: 10 Inspiring Reform Movements in India.

জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি: ৩ নম্বরের টিকা ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা

১. প্রশ্ন: ভক্তিবাদ ও এর উত্থানের কারণ আলোচনা করো।

উত্তর:

  • ধারণা: ভগবানের প্রতি ভক্তের ভালোবাসা বা ভক্তি হলো ভক্তিবাদের মূল কথা। ভগবানের কাছে আত্মসমর্পণ করা এবং জ্ঞান বা যোগের বদলে ভক্তিকেই প্রাধান্য দেওয়া এর প্রধান বৈশিষ্ট্য।
  • উত্থানের কারণ:
    ১) পুরোনো ধর্মের প্রভাব হ্রাস: ব্রাহ্মণ্য, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের আচার-অনুষ্ঠানের জটিলতার কারণে মানুষের অনীহা তৈরি হয়।
    ২) দক্ষিণ ভারতের আন্দোলন: ৭ম শতকে দক্ষিণ ভারতে অলভার ও নায়নার সাধকদের হাত ধরে আঞ্চলিক ভাষায় ভক্তি আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।
    ৩) সামাজিক পরিবর্তন: ১৩-১৪ শতকে তুর্কি আক্রমণে রাজপুত রাজারা পরাজিত হলে সমাজে ব্রাহ্মণদের প্রভাব কমে যায় এবং কবির, নানক, শ্রীচৈতন্য ও মীরাবাঈয়ের মতো সাধকরা সহজ ভাষায় ধর্ম প্রচার করে ভক্তি আন্দোলনকে গণআন্দোলনে রূপ দেন।

২. প্রশ্ন: কুতুবমিনার ও তাজমহল সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখো।

উত্তর:

  • কুতুবমিনার: তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে জয়লাভের পর কুতুবউদ্দিন আইবক কুয়াত-উল-ইসলাম মসজিদের মিনার হিসেবে কুতুবমিনার নির্মাণ শুরু করেন। পরে সুলতান ইলতুৎমিশ এর কাজ শেষ করেন। এটি সুলতানি শাসনের এক ঐতিহাসিক প্রতীক।
  • তাজমহল: মুঘল সম্রাট শাহজাহানের নির্মিত তাজমহল পৃথিবীর এক আশ্চর্য স্থাপত্য। নিখুঁত গম্বুজ, সুদৃশ্য শ্বেতপাথর এবং দামি রত্ন বসানো ‘পিয়েত্রা দুরা’ কারুকার্যের অতুলনীয় ব্যবহারের জন্য এটি বিশ্বখ্যাত।

৩. প্রশ্ন: মধ্যযুগের ভারতে বস্তুবয়ন ও প্রযুক্তির বিকাশ সম্পর্কে লেখো।

উত্তর:

  • নতুন যন্ত্রের সূচনা: খ্রিস্টীয় ১১ শতকে মধ্য এশিয়া থেকে তুলো বুনবার যন্ত্র ‘চরখি’ এবং ১৩-১৪ শতকে সুতো কাটার ‘চরকা’ প্রযুক্তি ভারতে আসে।
  • প্রযুক্তির বিস্তার ও রপ্তানি: চরকার ব্যবহারের ফলে তুলো থেকে দ্রুত সুতো তৈরি সম্ভব হয়। মধ্যযুগীয় ভারতে কাপড় রং করা ও ব্লক ছাপাইয়ের পদ্ধতি অত্যন্ত উন্নত ছিল। ভারতের তৈরি এই ব্লক ছাপাই কাপড় মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বাজারে ব্যাপক চাহিদা পেত।
See also  উডের ডেসপ্যাচ 1854: 5 Revolutionary Changes in Indian Education.

৪. প্রশ্ন: ধ্রুপদী নৃত্য এবং মণিপুরী নৃত্যধারা সম্পর্কে যা জানো লেখো।

উত্তর:

  • ধ্রুপদী নৃত্যসমূহ: ভারতের প্রধান ধ্রুপদী নৃত্যগুলি হলো ভারতনাট্যম, কথাকলি, ওড়িশি, কুচিপুড়ি, কথক ও মণিপুরী।
  • মণিপুরী নৃত্যধারা: ১৮ শতকে মণিপুরী সংস্কৃতিতে ভক্তিবাদের প্রভাব পড়ে, যার ফলে আদি নৃত্যধারার সঙ্গে সংকীর্তন ও রাসলীলা যুক্ত হয়। মণিপুরের মহারাজা ভাগ্যচন্দ্র এই রাসলীলার বিকাশ ঘটান এবং নাচের বিশেষ পোশাক ‘কুমিল’ তৈরি করেন। সংকীর্তনে ‘পুঙ্গ’ নামক ঢোল বাজিয়ে পুরুষরা নাচ উপস্থাপন করতেন।

জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি: ৫ নম্বরের বিস্তৃত ও ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও উত্তর:

১. প্রশ্ন: মধ্যযুগীয় ভারতে ভক্তিবাদের উত্থানের ঐতিহাসিক পটভূমি এবং এর মূল বৈশিষ্ট্যগুলি বিশদভাবে আলোচনা করো।

উত্তর: মধ্যযুগীয় ভারতের সমাজ ও ধর্মীয় ইতিহাসে ভক্তিবাদ এক অভূতপূর্ব সামাজিক ও আধ্যাত্মিক জাগরণ ফুটিয়ে তুলেছিল।

  • ভক্তিবাদের উত্থানের কারণসমূহ:
    ১) প্রচলিত ধর্মের জটিলতা: ব্রাহ্মণ্য ধর্মের কঠোর বর্ণপ্রথা, স্পর্শকাতরতা এবং অতিরিক্ত আচার-অনুষ্ঠানের চাপে সাধারণ মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের প্রভাব কমে যাওয়ায় মানুষ একটি সহজ ধর্মীয় পথের সন্ধান করছিল।
    ২) দক্ষিণ ভারতের প্রভাব: খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকে দক্ষিণ ভারতে অলভার (বিষ্ণুভক্ত) ও নায়নার (শিবভক্ত) সাধকেরা তামিল ভাষায় সহজ-সরল ভক্তিধর্মের কথা প্রচার করে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করেন।
    ৩) তুর্কি আক্রমণ ও সামাজিক পরিবর্তন: ত্রয়োদশ শতকে তুর্কি আক্রমণে রাজপুত শক্তির পতনের ফলে সমাজে ব্রাহ্মণদের আধিপত্য শিথিল হয়। এর ফলে নিম্নবর্ণের মানুষ নিজস্ব ভাষায় ধর্মভাবনা প্রকাশের সুযোগ পায়।
    ৪) সাধু-সন্তদের ভূমিকা: কবীর, গুরু নানক, শ্রীচৈতন্যদেব, মীরাবাঈ ও শঙ্করদেবের মতো সাধকদের আবির্ভাব এই আন্দোলনকে সর্বভারতীয় রূপ দেয়।
  • ভক্তিবাদের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ:
    ১) ঈশ্বরপ্রেম ও আত্মনিবেদন: জ্ঞানমার্গ বা কঠিন যোগসাধনার বদলে ঈশ্বরলাভের জন্য ভক্তি ও ভালোবাসা প্রকাশই ছিল প্রধান পথ।
    ২) একেশ্বরবাদ: সব ধর্মের ঈশ্বর এক—এই আদর্শ প্রচার করা হতো।
    ৩) সামাজিক সমতা: জাতি-ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে সর্বস্তরের মানুষকে আপন করে নেওয়া হতো।
    ৪) আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার: স্থানীয় ও লোকভাষায় গান ও দোহা রচনার মাধ্যমে ধর্মীয় বার্তা প্রচার করা হতো।

২. প্রশ্ন: মধ্যযুগীয় ভারতীয় সমাজে সুফি আন্দোলনের সূচনা ও প্রসার আলোচনা করো। চিশতি ও সুহরাবর্দি সম্প্রদায়ের মূল পার্থক্যগুলি কী ছিল?

উত্তর: খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতক থেকে ভারতের সমাজ ও সংস্কৃতিতে সুফি সাধকদের গভীর প্রভাব দেখা যায়। মধ্য এশিয়া থেকে আগত সুফিরা মধ্যযুগীয় ভারতের ধর্মীয় সমন্বয়বাদে বড় ভূমিকা নেন।

  • সুফি আন্দোলনের প্রসার:
    সুফিরা অনাড়ম্বর জীবন যাপন করতেন এবং খানকা বা আশ্রমে থেকে পির-মুরিদ সম্পর্কের মাধ্যমে শিষ্যদের শিক্ষা দিতেন। তাঁরা ঈশ্বর সাধনার পথ হিসেবে ‘সমা’ নামক আধ্যাত্মিক সঙ্গীতকে বেছে নিয়েছিলেন। সমাজের দুর্বল ও সাধারণ মানুষের সেবা করে তাঁরা ভারতে দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করেন।

চিশতি ও সুহরাবর্দি সম্প্রদায়ের পার্থক্য:

বৈশিষ্ট্যচিশতি সম্প্রদায়সুহরাবর্দি সম্প্রদায়
অঞ্চলদিল্লি, আজমীর ও গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চলে সক্রিয় ছিল।সিন্ধু, পাঞ্জাব ও মুলতান অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করেছিল।
জীবনযাত্রাচরম দারিদ্র্য ও সাধারণ জীবনযাপনে বিশ্বাসী ছিলেন।সুশৃঙ্খল ও কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনে বিশ্বাসী ছিলেন।
রাষ্ট্রীয় সম্পর্করাজনীতির থেকে দূরে থাকতেন এবং রাজকীয় সাহায্য নিতেন না।সরকারের পদ ও ধনসম্পদ গ্রহণে কোনো আপত্তি ছিল না।
প্রমুখ সাধকখাজা মইনউদ্দিন চিশতি, নিজামউদ্দিন আউলিয়া।শেখ বদরউদ্দিন জাকারিয়া।

৩. প্রশ্ন: বাংলায় শ্রীচৈতন্যদেবের ভক্তি আন্দোলনের স্বরূপ এবং তৎকালীন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে এর প্রভাব ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: ষোড়শ শতকে নবদ্বীপে শ্রীচৈতন্যদেবের নেতৃত্বে যে বৈষ্ণব ভক্তি আন্দোলন গড়ে ওঠে, তা বাংলার সামাজিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়।

  • ভক্তি আন্দোলনের স্বরূপ:
    শ্রীচৈতন্যদেব কোনো নতুন জটিল ধর্মীয় তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেননি। তিনি কৃষ্ণের প্রতি ব্যাকুল ভালোবাসা ও প্রেমকে ধর্মসাধনার প্রধান ভিত্তি হিসেবে ধরেন। তিনি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষকে এক ঈশ্বরের সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
  • সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব:
    ১) জাতিভেদ দূরীকরণ: ব্রাহ্মণ থেকে শুরু করে শূদ্র ও যবন—সবাইকে তিনি কৃষ্ণনামের অধিকারে সমান স্থান দেন।
    ২) কীর্তনের প্রবর্তন: তিনি ‘নামকীর্তন’ এবং শহরের পথে শোভাযাত্রা করে ‘নগরকীর্তন’ চালুর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে এক সূত্রে গাঁথেন।
    ৩) সাহিত্য ও ভাষার বিকাশ: বৈষ্ণব সাহিত্য, পদাবলী সাহিত্য এবং চৈতন্য জীবনীগ্রন্থ (যেমন: চৈতন্য চরিতামৃত, চৈতন্যভাগবত) রচনার মাধ্যমে বাংলা ভাষা অত্যন্ত সমৃদ্ধ হয়।
    ৪) লোকসংস্কৃতির জাগরণ: গান, নৃত্য ও কীর্তনের মেলবন্ধনে বাংলায় লোকসংস্কৃতির এক অভূতপূর্ব জোয়ার আসে।

৪. প্রশ্ন: সুলতানি ও মুঘল স্থাপত্যরীতির প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো। কুতুবমিনার ও তাজমহল কীভাবে এই দুই যুগের শিল্পকলাকে তুলে ধরে?

উত্তর: ভারতবর্ষে তুর্কি ও মুঘল শাসনের সূচনা হলে ভারতীয় ও পারসিক স্থাপত্যশৈলীর মিশ্রণে এক চমৎকার ‘ইন্দো-ইসলামীয়’ স্থাপত্যরীতির বিকাশ ঘটে।

  • স্থাপত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
    ১) ইঁট, পাথর, চুন ও সুরকির সাহায্যে বিশাল খিলান ও ডোম বা গম্বুজ নির্মাণ।
    ২) ইমারতের গায়ে চমৎকার জ্যামিতিক নকশা, ক্যালিগ্রাফি (আরবি ও ফারসি হস্তলিপি) এবং লতাপাতার অলংকরণ।
    ৩) জলপ্রপাত ও নালা বেষ্টিত ‘চাহার বাগ’ এবং মার্বেল পাথরে দামি রত্ন খোদাই করার ‘পিয়েত্রা দুরা’ কৌশলের প্রয়োগ।
  • স্থাপত্যিক নিদর্শন:
  • কুতুবমিনার (সুলতানি যুগ): তরাইনের জয়ের স্মারক হিসেবে কুতুবউদ্দিন আইবক নির্মাণ শুরু করেন এবং ইলতুৎমিশ সম্পন্ন করেন। লাল বেলেপাথরের তৈরি এই মিনারে সুদৃশ্য খোদাই কর্ম ও বেলকোনি রয়েছে, যা সুলতানি শাসনের ক্ষমতার প্রতীক।
  • তাজমহল (মুঘল যুগ): সম্রাট শাহজাহান নির্মিত এই স্মৃতিসৌধটি মুঘল স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম। নিখুঁত গম্বুজ, শুভ্র মার্বেল পাথর, চারকোণে সমমিত মিনার এবং অতুলনীয় পিয়েত্রা দুরা কারুকার্য একে বিশ্বখ্যাত করেছে।

৫. প্রশ্ন: মধ্যযুগীয় ভারতে কৃষি ও কারিগরী প্রযুক্তির অগ্রগতি কীভাবে ঘটেছিল? বিশেষত বস্ত্রশিল্প ও সেচব্যবস্থার পরিবর্তনগুলি আলোচনা করো।

উত্তর: মধ্যযুগে ভারতীয় অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর হলেও কারিগরী শিল্প ও প্রযুক্তিবিদ্যায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছিল।

  • বস্ত্রশিল্প ও কারিগরি প্রযুক্তি:
    ১) চরখি ও চরকা: একাদশ শতকে মধ্য এশিয়া থেকে তুলো ধুনবার যন্ত্র ‘চরখি’ এবং ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতকে তুর্কিদের মাধ্যমে সুতো কাটার ‘চরকা’ ভারতে আসে। এর ফলে দ্রুত সুতো উৎপাদন সম্ভব হয়।
    ২) ব্লক ছাপাই: চতুর্দশ শতক থেকে কাঠের সীল বা ব্লকে নকশা কেটে কাপড়ে রঙ ছাপ দেওয়ার ‘ব্লক ছাপাই’ শিল্প শুরু হয়। ভারতের এই রঞ্জিত ও নকশাদার সুতি বস্ত্র মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে রপ্তানি হতো।
  • সেচব্যবস্থা ও প্রযুক্তি:
    ১) পারসিক চক্র (সাকিয়া): ত্রয়োদশ শতকে পারস্য থেকে বেল্ট ও গিয়ার যুক্ত কাঠের যন্ত্র ‘সাকিয়া’ ভারতে আসে। পশুশক্তি ব্যবহার করে এই চক্রের সাহায্যে গভীর কুয়ো থেকে সহজে সেচের জল তোলা যেত।
    ২) খাল খনন: সুলতান ফিরোজ শাহ তোগলক এবং মুঘল সম্রাটদের আমলে বিস্তৃত ক্যানেল বা খাল খনন করে কৃত্রিম সেচব্যবস্থার উন্নতি ঘটানো হয়।

৬. প্রশ্ন: মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের বিকাশ আলোচনা করো। মঙ্গলকাব্য, অনুবাদ সাহিত্য এবং নাথ সাহিত্যের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: সুলতানি ও মুঘল আমলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং বৈষ্ণব আন্দোলনের প্রভাবে সমৃদ্ধ লাভ করে।

  • বাংলা সাহিত্যের প্রধান ধারাগুলি:
    ১) অনুবাদ সাহিত্য: সাধারণ মানুষের কাছে মহাকাব্য পৌঁছে দিতে স্থানীয় সুলতান ও রাজাদের উদ্যোগে ফারসি ও সংস্কৃত থেকে গ্রন্থ অনুদিত হয়। কৃত্তিবাস ওঝা ‘রামায়ণ’ এবং কাশীরাম দাস ‘মহাভারত’ বাংলায় অনুবাদ করে ঘরে ঘরে জনপ্রিয় করে তোলেন।
    ২) মঙ্গলকাব্য: চণ্ডী, মনসা ও ধর্মঠাকুরের মতো লৌকিক দেব-দেবীদের মাহাত্ম্য প্রচার করে চণ্ডীমঙ্গল, মনসামঙ্গল ইত্যাদি কাব্য রচিত হয়। এই কাব্যগুলিতে তৎকালীন গ্রামীণ সমাজ ও সাধারণ মানুষের জীবনের বাস্তব ছবি ফুটে উঠেছে।
    ৩) নাথ সাহিত্য: নাথ-যোগী সম্প্রদায়ের গুরুভক্তি, সন্ন্যাস জীবন এবং কায়াসাধন কেন্দ্র করে ‘ময়নামতীর কথা’ ও ‘গোপীচন্দ্রের গান’-এর মতো নাথ সাহিত্য রচিত হয়।
    ৪) শিবায়ন: পৌরাণিক শিবকে বাংলার এক গরিব ও অভাবগ্রস্ত কৃষকের রূপে কল্পনা করে ‘শিবায়ন’ কাব্য লেখা হয়।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, সুলতানি ও মুঘল আমলের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি ভারতীয় ইতিহাসকে এক অপরিসীম সমৃদ্ধি দান করেছে। দীর্ঘ কয়েক শতক ধরে বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের একসাথে বসবাস এবং তাদের পারস্পরিক আদান-প্রদান ভারতীয় সংস্কৃতির বহুত্ববাদী রূপটিকে সুদৃঢ় করেছিল। ভক্তি ও সুফি সন্তদের প্রচারিত সমন্বয়বাদী চিন্তা তৎকালীন সমাজের কুসংস্কার ও আভিজাত্যের মানসিকতাকে শিথিল করে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতিতে এক উদারনৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটায়। বিশেষ করে বাংলায় শ্রীচৈতন্যদেবের বৈষ্ণব আন্দোলন এবং লোকসাহিত্যের প্রসার গ্রামীণ মানুষের মননে ও সামাজিক চর্চায় এক স্থায়ী ছাপ রেখে যায়।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত বিপ্লব, যেমন—সেচব্যবস্থার উন্নতি এবং সুতো কাটার টেকসই পদ্ধতি বস্ত্র উৎপাদনকে বহুলাংশে বাড়িয়ে দিয়েছিল, যা কারিগরদের জীবনমানকে প্রভাবিত করে। একই সাথে ইন্দো-ইসলামীয় স্থাপত্যের যে অনন্য উদাহরণ তাজমহল বা ফতেহপুর সিক্রি-তে গড়ে উঠেছিল, তা আজও বিশ্বমঞ্চে ভারতের শিল্পকলা ও স্থাপত্যের প্রধান নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, মধ্যযুগ কেবল স্থবিরতা বা অন্ধকারের যুগ ছিল না; বরং তা ছিল নতুন ভাবনা, শিল্পরীতির বিকাশ এবং মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি র এক ঐতিহাসিক পুনর্জাগরণ। এই অধ্যায়ের তথ্যমূলক জ্ঞান শিক্ষার্থীদের কেবল পরীক্ষার ভালো ফলাফলেই সাহায্য করবে না, বরং নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অনুধাবনেও দারুণ ভূমিকা রাখবে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *