ভূমিকা:
প্রাচীন ভারতের প্রখ্যাত কূটনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আচার্য চাণক্য বা কৌটিল্য তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘অর্থশাস্ত্র’-এ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার জন্য যে অনন্য তত্ত্ব উপস্থাপন করেছেন, তা-ই ইতিহাসে কৌটিল্যের মণ্ডলতত্ত্ব নামে পরিচিত। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভূ-রাজনীতি (Geopolitics) এবং ক্ষমতার ভারসাম্য (Balance of Power) নিয়ে যত আলোচনা হয়, তার একটি অত্যন্ত পরিপক্ক ও বাস্তবসম্মত রূপ হাজার বছর আগেই কৌটিল্য উপস্থাপন করেছিলেন।
প্রাচীন আমলে একটি রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব, নিরাপত্তা এবং সীমান্ত সম্প্রসারণ কীভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব, সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়াই ছিল এই তত্ত্বের মূল উদ্দেশ্য। কৌটিল্যের মণ্ডলতত্ত্ব মূলত প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার রাজনৈতিক সম্পর্ক, শত্রুর শত্রুতা এবং মিত্রতার এক সুনির্দিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র। এই নিবন্ধে আমরা কৌটিল্যের মণ্ডলতত্ত্বের গঠন, এর উপাদান, কূটনীতির বিভিন্ন কৌশল এবং আধুনিক বিশ্বে এর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

কৌটিল্যের মণ্ডলতত্ত্বের মূল ধারণা ও পটভূমি:
‘মণ্ডল’ শব্দের অর্থ হলো বৃত্ত বা চক্র। কৌটিল্যের মণ্ডলতত্ত্ব বলতে বোঝায় ভূ-রাজনৈতিক রাষ্ট্রসমূহের এমন একটি চক্র বা রাজ্যমণ্ডল, যেখানে কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাজা।
কৌটিল্যের মতে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো রাষ্ট্রই চিরস্থায়ী শত্রু বা চিরস্থায়ী মিত্র হতে পারে না। ভৌগোলিক অবস্থানই নির্ধারণ করে দেয় কে কার শত্রু হবে আর কে কার বন্ধু।
- প্রতিবেশী নীতি: কৌটিল্যের মতে, আপনার ভূখণ্ডের লাগোয়া প্রতিবেশী রাষ্ট্রটি স্বাভাবিকভাবেই আপনার প্রধান শত্রু।
- প্রতিবেশীর প্রতিবেশী: আপনার শত্রুর ঠিক পেছনের বা পাশের রাজ্যটি স্বাভাবিক নিয়মে আপনার মিত্র বা বন্ধু রাষ্ট্র।
আরো পড়ুন: কৌটিল্যের রাষ্ট্রতত্ত্ব:
বিজগীষু রাজা: মণ্ডলতত্ত্বের কেন্দ্রবিন্দু:
কৌটিল্যের মণ্ডলতত্ত্বে সমগ্র পররাষ্ট্রনীতির মূল চালিকাশক্তি হলেন ‘বিজগীষু’ (Vijigishu) রাজা।
[বিজগীষু রাজা (কেন্দ্র)] ➔ [রাজ্যমণ্ডলের বিস্তার] ➔ [সর্বভৌমত্ব ও বিশ্বজয়ের লক্ষ্য]
- বিজগীষুর পরিচয়: বিজগীষু শব্দের অর্থ হলো ‘যে রাজা জয়লাভ করতে ইচ্ছুক’।
- গুণাবলী: বিজগীষু রাজাকে হতে হবে বিচক্ষণ, নীতিবান, দূরদর্শী, সামরিক শক্তিতে বলীয়ান এবং সার্বভৌমত্ব বিস্তারে ব্যাকুল।
- লক্ষ্য: রাজ্যমণ্ডলের কেন্দ্রস্থলে অবস্থান করে কূটনীতি, সামরিক শক্তি ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার মাধ্যমে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর ওপর আধিপত্য বিস্তার করা।
রাজ্যমণ্ডলের ১২টি উপাদান (দ্বাদশ রাজমণ্ডল):
কৌটিল্যের মণ্ডলতত্ত্ব অনুযায়ী, রাজ্যমণ্ডল গঠনে মোট ১২টি রাষ্ট্রের ভূমিকা রয়েছে। বিজগীষু রাজাকে কেন্দ্র করে এই ১২টি রাজ্যকে প্রধানত ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়:
বিজগীষু রাজার সামনের দিকের রাজ্যসমূহ (Anteriores):
১. অরি (Ari): বিজগীষু রাজার ঠিক সীমানা সংলগ্ন রাজ্য। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এ রাজ্য বিজগীষুর প্রাকৃতিক শত্রু।
২. মিত্র (Mitra): অরি রাজ্যের পরবর্তী রাজ্য। শত্রুর প্রতিবেশী হওয়ার কারণে এটি বিজগীষু রাজার স্বাভাবিক বন্ধু বা মিত্র।
৩. অরি-মিত্র (Ari-Mitra): মিত্র রাজ্যের পরবর্তী রাজ্য, যা বিজগীষুর মিত্রের শত্রু অর্থাৎ অরি-র বন্ধু।
৪. মিত্র-মিত্র (Mitra-Mitra): অরি-মিত্রের পরের রাজ্য, যা বিজগীষুর মিত্রের মিত্র (পরোক্ষ বন্ধু)।
৫. অরি-মিত্র-মিত্র (Ari-Mitra-Mitra): মিত্র-মিত্রের পরবর্তী রাজ্য, যা বিজগীষুর শত্রুর মিত্রের মিত্র।
বিজগীষু রাজার পেছনের দিকের রাজ্যসমূহ (Posteriores):
৬. পার্ষ্ণিগ্রাহ (Parshnigraha): বিজগীষু রাজার পেছনের সীমানা সংলগ্ন রাজ্য। পেছন থেকে আক্রমণকারী প্রধান শত্রু।
৭. আক্রন্দ (Akranda): পার্ষ্ণিগ্রাহের পেছনের রাজ্য। এটি বিজগীষু রাজাকে পেছন থেকে সাহায্যকারী মিত্র রাষ্ট্র।
৮. পার্ষ্ণিগ্রাহাসার (Parshnigrahasara): আক্রন্দের পেছনের রাজ্য, যা পার্ষ্ণিগ্রাহের (শত্রুর) মিত্র।
৯. আক্রন্দাসার (Akrandasara): পার্ষ্ণিগ্রাহাসারের পেছনের রাজ্য, যা আক্রন্দের (বিজগীষুর মিত্রের) মিত্র।
নিরপেক্ষ ও মধ্যস্থতাকারী রাজ্যসমূহ:
১০. মধ্যম (Madhyama): বিজগীষু ও অরি—উভয় রাজ্যের সীমানা সংলগ্ন শক্তিশালী রাজ্য। এটি উভয়কে সাহায্য করতে পারে আবার উভয়কে প্রতিরোধও করতে পারে।
১১. উদাসীনা (Udasina): রাজ্যমণ্ডলের বাইরে অবস্থিত অত্যন্ত শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ রাজ্য। এটি সাধারণ ঝামেলা থেকে দূরে থাকে তবে প্রয়োজনবোধে যেকোনো রাজ্যকে ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে।
১২. বিজগীষু (Vijigishu): স্বয়ং কেন্দ্রীয় কেন্দ্রবিন্দু রাজ্য।
সপ্তাঙ্গ তত্ত্ব ও রাজ্যমণ্ডলের সম্পর্ক:
আচার্য কৌটিল্য (চাণক্য) তাঁর ‘অর্থশাস্ত্র’ গ্রন্থে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যে কালজয়ী তত্ত্ব উপস্থাপন করেছেন, তা-ই সপ্তাঙ্গ তত্ত্ব (Saptanga Theory) নামে পরিচিত। কৌটিল্য রাষ্ট্রকে একটি জীবন্ত মানবদেহের সাথে তুলনা করেছেন এবং বলেছেন, মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ যেমন পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল, তেমনই একটি রাষ্ট্রকে সচল ও শক্তিশালী রাখতে তার ৭টি অঙ্গ বা উপাদানের সুসংহত সমন্বয় প্রয়োজন।
রাষ্ট্রের ৭টি অঙ্গ (সপ্তাঙ্গ):
| অঙ্গ (Element) | আক্ষরিক অর্থ | মানবদেহের সাথে তুলনা | ভূমিকা ও বৈশিষ্ট্য |
| ১. স্বামী (Swami) | রাজা বা শীর্ষ নেতৃত্ব | মাথা (Head) | রাষ্ট্রের সর্বপ্রধান অভিভাবক। তাকে হতে হবে বুদ্ধিমান, দূরদর্শী, আত্মসংযমী ও প্রজাদরদী। |
| ২. অমাত্য (Amatya) | মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ আমলা | চোখ (Eyes) | নীতি নির্ধারণ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং রাজাকে সঠিক পরামর্শ দেওয়াই এদের মূল দায়িত্ব। |
| ৩. জনপদ (Janapada) | ভূখণ্ড ও জনগণ | পা (Legs) | উর্বর জমি, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং অনুগত নাগরিক—এই তিনটি নিয়ে গঠিত, যা রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। |
| ৪. দুর্গ (Durga) | প্রতিরক্ষা দুর্গ | হাত (Arms) | বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে সীমান্তে সুরক্ষিত দুর্গ স্থাপন। এটি প্রধানত ৪ প্রকার (জল, পর্বত, ধান্ব ও বন দুর্গ)। |
| ৫. কোষ (Kosha) | রাজকোষ ও অর্থ | মুখ (Mouth) | সুসংগঠিত রাজস্ব ব্যবস্থার মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ, যা রাষ্ট্র পরিচালনা ও সংকট মোকাবেলায় ব্যবহৃত হয়। |
| ৬. দণ্ড বা বল (Danda) | সেনাবাহিনী ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা | মস্তিষ্ক/মন (Mind) | সুপ্রশিক্ষিত ও সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনী, যা অভ্যন্তরীণ শান্তি ও বাহ্যিক নিরাপত্তা রক্ষা করে। |
| ৭. মিত্র (Mitra) | সহযোগী বা আন্তর্জাতিক বন্ধু | কান (Ears) | আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও রাজ্যমণ্ডলে সংকটের সময় সাহায্যকারী বিশ্বস্ত বন্ধু রাষ্ট্র। |
সপ্তাঙ্গ তত্ত্বটির মূল তাৎপর্য:
- পরস্পর নির্ভরশীলতা: কৌটিল্যের মতে, এই ৭টি অঙ্গের যেকোনো একটি দুর্বল হয়ে পড়লে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা সংকটের মুখে পড়ে। যেমন—’কোষ’ (অর্থ) ছাড়া ‘দণ্ড’ (সেনাবাহিনী) বজায় রাখা সম্ভব নয়, আবার ‘দুর্গ’ ও ‘দণ্ড’ ছাড়া ‘জনপদ’ সুরক্ষিত থাকে না।
- বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক দর্শন: আদর্শবাদের বদলে কৌটিল্য বাস্তবসম্মত ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে এই নীতি রচনা করেছেন।
- আধুনিক প্রাসঙ্গিকতা: বর্তমান আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানেও রাষ্ট্রের যে ৪টি উপাদান (ভূখণ্ড, জনসংখ্যা, সরকার ও সার্বভৌমত্ব) স্বীকার করা হয়, তার প্রায় সবকটি ভিত্তি হাজার বছর আগেই কৌটিল্যের সপ্তাঙ্গ তত্ত্বে রূপায়িত হয়েছিল।
ষাডগুণ্য নীতি: পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার ৬টি কৌশল:
কৌটিল্যের মণ্ডলতত্ত্ব বাস্তবে প্রয়োগ করার জন্য কৌটিল্য ৬টি প্রধান বৈদেশিক নীতি বা ‘ষাডগুণ্য নীতি’ (Shadgunya Policy) অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছেন:
১. সন্ধি (Sandhi): তুলনামূলক শক্তিশালী শত্রুর সাথে শান্তি চুক্তি বা জোটে আবদ্ধ হওয়া।
২. বিগ্রহ (Vigraha): দুর্বল বা সমকক্ষ শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ বা বৈরিতা ঘোষণা করা।
৩. আসন (Asana): নিরপেক্ষ থাকা বা উপযুক্ত সময়ের জন্য অপেক্ষা করে নিষ্ক্রিয় বসে থাকা।
৪. যান (Yana): সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে শত্রুর দিকে সরাসরি অভিযান বা আক্রমণ চালানো।
৫. সংশ্রয় (Samshraya): নিজের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী কোনো রাজার আশ্রয় গ্রহণ করা।
৬. দ্বৈধীভাব (Dwaidhibhava): একসাথে দ্বিমুখী নীতি গ্রহণ—একজনের সাথে সন্ধি এবং অন্যজনের সাথে বিগ্রহ করা।
উপায় চতুষ্টয়: কূটনীতির ৪টি অস্ত্র:
রাষ্ট্রীয় স্বার্থ উদ্ধারে কৌটিল্য চারটি মৌলিক উপায়ের (Upayas) কথা বলেছেন, যা কৌটিল্যের মণ্ডলতত্ত্ব-এর কূটনীতিকে সফল করে তোলে:
- সাম (Sama): আলোচনা, মিষ্টি কথা, বোঝাপড়া বা অনুনয়-বিনয়ের মাধ্যমে বুঝিয়ে বশ করা।
- দাম (Dama): অর্থ, উপহার, আর্থিক সাহায্য বা উপঢৌকন দিয়ে নিজের পক্ষে আনা।
- ভেদ (Bheda): শত্রু শিবিরের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, বিভেদ বা ফাটল তৈরি করা।
- দণ্ড (Danda): শেষ উপায় হিসেবে প্রত্যক্ষ সামরিক শক্তি, শাস্তি বা যুদ্ধ প্রয়োগ করা।
আধুনিক ভূ-রাজনীতিতে কৌটিল্যের মণ্ডলতত্ত্বের প্রাসঙ্গিকতা:
হাজার বছর পূর্বে রচিত হলেও কৌটিল্যের মণ্ডলতত্ত্ব বর্তমান ২১ শতকের স্নায়ুযুদ্ধ, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
[কৌটিল্যের মণ্ডলতত্ত্ব] ➔ [আধুনিক ক্ষমতার ভারসাম্য (Balance of Power)] ➔ [আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি (Geopolitics)]
- প্রতিবেশী দ্বন্দ্ব ও বিশ্বরাজনীতি: ভারত-চীন সম্পর্ক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া-চীন দ্বন্দ্ব বা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি পর্যালোচনা করলে কৌটিল্যের “প্রতিবেশীর শত্রু হলো বন্ধু” নীতির বাস্তবিক প্রতিফলন স্পষ্ট দেখা যায়।
- জোট রাজনীতি (Alliances): বর্তমানে ন্যাটো (NATO), কোয়াড (QUAD) বা ব্রিকস (BRICS)-এর মতো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জোটগুলোর পেছনে কৌটিল্যের ভারসাম্য নীতির বড় মিল রয়েছে।
- বাস্তববাদ (Realism): আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি বা হ্যান্স মোগেনথু যে রাজনৈতিক বাস্তববাদের কথা বলেছেন, কৌটিল্যের মণ্ডলতত্ত্ব তার চেয়েও প্রাচীন ও ধ্রুপদী ভিত্তি স্থাপন করেছিল।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, কৌটিল্যের মণ্ডলতত্ত্ব কেবল যুদ্ধের নীতি নয়, এটি রাষ্ট্রকে নিরাপদ রাখার এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখার এক দূরদর্শী কূটনৈতিক রূপরেখা। রাজ্যমণ্ডল, দ্বাদশ রাজমণ্ডল এবং ষাডগুণ্য নীতির মাধ্যমে কৌটিল্য প্রমাণ করেছেন যে আন্তর্জাতিক রাজনীতি আবেগ দিয়ে নয়, বরং কৌশল, বাস্তববাদ এবং জাতীয় স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়।
আজকের আধুনিক যুগেও যখন বিশ্বজুড়ে শক্তি প্রদর্শন ও ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্যের লড়াই চলছে, তখন কৌটিল্যের মণ্ডলতত্ত্ব আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের কাছে এক অমূল্য দিশারী হিসেবে কাজ করে। প্রাচীন ভারতের এই অনন্য রাজনৈতিক চিন্তাধারা প্রমাণ করে যে কূটনীতির মূল নির্যাস যুগে যুগে একই থেকে যায়।
আরো পড়ুন: মৌর্য সাম্রাজ্য: Mauryan Empire.
কৌটিল্যের মণ্ডলতত্ত্ব 20 Top FAQ:
১. কৌটিল্য কে ছিলেন?
আচার্য চাণক্য বা কৌটিল্য ছিলেন প্রাচীন ভারতের একজন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ, কূটনীতিবিদ, দার্শনিক ও তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তিনি মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতাও সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন।
২. কৌটিল্যের বিখ্যাত বইটির নাম কী?
কৌটিল্যের রচিত বিখ্যাত কালজয়ী গ্রন্থটির নাম হলো ‘অর্থশাস্ত্র’। এতে রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনীতি, সামরিক কৌশল ও বৈদেশিক নীতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
৩. কৌটিল্যের মণ্ডলতত্ত্ব বলতে কী বোঝায়?
কৌটিল্যের মণ্ডলতত্ত্ব হলো প্রাচীন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ভূ-রাজনীতি পরিচালনার একটি ঐতিহাসিক তত্ত্ব, যেখানে প্রতিবেশীদের রাজনৈতিক অবস্থান ও সম্পর্কের ভিত্তিতে ভূ-রাজনৈতিক চক্র বা রাজ্যমণ্ডল ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
৪. মণ্ডলতত্ত্বে ‘বিজগীষু’ রাজা কে?
বিজগীষু হলেন রাজ্যমণ্ডলের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাজা, যিনি কূটনীতি ও শক্তির মাধ্যমে জয়লাভ করতে এবং সাম্রাজ্য বিস্তার করতে চান।
৫. মণ্ডলতত্ত্বে মোট কয়টি রাজ্যের কথা বলা হয়েছে?
কৌটিল্যের মণ্ডলতত্ত্বে মোট ১২টি রাষ্ট্রের কথা বলা হয়েছে, যা ‘দ্বাদশ রাজমণ্ডল’ নামে পরিচিত।
৬. ‘অরি’ ও ‘মিত্র’ রাজ্য কী?
কৌটিল্যের মতে, বিজগীষু রাজার সরাসরি প্রতিবেশী রাষ্ট্রটি হলো ‘অরি’ (প্রাকৃতিক শত্রু) এবং অরি রাজ্যের পরের রাষ্ট্রটি হলো ‘মিত্র’ (স্বভাবজাত বন্ধু)।
৭. ‘পার্ষ্ণিগ্রাহ’ ও ‘আক্রন্দ’ বলতে কী বোঝায়?
বিজগীষু রাজার ঠিক পেছনের সীমানা সংলগ্ন শত্রু রাষ্ট্রকে পার্ষ্ণিগ্রাহ বলা হয়, আর পার্ষ্ণিগ্রাহের পেছনের বন্ধু রাষ্ট্রকে আক্রন্দ বলা হয়।
৮. কৌটিল্যের ‘ষাটগুণ্য নীতি’ বা ‘ষাডগুণ্য নীতি’ কী?
পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার ৬টি মূল কৌশলকে ষাডগুণ্য নীতি বলা হয়: সন্ধি, বিগ্রহ, আসন, যান, সংশ্রয় এবং দ্বৈধীভাব।
৯. ‘উপায় চতুষ্টয়’ বা ৪টি কূটনৈতিক অস্ত্র কী কী?
কূটনীতিতে সফল হওয়ার ৪টি উপায় হলো: সাম (আলোচনা), দাম (উপহার বা অর্থ), ভেদ (বিভেদ সৃষ্টি), এবং দণ্ড (শাস্তি বা যুদ্ধ)।
১০. রাষ্ট্র পরিচালনার ‘সপ্তাঙ্গ তত্ত্ব’ কী?
রাষ্ট্রের ৭টি প্রধান অঙ্গ: স্বামী (রাজা), অমাত্য (মন্ত্রী), জনপদ (ভূখণ্ড ও প্রজা), দুর্গ (সুরক্ষা), কোষ (অর্থনীতি), দণ্ড (সেনাবাহিনী), এবং মিত্র (সহযোগী)।
১১. মধ্যম ও উদাসীনা রাজ্য বলতে কী বোঝায়?
- মধ্যম: বিজগীষু ও অরি—উভয় রাজ্যের সীমানায় অবস্থিত একটি শক্তিশালী মধ্যস্থতাকারী রাজ্য।
- উদাসীনা: রাজ্যমণ্ডলের বাইরে অবস্থিত অত্যন্ত শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ রাজ্য।
১২. প্রাচীন ভারতের শিল্প ও স্থাপত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য কী ছিল?
পাহাড় কেটে গুহা নির্মাণ (Rock-cut architecture), নিখুঁত একশিলা স্তম্ভ, পোড়ামাটির শিল্প এবং বৈচিত্র্যময় মন্দির নির্মাণ শৈলী।
১৩. ভারতীয় মন্দির স্থাপত্যের ৩টি প্রধান শৈলী কী কী?
- নাগর শৈলী (উত্তর ভারত)
- দ্রাবিড় শৈলী (দক্ষিণ ভারত)
- ভেসর শৈলী (মধ্য ভারত ও ডেকান অঞ্চল)
১৪. সাঁচীর মহাস্তূপ কোন স্থাপত্যের উদাহরণ?
সাঁচীর মহাস্তূপ প্রাচীন ভারতের বৌদ্ধ স্তূপ স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন, যা মূলত মৌর্য ও পরবর্তী রাজাদের আমলে নির্মিত হয়েছিল।
১৫. ভারতের ৩টি প্রধান ভাস্কর্য রীতি কী কী?
- গান্ধার শিল্প (গ্রীক ও রোমান প্রভাবযুক্ত)
- মথুরা শিল্প (লাল বেলেপাথরে নির্মিত)
- অমরাবতী শিল্প (সাদা চুনাপাথরে নির্মিত)
১৬. কৈলাশ মন্দির কেন বিশ্বখ্যাত?
মহারাষ্ট্রের এললোরার কৈলাশ মন্দিরটি (১৬ নম্বর গুহা) একটি একক বিশাল পাহাড় ওপর থেকে নিচে কেটে তৈরি করা বিশ্বের বৃহত্তম একশিলা (Monolithic) মন্দির।
১৭. অজন্তা ও এললোরা গুহার প্রধান পার্থক্য কী?
অজন্তা গুহা মূলত বৌদ্ধ ধর্মের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এবং এর চিত্রকলার (Fresco) জন্য বিখ্যাত। অন্যদিকে, এললোরা গুহায় হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন—তিনটি ধর্মেরই অস্তিত্ব রয়েছে।
১৮. কোন যুগকে প্রাচীন ভারতের শিল্প ও স্থাপত্যের ‘স্বর্ণযুগ’ বলা হয়?
গুপ্ত যুগকে (৪র্থ – ৬ষ্ঠ শতক) প্রাচীন ভারতীয় শিল্প, সাহিত্য ও মন্দির স্থাপত্যের স্বর্ণযুগ বলা হয়।
১৯. চোল স্থাপত্যের সবচেয়ে সেরা নিদর্শন কোনটি?
দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুর তানজোরে অবস্থিত বৃহদীশ্বর মন্দির (যা রাজা রাজরাজ চোল তৈরি করেছিলেন)।
২০. আধুনিক বিশ্বরাজনীতিতে কৌটিল্যের মণ্ডলতত্ত্ব কতটা প্রাসঙ্গিক?
আধুনিক ভূ-রাজনীতিতে “শত্রুর শত্রু বন্ধু” নীতি, আন্তর্জাতিক জোট গঠন (যেমন: NATO, QUAD) এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের (Balance of Power) ক্ষেত্রে কৌটিল্যের নীতি আজও সমানভাবে প্রযোজ্য।