ভূমিকা:
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বা Political Science-এর সমগ্র আলোচনা যাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়, তা হলো ‘রাষ্ট্র’। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক অ্যারিস্টটল থেকে শুরু করে আধুনিক কালের আচরণবাদী রাষ্ট্রবিজ্ঞানী—সবার মতেই, রাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে রাজনৈতিক তত্ত্ব, সমাজ বা নাগরিক জীবনের কোনো ব্যবস্থাপনাই কল্পনা করা অসম্ভব। মানুষের সামাজিক জীবনের এক দীর্ঘ ও জটিল বিবর্তনের মধ্য দিয়ে আদিম পরিবার, গ্রাম ও নগরের সীমানা পেরিয়ে আজকের এই বিশাল ও আধুনিক সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে।
রাষ্ট্র আসলে কী? এর সংজ্ঞা কী? এর উপাদানগুলি কীভাবে একটি মানব সমাজকে রাজনৈতিক সংস্থায় রূপান্তরিত করে? রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে সূক্ষ্ম রেখাটি কোথায়? এবং সমাজ বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংগঠনের চেয়ে রাষ্ট্র কীভাবে আলাদা? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর বিস্তারিত ও নিখুঁতভাবে জানা প্রতিটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীর জন্য আবশ্যক। এই মহানিবন্ধে আমরা রাষ্ট্রের আদি-অন্ত সমস্ত দিক নিয়ে একটি অত্যন্ত গভীর, তথ্যসমৃদ্ধ এবং ছকভিত্তিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করছি।
আরো পড়ুন: বর্ধমান জেলার ইতিহাস
রাষ্ট্র শব্দের উৎপত্তি, বিবর্তন ও ঐতিহাসিক পটভূমি:
শব্দগত উৎপত্তি (Etymological Origin)
‘রাষ্ট্র’ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো ‘State’। এই শব্দটির উৎপত্তি ও বিবর্তনের ইতিহাস অত্যন্ত আকর্ষণীয়:
- Status শব্দ থেকে: বহু রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর মতে, ল্যাটিন শব্দ ‘Status’ থেকে ‘State’ শব্দের উৎপত্তি ঘটেছে। ল্যাটিন ভাষায় ‘Status’ বলতে কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর অবস্থা (Condition) বা গুণবাচক বর্ণনাকে বোঝাতো। পরবর্তীকালে এটি রাজনৈতিক অর্থে কোনো ভূখণ্ডের আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান নির্দেশ করতে ব্যবহৃত হতে শুরু করে।
- Landtag শব্দ থেকে: মধ্যযুগীয় জার্মানিতে এক প্রকার ভূখণ্ডযুক্ত রাজনৈতিক সভাকে বোঝাতে ‘Landtag’ শব্দটি ব্যবহার করা হতো। এর মাধ্যমেও একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের শাসনব্যবস্থা ও ভৌগোলিক রাষ্ট্রের প্রাথমিক রূপরেখা ফুটে উঠত।
ঐতিহাসিক বিবর্তন (Historical Evolution)
রাষ্ট্রের ধারণা একদিনে তৈরি হয়নি। প্রাচীনকাল থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত এর রূপান্তর ঘটেছে ধাপে ধাপে:
- প্রাচীন গ্রিস ও রোমের নগররাষ্ট্র (City-State): খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম বা quarto শতকে প্রাচীন গ্রিস এবং রোমে প্রথম সুসংগঠিত রাজনৈতিক জীবনের বিকাশ ঘটে। গ্রিকরা একে বলত ‘পলিস’ (Polis) এবং রোমানরা বলত ‘সিভিটাস’ (Civitas)। এগুলো ছিল অত্যন্ত ছোট ছোট শহরকেন্দ্রিক রাষ্ট্র বা নগররাষ্ট্র। এদের নিজস্ব আইন, সেনাবাহিনী ও রাজনৈতিক স্বতন্ত্রতা ছিল।
- মধ্যযুগ ও গির্জার দ্বন্দ্ব: মধ্যযুগে ইউরোপে সামন্ততন্ত্রের বিকাশ ঘটে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা রাজা ও রোমান ক্যাথলিক গির্জার (Pope) মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই সময়ে আধুনিক ‘সার্বভৌমত্ব’-এর কোনো অস্তিত্ব ছিল না, কারণ রাজারা গির্জার ইচ্ছার ওপর অনেকখানি নির্ভরশীল ছিলেন।
- ওয়েস্টফেলিয়া শান্তি চুক্তি (১৬৪৮): ১৬৪৮ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপে ঐতিহাসিক ‘ওয়েস্টফেলিয়া শান্তি চুক্তি’ (Peace of Westphalia) স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমেই গির্জার রাজনৈতিক আধিপত্যের অবসান ঘটে এবং ইউরোপে প্রথম ‘ভূখণ্ডভিত্তিক সার্বভৌম জাতীয় রাষ্ট্র’-এর (Territorial Sovereign National State) জন্ম হয়।
ম্যাকিয়াভেলি ও আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণা
আধুনিক রাজনৈতিক তত্ত্বে রাষ্ট্র শব্দটিকে তার বর্তমান রূপে প্রথম প্রতিষ্ঠা করেন আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি (Niccolo Machiavelli)। ১৫১৩ খ্রিস্টাব্দে রচিত এবং পরবর্তীকালে প্রকাশিত তাঁর বিশ্ববিখ্যাত কালজয়ী গ্রন্থ ‘The Prince’-এ তিনি সর্বপ্রথম ইতালীয় শব্দ ‘Stato’-কে আধুনিক রাজনৈতিক অর্থে ব্যবহার করেন। ম্যাকিয়াভেলি ইতালির তৎকালীন চরম রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, পোপের দুর্নীতি এবং অভ্যন্তরীণ যুদ্ধবিগ্রহ দেখে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। তিনি ধর্ম ও নীতিশাস্ত্র থেকে রাজনীতিকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে একটি ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ এবং শক্তিশালী কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র গঠনের কথা বলেন। ‘The Prince’ গ্রন্থে তিনি স্পষ্ট ভাষায় লেখেন:
“All the power which have had and have authority over men are States (Stato) and are either monarchies or republics.”

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্রের সংজ্ঞা:
রাষ্ট্রের কোনো একটি একক সংজ্ঞা সর্বজনগ্রাহ্য নয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আচরণবাদী ডেভিড ইস্টনের মতে, বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদদের দ্বারা রাষ্ট্রের প্রায় ১৪৫টি সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে। এই সংজ্ঞাগুলিকে আমরা প্রধান ৪টি তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভাগ করে আলোচনা করতে পারি:
প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী দৃষ্টিকোণ
প্রাচীন গ্রিক ও রোমান দার্শনিকরা রাষ্ট্রকে একটি নৈতিক ও সামাজিক কল্যাণকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতেন।
- অ্যারিস্টটল (Aristotle): রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক অ্যারিস্টটলের মতে, “রাষ্ট্র হলো স্বাবলম্বী ও পূর্ণাঙ্গ জীবনযাপনের উদ্দেশ্যে সংগঠিত কয়েকটি পরিবার ও গ্রামের সমষ্টি।” অর্থাৎ, মানুষের বৈষয়িক ও আত্মিক প্রয়োজন মেটাতেই রাষ্ট্রের জন্ম।
- সিসিরো (Cicero): বিখ্যাত রোমান দার্শনিক সিসিরোর মতে, “রাষ্ট্র হলো এমন এক সমাজ যেখানে অধিকারবোধ এবং পারস্পরিক সুবিধা ও কল্যাণ সাধনের জন্য অসংখ্য মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়।”
আইনগত ও আইনানুগ দৃষ্টিকোণ (Legalistic Perspective)
আইনগত তাত্ত্বিকরা রাষ্ট্রকে একটি আইনি কাঠামো এবং আইন প্রয়োগকারী সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করেন।
- অধ্যাপক জেমস উইলফোর্ড গার্নার (J.W. Garner): রাষ্ট্রবিজ্ঞানে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বিজ্ঞানসম্মত, নিখুঁত এবং সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা দিয়েছেন অধ্যাপক গার্নার। তাঁর ‘Political Science and Government’ গ্রন্থে তিনি বলেন:”রাষ্ট্র হলো কম-বেশি এমন একটি বৃহৎ বা ক্ষুদ্র জনসমাজ যা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে স্থায়ীভাবে বসবাস করে, যা বহিঃশক্তির নিয়ন্ত্রণ থেকে প্রায় বা সম্পূর্ণ মুক্ত এবং যার একটি সুসংগঠিত সরকার রয়েছে, যে সরকারের প্রতি অধিকাংশ জনসংখ্যা স্বাভাবিক আনুগত্য প্রদর্শন করে।”
- উড্রো উইলসন (Woodrow Wilson): মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী উড্রো উইলসনের মতে, “কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মধ্যে আইন প্রতিষ্ঠার জন্য সুসংগঠিত জনসমষ্টিই হলো রাষ্ট্র।”
- জঁ বোঁদা (Jean Bodin): ফরাসি দার্শনিক বোঁদার মতে, রাষ্ট্র হলো সার্বভৌম ক্ষমতাসম্পন্ন কয়েকটি পরিবারের এবং তাদের সাধারণ বিষয়াবলীর একটি আইনসম্মত শাসনব্যবস্থা।
আদর্শবাদী ও সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ
- ইমানুয়েল কান্ট ও হেগেল (Kant & Hegel): আদর্শবাদী দার্শনিকদের মতে, রাষ্ট্র হলো এক পরম নৈতিক সত্তা। হেগেল রাষ্ট্রকে অতিমানবিক রূপ দিয়ে বলেছেন, “রাষ্ট্র হলো পৃথিবীতে ঈশ্বরের পদচারণা” (State is the march of God on Earth)। তাঁর মতে, রাষ্ট্রের নির্দেশ মানা নাগরিকের পরম ধর্ম।
- হ্যারল্ড লাস্কি (Harold Laski): লাস্কি তাঁর ‘A Grammar of Politics’ গ্রন্থে আধুনিক রাষ্ট্রকে একটি সমাজতাত্ত্বিক ও কল্যাণকামী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্র হলো এমন এক ভৌগোলিক সমাজ যা শাসক ও শাসিত—এই দুই ভাগে বিভক্ত এবং যা তার নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে অন্য সমস্ত প্রতিষ্ঠানের ওপর আধিপত্য দাবি করে।
- ব্লুন্টসলি (Bluntschli): তাঁর মতে, “কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত জনসমষ্টিই হলো রাষ্ট্র।”
মার্কসবাদী দৃষ্টিকোণ (Marxist Perspective)
মার্কসবাদী সমাজতাত্ত্বিকরা রাষ্ট্রকে কোনো পবিত্র বা কল্যাণকামী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখেন না।
- কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস (Marx & Engels): তাঁদের মতে, রাষ্ট্র হলো শ্রেণী শোষণের একটি হাতিয়ার। সমাজে যখন আদিম সাম্যবাদী ব্যবস্থা ভেঙে দাস ও প্রভু—এই দুই শ্রেণীর উৎপত্তি হলো, তখন ধনী শ্রেণী দরিদ্র বা দাস শ্রেণীকে দমন ও শোষণ করার জন্য রাষ্ট্র নামক এই বিশেষ দমনমূলক যন্ত্রটি তৈরি করল।
- ভ্লাদিমির লেনিন (V.I. Lenin): লেনিনের মতে, রাষ্ট্র হলো এক শ্রেণীর দ্বারা অন্য শ্রেণীকে পদানত রাখার এবং শ্রেণী বৈরিতা নিরসনের এক বিশেষ রাজনৈতিক ক্ষমতা বা যন্ত্র।
রাষ্ট্রের সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা:
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে রাষ্ট্রের বহু সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে, তবে সবথেকে বিজ্ঞানসম্মত, নিখুঁত এবং সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞাটি দিয়েছেন প্রখ্যাত মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক জেমস উইলফোর্ড গার্নার (J.W. Garner)।
তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Political Science and Government’-এ তিনি রাষ্ট্রের যে সংজ্ঞা দিয়েছেন, তা নিচে উল্লেখ করা হলো:
“রাষ্ট্র হলো কম-বেশি এমন একটি বৃহৎ বা ক্ষুদ্র জনসমাজ যা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে স্থায়ীভাবে বসবাস করে, যা বহিঃশক্তির নিয়ন্ত্রণ থেকে প্রায় বা সম্পূর্ণ মুক্ত এবং যার একটি সুসংগঠিত সরকার রয়েছে, যে সরকারের প্রতি অধিকাংশ জনসংখ্যা স্বাভাবিক আনুগত্য প্রদর্শন করে।”
কেন এই সংজ্ঞাটি সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য?
অধ্যাপক গার্নারের এই সংজ্ঞাটিকে শ্রেষ্ঠ মনে করার মূল কারণ হলো, এতে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ৪টি মৌলিক উপাদানই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ফুটে উঠেছে:
- জনসমষ্টি (Population): “কম-বেশি এমন একটি বৃহৎ বা ক্ষুদ্র জনসমাজ”—এর মাধ্যমে স্পষ্ট যে রাষ্ট্র গঠনের জন্য মানুষ থাকা বাধ্যতামূলক।
- নির্দিষ্ট ভূখণ্ড (Definite Territory): “যা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে স্থায়ীভাবে বসবাস করে”—যাযাবরদের নির্দিষ্ট স্থান না থাকায় তাদের রাষ্ট্র বলা যায় না, তাই স্থায়ী ভূখণ্ড অপরিহার্য।
- সরকার (Government): “যার একটি সুসংগঠিত সরকার রয়েছে”—জনসমষ্টি ও ভূখণ্ডকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার জন্য একটি শাসন কর্তৃপক্ষ বা সরকার থাকা জরুরি।
- সার্বভৌমত্ব (Sovereignty): “যা বহিঃশক্তির নিয়ন্ত্রণ থেকে প্রায় বা সম্পূর্ণ মুক্ত এবং যার প্রতি জনগণ স্বাভাবিক আনুগত্য প্রদর্শন করে”—এটিই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ও চূড়ান্ত ক্ষমতা (অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক), যা রাষ্ট্রকে অন্য সব প্রতিষ্ঠান থেকে আলাদা করে।
রাষ্ট্রের ৪টি প্রধান বৈশিষ্ট্য বা মৌলিক উপাদান (Essential Elements)
অধ্যাপক গার্নারের সংজ্ঞা এবং আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তত্ত্ব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একটি রাষ্ট্র গঠনে ৪টি মৌলিক বা অপরিহার্য উপাদান প্রয়োজন। এই উপাদানগুলির একটিও যদি বাদ যায়, তবে তাকে আন্তর্জাতিক আইন বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘রাষ্ট্র’ বলা যাবে না।
জনসমষ্টি (Population)
রাষ্ট্র মানুষের জন্য গঠিত একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান; তাই জনসমষ্টি ছাড়া রাষ্ট্র কল্পনা করা যায় না।
- জনসংখ্যা কত হওয়া উচিত? একটি রাষ্ট্রে ঠিক কত জনসংখ্যা থাকবে, তার কোনো অনমনীয় বা নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো তাঁর ‘The Republic’ গ্রন্থে একটি আদেশ রাষ্ট্রের জনসংখ্যা নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন ৫,০৪০ জন। তাঁর ছাত্র অ্যারিস্টটলের মতে, জনসংখ্যা এমন হওয়া উচিত যা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে, আবার শাসনকার্যের সুবিধার জন্য যেন খুব বেশি বড় না হয়। ফরাসি দার্শনিক রুশোর মতে আদর্শ জনসংখ্যা হওয়া উচিত ১০,০০০ জন।
- আধুনিক বাস্তব চিত্র: আধুনিক যুগে প্লেটো বা রুশোর এই ক্ষুদ্র জনসংখ্যার তত্ত্ব অচল। বর্তমানে একদিকে যেমন বিশ্বের বৃহত্তম জনসংখ্যার রাষ্ট্র ভারত এবং চীন রয়েছে যাদের জনসংখ্যা ১৪০ কোটিরও বেশি, তেমনই অন্যদিকে ভ্যাটিকান সিটি বা সান মারিনো-এর মতো অতি ক্ষুদ্র জনসংখ্যার রাষ্ট্রও সগৌরবে টিকে রয়েছে।
- শ্রেণীবিভাগ ও নাগরিকতা: প্রাচীন গ্রিসে রাষ্ট্রের জনসংখ্যাকে তিন ভাগে ভাগ করা হতো— নাগরিক (যাঁদের রাজনৈতিক অধিকার ছিল), মেটিক (যাঁরা বিদেশি ব্যবসায়ী বা পরিযায়ী ছিলেন এবং কোনো political অধিকার পেতেন না) এবং দাস (যাঁরা সম্পূর্ণ অধিকারহীন ও পরবাধীন ছিলেন)। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রে সাধারণত সবাই সমান নাগরিক অধিকার পান এবং দেশের আইন মেনে চলেন।
নির্দিষ্ট ভূখণ্ড (Definite Territory)
জনসমষ্টি থাকলেই হবে না, সেই জনসমষ্টিকে একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে হবে। যাযাবর বা বেদুইনদের জনসংখ্যা ও নিজস্ব দলপতি বা শাসনব্যবস্থা থাকলেও নির্দিষ্ট স্থায়ী ভূখণ্ড না থাকার কারণে তাদের রাষ্ট্র বলা যায় না।
- ভূখণ্ডের সীমানা: ভূখণ্ড বলতে কেবল মাটির উপরিভাগ বা স্থলভাগকে বোঝায় না। এর মধ্যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকে:
- স্থলভাগ: রাষ্ট্রের সীমানার অন্তর্গত সমভূমি, পাহাড়, পর্বত ও দ্বীপপুঞ্জ।
- জলভাগ: রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে অবস্থিত সমস্ত নদী, হ্রদ এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সমুদ্র উপকূল থেকে সাধারণত ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত উপকূলীয় সমুদ্র বা আঞ্চলিক জলসীমা (Territorial Waters)।
- আকাশসীমা: স্থলভাগ ও জলভাগের উপরিভাগে অবস্থিত বায়ুমণ্ডল বা আকাশসীমা, যা মহাকাশের সীমানার নিচ পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে।
- আকার ও আয়তন: জনসংখ্যার মতোই ভূখণ্ডের আয়তনের কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। বিশ্বের বৃহত্তম ভূখণ্ডযুক্ত রাষ্ট্র হলো রাশিয়া (যার আয়তন প্রায় ১ কোটি ৭০ লক্ষ বর্গ কিলোমিটারের বেশি), আবার ক্ষুদ্রতম রাষ্ট্র হলো ভ্যাটিকান সিটি (যার আয়তন মাত্র ৪৪ হেক্টর বা ০.৪৪ বর্গ কিলোমিটার)।
সরকার (Government)
সরকার হলো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংগঠন এবং তার প্রধান মস্তিস্ক বা চালিকাশক্তি। কোনো ভূখণ্ডে মানুষ থাকলেই রাষ্ট্র হয় না, যদি না তাদের শাসন করার জন্য এবং আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য কোনো সুসংগঠিত কর্তৃপক্ষ বা সরকার থাকে। সরকার মূলত তিনটি প্রধান অঙ্গ বা বিভাগের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সমস্ত কাজ পরিচালনা করে:
- আইন বিভাগ (Legislature): দেশের জন্য প্রয়োজনীয় নতুন আইন তৈরি করে এবং পুরনো আইনের সংশোধন করে।
- শাসন বিভাগ (Executive): আইন বিভাগ কর্তৃক পাস হওয়া আইন দেশজুড়ে বলবৎ করে এবং সার্বিক শাসন ও প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করে।
- বিচার বিভাগ (Judiciary): আইনের সঠিক ব্যাখ্যা দেয়, অপরাধীদের শাস্তি দেয় এবং সংবিধান ও নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষা করে।
- সরকারের রূপভেদ: রাষ্ট্রের প্রকৃতি এক হলেও সরকারের প্রকৃতি বিভিন্ন হতে পারে। এটি গণতান্ত্রিক হতে পারে (যেমন ভারত বা ব্রিটেন), একনায়কতান্ত্রিক হতে পারে, আবার রাষ্ট্রপতি শাসিত (যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) বা সংসদীয় শাসনব্যবস্থারও হতে পারে।
সার্বভৌমত্ব (Sovereignty)
সার্বভৌমত্ব হলো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ, চূড়ান্ত, পরম এবং অপ্রতিহত ক্ষমতা। এটিই হলো রাষ্ট্রের প্রাণ বা আত্মা। সার্বভৌমত্বই রাষ্ট্রকে সমাজ, ক্লাব বা অন্যান্য যেকোনো মানবিক প্রতিষ্ঠান থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও উচ্চতর মর্যাদা দেয়। ফরাসি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জঁ বোঁদা এবং পরবর্তীকালে জন অস্টিন এই সার্বভৌমত্ব তত্ত্বের পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সার্বভৌমত্বের দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক বা ডাইমেনশন রয়েছে:
- অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব (Internal Sovereignty): এর অর্থ হলো, রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানার ভেতরে বসবাসকারী সমস্ত ব্যক্তি, নাগরিক, কর্পোরেশন, ক্লাব বা সমিতি রাষ্ট্রের আইনের অধীন। রাষ্ট্র তার অভ্যন্তরে যেকোনো আদেশ দিতে পারে এবং তা অমান্য করলে বলপ্রয়োগ বা শাস্তি দেওয়ার আইনি অধিকার একমাত্র রাষ্ট্রেরই রয়েছে।
- বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব (External Sovereignty): এর অর্থ হলো আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে রাষ্ট্র সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং অন্য কোনো বিদেশি শক্তি বা রাষ্ট্রের অধীন বা বাধ্য নয়। রাষ্ট্র তার পররাষ্ট্র নীতি কীভাবে নির্ধারণ করবে, কার সাথে যুদ্ধ বা চুক্তি করবে—তা রাষ্ট্র সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছায় ঠিক করে।
রাষ্ট্র ও সরকার-এর মধ্যে সম্পর্ক ও পার্থক্য (State vs Government)
সুদূর অতীতে রাষ্ট্র এবং সরকারের মধ্যে কোনো তাত্ত্বিক পার্থক্য করা হতো না। ফরাসি সম্রাট চতুর্দশ লুই সপ্তদশ শতাব্দীতে দম্ভ করে বলেছিলেন, “আমিই রাষ্ট্র” (‘I am the state’). টমাস হব্স তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Leviathan’ (১৬৫১)-এ রাষ্ট্র ও সরকারের ক্ষমতাকে একই সুতোয় বেঁধেছিলেন এবং এদের আলাদা করার বিরোধিতা করেছিলেন।
কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে রাষ্ট্র ও সরকার সম্পূর্ণ দুটি আলাদা প্রত্যয়। অধ্যাপক গেটেলের মতে, “সরকার হলো রাষ্ট্রের একটি সংস্থা বা যন্ত্র (Government is the organisation or machinery of the State)”।
রাষ্ট্র ও সরকারের সম্পর্ক ও পার্থক্য:
| পার্থক্যের বিষয় | রাষ্ট্র | সরকার |
| ১. গাঠনিক স্বরূপ | রাষ্ট্র হলো সমগ্র জনসমষ্টি, ভূখণ্ড, সরকার ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে গঠিত একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক সমাজ। | সরকার হলো রাষ্ট্রের একটি কার্যকরী উপাদান বা প্রসাশনিক অঙ্গ মাত্র। এটি রাষ্ট্রের হয়ে কাজ করে। |
| ২. মূর্ত বনাম বিমূর্ত | রাষ্ট্র একটি তত্ত্বগত ও বিমূর্ত ধারণা (Abstract Concept)। রাষ্ট্রকে চোখে দেখা যায় না বা স্পর্শ করা যায় না। | সরকার হলো বাস্তব ও মূর্ত ধারণা (Concrete Entity)। সরকারি কর্মকর্তা, মন্ত্রী, পুলিশ বা সংসদকে আমরা বাস্তবে দেখতে পারি। |
| ৩. উপাদানের তারতম্য | রাষ্ট্র গঠিত হতে গেলে নির্দিষ্ট ৪টি উপাদানই সমভাবে প্রয়োজন। এর কোনো বিকল্প বা কম-বেশি হতে পারে না। | সরকার হলো রাষ্ট্রের ৪টি উপাদানের মধ্যে একটি মাত্র উপাদান। এর রূপান্তর ও প্রকারভেদ সম্ভব। |
| ৪. জনসংখ্যার পরিধি | রাষ্ট্রের মধ্যে দেশের সমস্ত সাধারণ মানুষ, নাগরিক, শিশু, বৃদ্ধ নির্বিশেষে প্রত্যেকেই রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। | দেশের সব মানুষ সরকারের অংশ নয়। কেবল শাসন, আইন ও বিচার বিভাগের সাথে যুক্ত ব্যক্তিরাই এর অন্তর্ভুক্ত। |
| ৫. সার্বভৌম ক্ষমতা | সার্বভৌম ক্ষমতার প্রকৃত ও একমাত্র মালিক হলো রাষ্ট্র। এই ক্ষমতা পরম ও অবিভাজ্য। | সরকারের নিজস্ব কোনো সার্বভৌম ক্ষমতা নেই। সরকার কেবল রাষ্ট্রের দেওয়া ক্ষমতা সাময়িকভাবে প্রয়োগ করে মাত্র। |
| ৬. স্থায়িত্ব ও নমনীয়তা | রাষ্ট্র একটি স্থায়ী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। একটি রাষ্ট্র সহজে ধ্বংস বা বিলুপ্ত হয় না। | সরকার ক্ষণস্থায়ী এবং পরিবর্তনশীল। প্রতি ৫ বছর অন্তর বা আন্দোলনের মাধ্যমে নিয়মিত সরকার পরিবর্তিত হয়। |
| ৭. নাগরিকের বিরোধিতা | কোনো নাগরিক যদি রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি বা অখণ্ডতাকে অস্বীকার করে, তবে তা ‘দেশদ্রোহিতা’ (Treason) হিসেবে গণ্য হয়। | নাগরিকরা গণতান্ত্রিক উপায়ে সরকারের নীতি, বাজেট বা কাজের তীব্র সমালোচনা ও শান্তিপূর্ণ বিরোধিতা করতে পারে। |
| ৮. সদস্যপদের চরিত্র | রাষ্ট্রের সদস্যপদ বা নাগরিকত্ব জন্মসূত্রে সবার জন্য সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক। | সরকারের অংশ হওয়া কোনো নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। এটি পেশা বা নির্বাচনের ওপর নির্ভর করে। |
রাষ্ট্র ও সমাজ-এর মধ্যে সম্পর্ক ও পার্থক্য (State vs Society)
বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী আর. এম. ম্যাকিভারের মতে, সমাজ মানুষের জীবনের বহু বিচিত্র সম্পর্কের জাল, যা রাষ্ট্র পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ারও সমাজ ও রাষ্ট্রের এই পারস্পরিক স্বতন্ত্রতার কথা বলেছেন। নিচে এদের প্রধান সম্পর্ক ও পার্থক্যগুলো ছকের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
রাষ্ট্র ও সমাজের সম্পর্ক ও পার্থক্য:
| পার্থক্যের বিষয় | সমাজ (Society) | রাষ্ট্র (State) |
| ১. ব্যাপকতা ও পরিধি | পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক; মানুষের সামাজিক, ধর্মীয়, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সমস্ত সম্পর্ক এর অন্তর্ভুক্ত। | পরিধি সুনির্দিষ্ট ও সংকীর্ণ; এটি কেবল মানুষের রাজনৈতিক সম্পর্ক ও বাহ্যিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। |
| ২. ঐতিহাসিক উৎপত্তি | সমাজ মানব সভ্যতার শুরুতেই সৃষ্ট একটি আদি ও প্রাকৃতিক প্রতিষ্ঠান। এটি রাষ্ট্রের চেয়ে অনেক প্রাচীন। | সমাজের বহু যুগ পরে মানুষের সুরক্ষার জন্য গঠিত একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। এটি তুলনামূলকভাবে নতুন। |
| ৩. ভূখণ্ডের আবশ্যকতা | সমাজ গঠনের জন্য কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা বা কঠোর বাউন্ডারির প্রয়োজন নেই (যেমন—বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ধর্মীয় সমাজ)। | নির্দিষ্ট ভূখণ্ড বা ভৌগোলিক সীমানা ছাড়া রাষ্ট্র গঠিত হতেই পারে না। মানচিত্রে এর নির্দিষ্ট বর্ডার থাকা আবশ্যক। |
| ৪. নিয়ন্ত্রণ ও বলপ্রয়োগ | সমাজ চলে প্রথা (Customs), সামাজিক মূল্যবোধ ও লোকাচারের ওপর। সমাজ অমান্য করলে বড়জোর সামাজিক বয়কট বা নিন্দা জোটে। | রাষ্ট্র চলে আইন ও সার্বভৌমত্বের ওপর। রাষ্ট্রের আইন অমান্য করলে পুলিশ, আদালত ও কারাগারের মাধ্যমে শারীরিক বা আর্থিক দণ্ড ভোগ করতে হয়। |
| ৫. সংগঠনের ধরন | সমাজ একটি অনুভূমিক এবং বহুলাংশে অনানুষ্ঠানিক সামাজিক সম্পর্কের জাল, যা মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ইচ্ছায় গড়ে ওঠে। | রাষ্ট্র একটি সম্পূর্ণ আনুষ্ঠানিক, আইনি এবং উচ্চ স্তরের সুসংগঠিত রাজনৈতিক সংগঠন, যা কাঠামোগত নিয়মে চলে। |
রাষ্ট্র ও অন্যান্য মানবিক সংগঠনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য
মানবসমাজে রাষ্ট্রের পাশাপাশি হাজারো রকমের ছোট-বড় অ্যাসোসিয়েশন বা সংগঠন থাকে; যেমন—শ্রমিক ইউনিয়ন, রোটারি ক্লাব, সাহিত্য সভা, ধর্মীয় ট্রাস্ট বা রেডক্রসের মতো আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাকাইভারের মতে, রাষ্ট্রও এক অর্থে একটি সংগঠন, কিন্তু এটি অন্য সব সংগঠনের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা এবং শক্তিশালী।
রাষ্ট্র ও অন্যান্য সংগঠনের পার্থক্য:
| পার্থক্যের বিষয় | রাষ্ট্র (State) | অন্যান্য সংগঠন (Associations) |
| ১. সদস্যপদের প্রকৃতি | রাষ্ট্রের সদস্যপদ বা নাগরিকত্ব জন্মসূত্রে সবার জন্য সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক। | যেকোনো ক্লাব বা সমিতির সদস্যপদ সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক ও স্বেচ্ছাধীন। |
| ২. সার্বভৌম ক্ষমতা | রাষ্ট্র চরম, পরম ও সর্বোচ্চ সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। | কোনো সংগঠনের সার্বভৌম ক্ষমতা নেই, তারা রাষ্ট্রের আইনের অধীনে থেকে কাজ করে। |
| ৩. উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য | রাষ্ট্রের লক্ষ্য ব্যাপক—সমগ্র দেশের নিরাপত্তা, আইন-শৃঙ্খলা ও সর্বজনীন কল্যাণ সাধন। | এদের উদ্দেশ্য সুনির্দিষ্ট ও সীমিত (যেমন—স্পোর্টিং ক্লাবের লক্ষ্য শুধু খেলাধুলার উন্নতি করা)। |
| ৪. শাস্তিমূলক ব্যবস্থা | আইন ভাঙলে রাষ্ট্র জরিমানা, কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দিতে পারে। | নিয়ম ভাঙলে সংগঠন বড়জোর আপনার সদস্যপদ বাতিল করতে পারে, কোনো আইনি বা শারীরিক শাস্তি দিতে পারে না। |
| ৫. সংখ্যার সীমাবদ্ধতা | একজন মানুষ স্বাভাবিকভাবে একসাথে কেবল একটিই রাষ্ট্রের নাগরিক হতে পারে। | একজন মানুষ একই সাথে একাধিক সংগঠনের সদস্য বা যুক্ত হতে পারে। |
| ৬. ভৌগোলিক অবস্থান | রাষ্ট্র একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকে। | অনেক সংগঠন বা অ্যাসোসিয়েশন আন্তর্জাতিক স্তরেও বিস্তৃত হতে পারে (যেমন—রেডক্রস বা ফিফা)। |
সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ (UNO) কি একটি রাষ্ট্র?
২৪শে অক্টোবর ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ (United Nations Organisation) হলো পৃথিবীর বৃহত্তম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংস্থা। এর মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ থামানো এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা।
কেন একে অনেকে রাষ্ট্র ভাবেন?
আপাতদৃষ্টিতে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের কাঠামো একটি রাষ্ট্রের মতোই মনে হয়। যেমন:
- রাষ্ট্রের আইন বিভাগের মতো জাতিপুঞ্জের রয়েছে সাধারণ সভা (General Assembly)।
- শাসন বিভাগের মতো রয়েছে নিরাপত্তা পরিষদ (Security Council)।
- বিচার বিভাগের মতো রয়েছে আন্তর্জাতিক আদালত (International Court of Justice)।
- রাষ্ট্রের সংবিধানের মতো জাতিপুঞ্জের রয়েছে নিজস্ব সনদ বা চার্টার (Charter)।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের চূড়ান্ত মতামত: জাতিপুঞ্জ কেন রাষ্ট্র নয়?
এতসব সাদৃশ্য থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মৌলিক তত্ত্ব অনুযায়ী সম্মিলিত জাতিপুঞ্জকে কোনোভাবেই ‘রাষ্ট্র’ বলা যাবে না। এর পেছনে প্রধান কারণগুলো হলো:
- নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের অভাব: একটি রাষ্ট্রের মতো জাতিপুঞ্জের নিজস্ব কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা বা ভূখণ্ড নেই। আমেরিকার নিউ ইয়র্কে এর সদর দপ্তর থাকলেও তা কোনো নিজস্ব রাষ্ট্রীয় ভূখণ্ড নয়, সেটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাটির ওপর অবস্থিত।
- নিজস্ব কোনো জনসমষ্টি নেই: সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের নিজস্ব কোনো জনসংখ্যা বা নাগরিক নেই। বিশ্বের স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলির নাগরিকরাই জাতিপুঞ্জের পরোক্ষ অংশ। সাধারণ কোনো ব্যক্তি সরাসরি জাতিপুঞ্জের সদস্য হতে পারে না, কেবল স্বাধীন রাষ্ট্রই এর সদস্য হতে পারে।
- সার্বভৌমত্বের অনুপস্থিতি: জাতিপুঞ্জের নিজস্ব কোনো ‘সার্বভৌম ক্ষমতা’ বা Sovereignty নেই। এটি কোনো সদস্য রাষ্ট্রের ওপর নিজের সিদ্ধান্ত জোর করে চাপিয়ে দিতে পারে না। এর সমস্ত সিদ্ধান্ত ও প্রস্তাব সদস্য রাষ্ট্রগুলির পারস্পরিক সম্মতি ও সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল।
- বাধ্যতামূলক নির্দেশনার অভাব: রাষ্ট্রের আইন যেমন দেশের সর্বস্তরের মানুষের ওপর বাধ্যতামূলক, জাতিপুঞ্জের সাধারণ সভার প্রস্তাব বা নির্দেশ সদস্য রাষ্ট্রগুলির ওপর সেভাবে আইনি বাধ্যতামূলক নির্দেশ জারি করতে পারে না।
- সদস্যদের চরিত্র: জাতিপুঞ্জের সনদের ১ নং ধারা অনুযায়ী, এর সমস্ত সদস্য রাষ্ট্রই হলো পরম সার্বভৌম। একটি সার্বভৌম শক্তির ওপরে আরেকটি সার্বভৌম রাষ্ট্র থাকতে পারে না।
- ঐচ্ছিক সদস্যপদ: কোনো দেশের নাগরিকত্ব যেমন ত্যাগের সাধারণ নিয়ম নেই, কিন্তু জাতিপুঞ্জের সদস্যপদ গ্রহণ বা ত্যাগ করা সম্পূর্ণ সদস্য রাষ্ট্রগুলির স্বেচ্ছাধীন বা ঐচ্ছিক বিষয়।
সিদ্ধান্ত: সুতরাং, সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ কোনো রাষ্ট্র বা ‘অতিরাষ্ট্র’ (Ultra-state) নয়; बल्कि এটি হলো বিশ্বের স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলি নিয়ে গঠিত একটি সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক সংস্থা বা রাষ্ট্র-সমবায়।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার বা আসাম কি প্রকৃত রাষ্ট্র?
আমরা সচরাচর খবরের কাগজ বা দৈনন্দিন কথাবার্তায় পশ্চিমবঙ্গ, বিহার বা আসামকে ‘রাজ্য’ বা ইংরেজিতে ‘State’ বলে উল্লেখ করি। তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের নিরিখে এদের কোনোটিই প্রকৃত বা স্বাধীন রাষ্ট্র নয়। কেন নয়, তার সাংবিধানিক ও তাত্ত্বিক কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- সার্বভৌমত্বের অভাব: একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রধান উপাদান হলো সার্বভৌমত্ব। পশ্চিমবঙ্গের নিজস্ব জনসমষ্টি আছে, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড আছে এবং একটি নির্বাচিত সরকারও আছে; কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের কোনো নিজস্ব ‘সার্বভৌম ক্ষমতা’ নেই।
- সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা: ভারতীয় সংবিধানের ১ নং ধারা অনুযায়ী, ভারত হলো একটি “রাজ্যসমূহের ইউনিয়ন” (Union of States)। ভারতের কোনো অঙ্গরাজ্য বা প্রদেশের নিজের ইচ্ছামতো ভারত রাষ্ট্র থেকে আলাদা বা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কোনো আইনি বা সাংবিধানিক অধিকার নেই।
- বাহ্যিক স্বাধীনতার অনুপস্থিতি: আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বা পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ বা ত্রিপুরা সম্পূর্ণ স্বাধীন নয়। ভারত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয় যা সিদ্ধান্ত নেয়, সমস্ত অঙ্গরাজ্য তা মানতে বাধ্য। পশ্চিমবঙ্গ সরকার সরাসরি কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা বা শান্তি চুক্তি করতে পারে না।
- কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও জরুরি অবস্থা: ভারতীয় সংবিধানে এমন কিছু বিশেষ ধারা রয়েছে (যেমন ৩৫৬ ধারা বা রাষ্ট্রপতির শাসন), যার মাধ্যমে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার চাইলে যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো অঙ্গরাজ্যের provincial সরকারকে বরখাস্ত করে সরাসরি শাসনভার নিজের হাতে তুলে নিতে পারে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত: অতএব, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তত্ত্ব অনুযায়ী ‘ভারত’ (India) হলো একমাত্র প্রকৃত সার্বভৌম রাষ্ট্র, আর পশ্চিমবঙ্গ, বিহার বা আসাম হলো সেই বৃহৎ রাষ্ট্রের অন্তর্গত স্বায়ত্তশাসিত প্রশাসনিক অঞ্চল বা প্রদেশ মাত্র।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, রাষ্ট্র হলো মানব সভ্যতার রাজনৈতিক বিকাশের সর্বোচ্চ ও শ্রেষ্ঠ রূপ। একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাসকারী জনসমষ্টি যখন একটি সুসংগঠিত সরকারের মাধ্যমে এবং সার্বভৌম ক্ষমতার আবরণে নিজেদের রাজনৈতিক জীবন পরিচালনা করে, তখনই একটি সফল রাষ্ট্রের জন্ম হয়। আধুনিক বিশ্বায়নের যুগে রাষ্ট্রের চরিত্রে অনেক পরিবর্তন এলেও, সমাজ বা সরকারের চেয়ে রাষ্ট্রের উচ্চতর স্থান এবং তার গুরুত্ব আজও অনস্বীকার্য। আজকের দিনে রাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য হলো কেবল শাসন করা নয়, বরং নাগরিকদের সর্বাঙ্গীন কল্যাণ সাধন বা একটি ‘কল্যাণকর রাষ্ট্র’ (Welfare State) গড়ে তোলা।