ভূমিকা (Introduction)
বিশ্ববক্ষ জুড়ে জীবনের এই যে অদম্য রূপান্তর এবং অবিরাম উপস্থিতি—তার মূল রহস্যটি লুকিয়ে রয়েছে একটি একক শব্দে: “প্রবাহমানতা”। কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবীতে প্রথম প্রাণের বিকাশ ঘটার পর থেকে আজ পর্যন্ত জীবন কিন্তু কখনো থমকে দাঁড়ায়নি। একটি অতি ক্ষুদ্র এককোষী জীব থেকে শুরু করে জটিল বিশালদেহী মানুষ কিংবা বটবৃক্ষ—প্রত্যেকটি জীবই চায় প্রকৃতিতে তার নিজের অস্তিত্ব এবং প্রজাতিকে টিকিয়ে রাখতে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জীব কীভাবে তার বংশধারাকে যুগের পর যুগ ধরে অক্ষুণ্ণ রাখে? ঠিক কীভাবে পিতা-মাতার বৈশিষ্ট্য হুবহু পরিবাহিত হয়ে জন্ম নেয় নতুন একটি শিশু?
এই সমস্ত রহস্যময় এবং বিস্ময়কর জৈবিক প্রশ্নের সহজ ও বিজ্ঞানসম্মত সমাধান মেলে পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) দশম শ্রেণীর জীবন বিজ্ঞান ও পরিবেশ বিষয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়— “জীবনের প্রবাহমানতা” (Continuity of Life)-তে।
জীবনের এই নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহের নেপথ্যে মূল কারিগর হিসেবে কাজ করে মূলত দুটি প্রধান প্রক্রিয়া— কোষ বিভাজন (Cell Division) এবং জনন (Reproduction)। অণুজীবের সরল বিভাজন থেকে শুরু করে উদ্ভিদের পুষ্পায়ন কিংবা মানুষের জটিল বংশগতি—সবকিছুর পেছনেই রয়েছে DNA, ক্রোমোজোম এবং জিনের এক অপূর্ব মেলবন্ধন।
আপনি যদি মাধ্যমিক পরীক্ষা (Madhyamik Exam)-এর প্রস্তুতি নিচ্ছেন এমন একজন শিক্ষার্থী হন, তবে এই অধ্যায়টি আপনার সিলেবাসের অন্যতম সর্বোচ্চ নম্বর বহনকারী এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। এই আর্টিকেলে আমরা ‘জীবনের প্রবাহমানতা’ অধ্যায়ের প্রতিটি বিষয়—ক্রোমোজোমের সূক্ষ্ম গঠন, কোষ চক্র, মাইটোসিস ও মিয়োসিসের তুলনামূলক পার্থক্য, বিভিন্ন প্রকার জনন পদ্ধতি এবং সপুষ্পক উদ্ভিদের জীবনচক্র নিয়ে এমনভাবে সহজ ভাষায় আলোচনা করেছি, যাতে বিষয়টি আপনার কাছে একদম পরিষ্কার হয়ে যায়।

আরো পড়ুন: হরমোন;
কোষ বিভাজন এবং ক্রোমোজোম (Cell Division and Chromosom):
জীবদেহের বৃদ্ধি, ক্ষয়পূরণ এবং বংশবৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি হলো কোষ বিভাজন। আর এই কোষ বিভাজনের সময় নিউক্লিয়াসের ভেতর যে গঠনটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তা হলো ক্রোমোজোম।
ক্রোমোজোম, DNA এবং জিন-এর সম্পর্ক:
- DNA (Deoxyribonucleic Acid): বংশগতির ধারক ও বাহক। এটি ক্ষারীয় প্রোটিনের (হিস্টোন) সাথে পেঁচিয়ে অত্যন্ত ঘনীভূত হয়ে ক্রোমোজোম গঠন করে।
- জিন (Gene): DNA-র নির্দিষ্ট অংশ যা নির্দিষ্ট কোনো জৈবিক বৈশিষ্ট্য প্রকাশের নির্দেশ দেয়।
- ক্রোমোজোম: কোষের নিউক্লিয়াসে অবস্থিত ক্রোমাটিন জালিকা থেকে উৎপন্ন পেঁচানো সূতোর মতো অংশ, যা বংশগত বৈশিষ্ট্য বহন করে।
এক নজরে সম্পর্ক: DNA + Histone Protein — Chromatin Network — Chromosome Gene (DNA-র অংশ)
ক্রোমোজোমের প্রকারভেদ:
মানবদেহে মোট ৪৬টি (২৩ জোড়া) ক্রোমোজোম থাকে। কাজ অনুযায়ী এদের দুটি ভাগে ভাগ করা হয়:
| ক্রোমোজোমের ধরন | সংখ্যা | কাজ |
|---|---|---|
| অটোজোম (Autosome) | ৪৪টি (২২ জোড়া) | দেহের দৈহিক বৈশিষ্ট্য (যেমন: গায়ের রঙ, উচ্চতা) নির্ধারণ করে। |
| সেক্স ক্রোমোজোম বা অ্যালোজোম (Sex Chromosome) | ২টি (১ জোড়া) | জীবের লিঙ্গ (স্ত্রী বা পুরুষ) নির্ধারণ করে। (পুরুষে XY, স্ত্রীতে XX) |
ক্রোমোজোমের ভৌত গঠন:
একটি আদর্শ মেটাফেজ ক্রোমোজোমের প্রধান অংশগুলি হলো:
- ক্রোমাটিড (Chromatid): লম্বালম্বিভাবে বিস্তৃত দুটি সূক্ষ্ম সূত্রক।
- সেন্টিওমিয়ার (Centromere): ক্রোমোজোমের প্রাথমিক খাঁজ, যেখানে দুটি ক্রোমাটিড যুক্ত থাকে।
- কাইনেটোফোর (Kinetochore): সেন্ট্রোমিয়ারে অবস্থিত প্রোটিন নির্মিত অংশ, যা কোষ বিভাজনের সময় বেমতন্তুযুক্ত হতে সাহায্য করে।
- গৌণ খাঁজ (Secondary Constriction): সেন্ট্রোমিয়ার ছাড়াও ক্রোমোজোমে উপস্থিত অতিরিক্ত খাঁজ। একে ‘NOR’ (Nucleolar Organizer Region)-ও বলা হয়।
- স্যাটেলাইট (Satellite): গৌণ খাঁজের পরবর্তী গোলকাকার অংশযুক্ত ক্রোমোজোমকে স্যাট-ক্রোমোজোম বলে।
- টেলোমিয়ার (Telomere): ক্রোমোজোমের দুটি প্রান্তভাগ, যা দুটি ক্রোমোজোমকে জোড়া লাগতে বাধা দেয়।
কোষ বিভাজন (Cell Division):
যে প্রক্রিয়ায় একটি মাতৃকোষ বিভক্ত হয়ে দুটি বা চারটিতে অপত্য কোষ গঠন করে, তাকে কোষ বিভাজন বলে।
কোষ বিভাজনের প্রকারভেদ:
কোষ বিভাজন মূলত তিন প্রকার:
- অ্যামাইটোসিস (Amitosis): পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ বিভাজন (যেমন: অ্যামিবা, ইস্ট)।
- মাইটোসিস (Mitosis): সমবিভাজন (যেমন: উদ্ভিদের ভাজক কলা, প্রাণীর দৈহিক কোষ)।
- মিয়োসিস (Meiosis): হ্রাসবিভাজন (যেমন: জনন মাতৃকোষ)।
অ্যামাইটোসিস, মাইটোসিস ও মিয়োসিসের তুলনা:
| বৈশিষ্ট্য | অ্যামাইটোসিস | মাইটোসিস | মিয়োসিস |
|---|---|---|---|
| সংগঠন স্থান | এককোষী জীব (অ্যামিবা, ব্যাকটেরিয়া) | দেহাঙ্গ/দেহকোষ (Somatic cell) | জনন মাতৃকোষ (Germ cell) |
| বেমতন্তু গঠন | গঠিত হয় না | গঠিত হয় | গঠিত হয় |
| ক্রোমোজোম বিভাজন | নিউক্লিয়াস সরাসরি খাঁজ সৃষ্টি করে বিভক্ত হয় | একবার বিভক্ত হয় | দুবার বিভক্ত হয় |
| অপত্য কোষের সংখ্যা | ২টি | ২টি | ৪টি |
| ক্রোমোজোম সংখ্যা | মাতৃকোষের সমান থাকে | মাতৃকোষের সমান ($2n \rightarrow 2n$) | মাতৃকোষের অর্ধেক ($2n \rightarrow n$) |
মাইটোসিস কোষ বিভাজনের দশাসমূহ:
মাইটোসিস কোষ বিভাজন মূলত দুটি ধাপে সম্পন্ন হয়:
- কেরিওকাইনেসিস (Karyokinesis): নিউক্লিয়াসের বিভাজন।
- সাইটোকাইনেসিস (Cytokinesis): সাইটোপ্লাজমের বিভাজন।
কেরিওকাইনেসিসের ৪টি দশা:
- প্রোফেজ (Prophase):
- জল বিয়োজনের মাধ্যমে ক্রোমাটিন জালিকা ঘনীভূত হয়ে স্পষ্ট ক্রোমোজোমে পরিণত হয়।
- নিউক্লিওলাস ও নিউক্লীয় পর্দা ধীরে ধীরে অদৃশ্য হতে থাকে।
- মেটাফেজ (Metaphase):
- নিউক্লীয় পর্দা সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়।
- বেমতন্তু (Spindle fibre) গঠিত হয় এবং ক্রোমোজোমগুলি কোষের বিষুব অঞ্চলে (Equatorial plane) অবস্থান করে।
- অ্যানাফেজ (Anaphase):
- সেন্ট্রোমিয়ার দ্বিখণ্ডিত হয় এবং বোন-ক্রোমাটিডগুলি দুটি বিপরীত মেরুর দিকে যাত্রা করে (অ্যানাফেজিক চলন)।
- ক্রোমোজোমগুলি V, L, J, I-এর মতো আকার ধারণ করে।
- টেলোফেজ (Telophase):
- জল যোজনের মাধ্যমে ক্রোমোজোমগুলি আবার অদৃশ্য ক্রোমাটিন জালিকায় পরিণত হয়।
- নতুন নিউক্লিওলাস ও নিউক্লীয় পর্দার পুনরাবির্ভাব ঘটে।
কোষ চক্র (Cell Cycle):
একটি কোষের সৃষ্টি থেকে শুরু করে পরবর্তী বিভাজনের শেষ পর্যন্ত যে সমস্ত ধারাবাহিক পরিবর্তন ঘটে, তাকে কোষ চক্র বলে।
কোষ চক্রের দশাসমূহ:
- ইন্টারফেজ (Interphase): প্রস্তুতিমূলক দশা (G_1, S, এবং G_2 দশা নিয়ে গঠিত)।
- G_1 Phase: RNA ও প্রোটিন সংশ্লেষ।
- S Phase: DNA রেপ্লিকেশন বা দ্বিগুণ হওয়া।
- G_2 Phase: বিভাজনের প্রয়োজনীয় অন্যান্য উপাদান প্রস্তুত হওয়া।
- M-Phase (Mitotic Phase): আসল বিভাজন দশা (প্রোফেজ, মেটাফেজ, অ্যানাফেজ, টেলোফেজ)।
নোট: কোষ চক্রের অনিয়ন্ত্রিত বিভাজনের ফলে টিউমার সৃষ্টি হয়, যা থেকে ক্যান্সার রোগ হতে পারে।
জনন (Reproduction):
যে প্রক্রিয়ায় কোনো জীব নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখতে এবং বংশবৃদ্ধি করতে নিজের মতো অপত্য জীব সৃষ্টি করে, তাকে জনন বলে।
জননের প্রকারভেদ:
জনন মূলত চার প্রকার:
- অযৌন জনন (Asexual Reproduction): রেনু উৎপাদন বা বিভাজনের মাধ্যমে ঘটে (একক জনক প্রয়োজন)।
- যৌন জনন (Sexual Reproduction): পুং ও স্ত্রী গ্যামেটের মিলনে (নিষেক) ঘটে।
- অঙ্গজ জনন (Vegetative Reproduction): উদ্ভিদের অঙ্গের মাধ্যমে অপত্য জীব সৃষ্টি।
- অপত্য জনন বা পার্থেনোজেনেসিস (Parthenogenesis): নিষেক ছাড়াই অনিষিক্ত ডিম্বাণু থেকে সরাসরি অপত্য সৃষ্টি।
জনন পদ্ধতির সংক্ষিপ্ত সারণী:
| জননের প্রকার | প্রধান মাধ্যম / পদ্ধতি | উদাহরণ |
|---|---|---|
| অযৌন জনন | দ্বি-বিভাজন, খণ্ডভবন, কোরকোদগম, রেনু উৎপাদন | অ্যামিবা, স্পাইরোগাইরা, ইস্ট, মিউকর |
| অঙ্গজ জনন | কাণ্ড, পাতা, মূল (প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম পদ্ধতি) | আলু, পাথরকুচি, কলম করা গাছ |
| যৌন জনন | আইসোগ্যামি, অ্যানাইসোগ্যামি, ওগ্যামি | মানুষ, সপুষ্পক উদ্ভিদ |
সপুষ্পক উদ্ভিদের যৌন জনন ও জীবনচক্র:
সপুষ্পক উদ্ভিদের (Angiosperms) প্রধান জনন অঙ্গ হলো ফুল।
একটি আদর্শ ফুলের বিভিন্ন অংশ:
- বৃত্তি (Calyx): ফুলের বাইরের সবুজ অংশ, যা কুঁড়িকে রক্ষা করে।
- দলমন্ডল (Corolla): বর্ণময় পাপড়ি, যা পতঙ্গকে আকর্ষণ করে।
- পুংস্তবক (Androecium): পরাগরেণু তৈরি করে (পুং গ্যামেট)।
- স্ত্রীস্তবক (Gynoecium): গর্ভাশয় বা ডিম্বাশয় থাকে, যেখানে ডিম্বাণু উৎপন্ন হয়।
দ্বি-নিষেক (Double Fertilization):
সপুষ্পক উদ্ভিদের ক্ষেত্রে দুটি পুং-গ্যামেটের একটি ডিম্বাণুকে (n) নিষিক্ত করে জাইগোট (2n) গঠন করে এবং অপর পুং-গ্যামেটটি নির্ণীত নিউক্লিয়াসকে (2n) নিষিক্ত করে শস্য নিউক্লিয়াস (3n) গঠন করে। একে দ্বি-নিষেক বলে।
পুরানুর ক্রম বা পুরানুপর্যায় (Alternation of Generations):
জীবের জীবনচক্রে হ্যাপ্লয়েড (n) এবং ডিপ্লয়েড (2n) দশার পর্যায়ক্রমিক আবর্তনকে জনুক্রম বা জনুপর্যায় বলে।
- রেণুধর দশা (2n): ডিপ্লয়েড দশা।
- লিঙ্গধর দশা (n): হ্যাপ্লয়েড দশা।
ফার্ন এবং সপুষ্পক উদ্ভিদে স্পষ্ট জনুক্রম লক্ষ্য করা যায়।
আরো পড়ুন: জীবজগতের সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণ;
জীবনের প্রবাহমানতা: MCQ (বহুনির্বাচনী প্রশ্ন ও উত্তর)
- মানুষের দেহকোষে অটোজোমের সংখ্যা কত?
- (ক) ৪৬টি
- (খ) ৪৪টি
- (গ) ২৩টি
- (ঘ) ২টি
- উত্তর: (খ) ৪৪টি (২২ জোড়া)
- DNA-এর গঠনগত ও কার্যগত একক কোনটি?
- (ক) ক্রোমাটিড
- (খ) নিউক্লিওসাইড
- (গ) নিউক্লিওটাইড
- (ঘ) জিন
- উত্তর: (গ) নিউক্লিওটাইড
- ক্রোমোজোমের যে নির্দিষ্ট স্থানে জিন অবস্থান করে, তাকে কী বলে?
- (ক) সেন্ট্রোমিয়ার
- (খ) লোকাস
- (গ) কাইনেটোফোর
- (ঘ) টেলোমিয়ার
- উত্তর: (খ) লোকাস
- কোষ বিভাজনের কোন দশায় ক্রোমোজোমগুলি বিষুব অঞ্চলে বিন্যস্ত থাকে?
- (ক) প্রোফেজ
- (খ) মেটাফেজ
- (গ) অ্যানাফেজ
- (ঘ) টেলোফেজ
- উত্তর: (খ) মেটাফেজ
- উদ্ভিদকোষের বিভাজনের সময় বেমতন্তু তৈরিতে সাহায্য করে কোনটি?
- (ক) সেন্ট্রোসোম
- (খ) সাইটোপ্লাজীয় অনুণালিকা (Microtubules)
- (গ) গলগি বডি
- (ঘ) রাইবোজোম
- উত্তর: (খ) সাইটোপ্লাজীয় অনুণালিকা
- কোষ চক্রের কোন দশায় DNA সংশ্লেষ বা রেপ্লিকেশন ঘটে?
- (ক) G_1 দশা
- (খ) S দশা
- (গ) G_2 দশা
- (ঘ) M দশা
- উত্তর: (খ) S দশা
- নীচের কোনটি ক্ষারীয় প্রোটিন হিস্টোনে অনুপস্থিত থাকে?
- (ক) লাইসিন
- (খ) আর্জিনিন
- (গ) ট্রিপটোফ্যান
- (ঘ) হিস্টিডিন
- উত্তর: (গ) ট্রিপটোফ্যান
- অ্যানাফেজীয় চলনে ক্রোমোজোমগুলি ‘V’ আকৃতির হলে তাকে কী বলে?
- (ক) মেটাসেন্ট্রিক
- (খ) সাব-মেটাসেন্ট্রিক
- (গ) এক্রোসেন্ট্রিক
- (ঘ) টেলোসেন্ট্রিক
- উত্তর: (ক) মেটাসেন্ট্রিক
- খণ্ডিত ভবনের (Fragmentation) মাধ্যমে জনন সম্পন্ন করে কোনটি?
- (ক) ইস্ট
- (খ) হাইড্রা
- (গ) স্পাইরোগাইরা
- (ঘ) প্লাজমোডিয়াম
- উত্তর: (গ) স্পাইরোগাইরা
- সপুষ্পক উদ্ভিদের খাস নির্ণীত নিউক্লিয়াসের (Definitive Nucleus) ক্রোমোজোম সংখ্যা কত?
- (ক) n
- (খ) 2n
- (গ) 3n
- (ঘ) 4n
- উত্তর: (খ) 2n (নিষেক পর এটি 3n শস্য নিউক্লিয়াসে পরিণত হয়)
জীবনের প্রবাহমানতা: SAQ (এক কথায় উত্তর দাও)
- একটি স্যাটেলাইটযুক্ত ক্রোমোজোমকে কী বলে?
- উত্তর: স্যাাট-ক্রোমোজোম (SAT-Chromosome)।
- ক্রোমোজোমের দুই প্রান্তভাগকে কী বলা হয়?
- উত্তর: টেলোমিয়ার (Telomere)।
- RNA-তে থাইমিনের পরিবর্তে কোন পাইরিমিডিন ক্ষার থাকে?
- উত্তর: ইউরাসিল (Uracil)।
- কোষ চক্রের কোন দশাকে ‘বিশ্রাম দশা’ বলা হয়?
- উত্তর: ইন্টারফেজ (Interphase) দশাকে।
- প্রাণীকোষের সাইটোকাইনেসিস কোন পদ্ধতিতে ঘটে?
- উত্তর: ক্লীভেজ (Cleavage) বা ফ্যারোয়িং (Furrowing) পদ্ধতিতে।
- উদ্ভিদকোষের বিভাজনে সাইটোকাইনেসিসের সময় গঠিত পাতলা পাতটিকে কী বলে?
- উত্তর: সেল প্লেট (Cell Plate) বা কোষপাত।
- পুং গ্যামেট ও স্ত্রী গ্যামেটের মিলন প্রক্রিয়াকে কী বলে?
- উত্তর: নিষেক (Fertilization)।
- পুনরুৎপাদন (Regeneration) দেখা যায় এমন একটি প্রাণীর নাম লেখো।
- উত্তর: প্ল্যানারিয়া (Planaria)।
- মাইক্রোপ্রোপাগেশনে ব্যবহৃত পুষ্টি মাধ্যমে উদ্ভিদের যে অবিভেদেিত কোষপুঞ্জ গঠিত হয় তার নাম কী?
- উত্তর: ক্যালস (Callus)।
- সপুষ্পক উদ্ভিদের স্ত্রীস্তবকের ডিম্বকটি নিষেকের পর কিসে রূপান্তরিত হয়?
- উত্তর: বীজে (Seed)। (ডিম্বাশয় ফলে রূপান্তরিত হয়)।
জীবনের প্রবাহমানতা: ২ নম্বরের সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর
প্র: ১. সমসংস্থ ক্রোমোজোম (Homologous Chromosome) কাকে বলে?
উত্তর: আকার, আকৃতি এবং জিনগত বিন্যাসের দিক থেকে হুবহু একরকম দেখতে দুটি ক্রোমোজোম—যার একটি পিতৃকুল এবং অপরটি মাতৃকুল থেকে প্রাপ্ত হয়, তাদের পরস্পর সমসংস্থ ক্রোমোজোম বলে।
প্র: ২. জিন (Gene) এবং লোকাস (Locus) বলতে কী বোঝায়?
উত্তর:
- জিন: DNA-র নির্দিষ্ট কার্যকারী অংশ যা জীবের বংশগত বৈশিষ্ট্য প্রকাশের মূল নির্দেশক।
- লোকাস: ক্রোমোজোমের ওপর নির্দিষ্ট যে স্থানে জিন অবস্থান করে, তাকে লোকাস বলে।
প্র: ৩. কাইনেটোফোর (Kinetochore)-এর কাজ কী?
উত্তর: ক্রোমোজোমের সেন্ট্রোমিয়ার অঞ্চলে অবস্থিত প্রোটিন নির্মিত চাকতির মতো অংশটি হলো কাইনেটোফোর। কোষ বিভাজনের মেটাফেজ ও অ্যানাফেজ দশায় বেমতন্তু (Spindle fibre) কাইনেটোফোরের সাথে যুক্ত হয়ে ক্রোমোজোমকে মেধা ও মেরুর দিকে সঞ্চালনে সাহায্য করে।
প্র: ৪. আমাইটোসিসকে প্রত্যক্ষ কোষ বিভাজন বলা হয় কেন?
উত্তর: কারণ এই প্রক্রিয়ায় বেমতন্তু গঠন এবং নিউক্লীয় পর্দার বিলুপ্তি না ঘটে, সরাসরি খাঁজ সৃষ্টির মাধ্যমে ডাম্বেল আকৃতির নিউক্লিয়াস ও সাইটোপ্লাজম একসাথে দুটি অপত্য কোষে বিভক্ত হয়।
প্র: ৫. ক্রসিং ওভার (Crossing Over) কী? এর তাৎপর্য লেখো।
উত্তর: মিওসিস-১ এর প্রফেজ-১ দশায় সমসংস্থ ক্রোমোজোমের দুটি নন-সিস্টার ক্রোমাটিডের মধ্যে দেহাংশের বিনিময়কে ক্রসিং ওভার বলে।
- তাৎপর্য: এর ফলে জিনের পুনর্সংযুক্তি ঘটে এবং জীবে নতুন প্রকরণ বা ভেদ (Variation) সৃষ্টি হয়।
প্র: ৬. G₀ দশা (G₀ Phase) কী? উদাহরণ দাও।
উত্তর: কোষ চক্রের যে দশায় কোষ স্থায়ীভাবে বিভাজন বন্ধ করে বিশ্রাম দশায় চলে যায় এবং কোষ চক্র থেকে সাময়িকভাবে নিষ্ক্রান্ত হয়, তাকে G₀ দশা বলে।
- উদাহরণ: প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের স্নায়ুকোষ এবং পরিণত লোহিত রক্তকণিকা।
প্র: ৭. অণুবিস্তার বা মাইক্রোপ্রোপাগেশন (Micropropagation) কাকে বলে?
উত্তর: কলারোপণ (Tissue Culture) পদ্ধতির সাহায্যে উদ্ভিদের যেকোনো ক্ষুদ্রাংশ (যেমন মুকুল, কোষ বা কলা) থেকে পোষক মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে খুব দ্রুত বিপুল সংখ্যক অপত্য উদ্ভিদ সৃষ্টির আধুনিক কৃত্রিম অঙ্গজ জনন পদ্ধতিকে মাইক্রোপ্রোপাগেশন বলে।
প্র: ৮. জনুক্রম বা জনুপর্যায় (Alternation of Generations) বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: কোনো জীবের জীবনচক্রে হ্যাপ্লয়েড (n) বা লিঙ্গধর দশা এবং ডিপ্লয়েড (2n) বা রেণুধর দশার যে পর্যায়ক্রমিক আবর্তন ঘটে, তাকে জনুক্রম বলে। (যেমন: ফার্ন)।
প্র: ৯. দ্বিনিষেক (Double Fertilization) কাকে বলে?
উত্তর: সপুষ্পক উদ্ভিদের ডিম্বাশয়ে একই সাথে দুটি পুংগ্যামেটের একটির মাধ্যমে ডিম্বাণুকে ($n$) এবং অপরটির মাধ্যমে নির্ণীত নিউক্লিয়াসকে (2n) নিষিক্ত করার যৌথ প্রক্রিয়াকে দ্বি-নিষেক বলে।
প্র: ১০. ক্রোমোজোমের নর (NOR)-এর পুরো নাম ও কাজ কী?
উত্তর: NOR-এর পুরো নাম হলো Nucleolar Organizer Region।
- কাজ: কোষ বিভাজনের শেষ দশায় (টেলোফেজে) এই অঞ্চলটি থেকে নিউক্লিওলাসের পুনর্গঠন ঘটে।
জীবনের প্রবাহমানতা: গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যসমূহ:
DNA এবং RNA-এর পার্থক্য:
| বৈশিষ্ট্য | DNA | RNA |
|---|---|---|
| শর্করা (Sugar) | ডি-অক্সিরাইবোজ শর্করা থাকে। | রাইবোজ শর্করা থাকে। |
| গঠন | প্রধানত দ্বি-সূত্রক এবং পেঁচানো। | প্রধানত এক-সূত্রক এবং রৈখিক। |
| নাইট্রোজেন ক্ষার | অ্যাডেনিন (A), গুয়ানিন (G), সাইটোসিন (C) এবং থাইমিন (T)। | অ্যাডেনিন (A), গুয়ানিন (G), সাইটোসিন (C) এবং ইউরাসিল (U)। |
| কাজ | বংশগতির ধারক ও বাহক হিসেবে কাজ করে। | প্রোটিন সংশ্লেষে সাহায্য করে। |
অটোসোম এবং সেক্স ক্রোমোজোমের (অ্যালোসোম) পার্থক্য
| বৈশিষ্ট্য | অটোজোম (Autosome) | সেক্স ক্রোমোজোম (Sex Chromosome) |
|---|---|---|
| সংখ্যা | মানবদেহে ৪৪টি (২২ জোড়া)। | মানবদেহে ২টি (১ জোড়া)। |
| কাজ | জীবের দৈহিক বৈশিষ্ট্য (উচ্চতা, ত্বকের রঙ ইত্যাদি) নির্ধারণ করে। | জীবের লিঙ্গ (স্ত্রী বা পুরুষ) নির্ধারণ করে। |
| প্রকারভেদ | সব অটোজোম দেখতে প্রায় একই রূপ। | দুই প্রকার: X এবং Y ক্রোমোজোম। |
মাইটোসিস এবং মিওসিস কোষ বিভাজনের পার্থক্য
| বৈশিষ্ট্য | মাইটোসিস (Mitosis) | মিওসিস (Meiosis) |
|---|---|---|
| সংগঠন স্থান | দেহকোষ ও ভাজক কলায় ঘটে। | জনন মাতৃকোষে ঘটে। |
| বিভাজনের সংখ্যা | মাতৃকোষটি একবার বিভাজিত হয়। | মাতৃকোষটি পর পর দুবার বিভাজিত হয়। |
| অপত্য কোষের সংখ্যা | ২টি অপত্য কোষ সৃষ্টি হয়। | ৪টি অপত্য কোষ সৃষ্টি হয়। |
| ক্রোমোজোম সংখ্যা | অপত্য কোষে ক্রোমোজোম সংখ্যা মাতৃকোষের সমান থাকে ($2n \rightarrow 2n$)। | অপত্য কোষে ক্রোমোজোম সংখ্যা মাতৃকোষের অর্ধেক হয় ($2n \rightarrow n$)। |
| ক্রসিং ওভার | ঘটে না। | ঘটে। |
উদ্ভিদকোষ ও প্রাণীকোষের মাইটোসিসের পার্থক্য
| বৈশিষ্ট্য | উদ্ভিদকোষের মাইটোসিস | প্রাণীকোষের মাইটোসিস |
|---|---|---|
| বেমতন্তু গঠন | মাইক্রোটিউবিউল বা অনুণালিকা থেকে গঠিত হয় (অ্যানাস্ট্রাল)। | সেন্ট্রোসোমের অ্যাস্ট্রাল রশ্মি থেকে গঠিত হয় (অ্যাম্ফিয়াস্ট্রাল)। |
| সাইটোকাইনেসিস | সেল প্লেট বা কোষপাত গঠনের মাধ্যমে ঘটে। | ক্লীভেজ বা ফারোয়িং (গর্ত সৃষ্টি) প্রক্রিয়ায় ঘটে। |
অযৌন জনন এবং যৌন জননের পার্থক্য
| বৈশিষ্ট্য | অযৌন জনন (Asexual) | যৌন জনন (Sexual) |
|---|---|---|
| জনকের সংখ্যা | একটিমাত্র জনক জীব প্রয়োজন। | দুটি ভিন্নধর্মী (পুং ও স্ত্রী) জনক জীব প্রয়োজন। |
| একক | রেনু (Spore)। | গ্যামেট (Gamete)। |
| কোষ বিভাজন | কেবল মাইটোসিস ঘটে। | মিওসিস ও মাইটোসিস উভয়ই ঘটে। |
| অপত্যের বৈশিষ্ট্য | অপত্য জীব অবিকল জনকের মতো হয় (ক্লোন)। | অপত্য জীবে নতুন বৈশিষ্ট্য ও প্রকরণ দেখা যায়। |
জীবনের প্রবাহমানতা: ৫ নম্বরের বড় প্রশ্ন:
প্রশ্ন ১: একটি ক্রোমোজোমের পরিচ্ছন্ন চিত্র অঙ্কন করে বিভিন্ন অংশ চিহ্নিত করো।
পরীক্ষার জন্য টিপস: খাতায় চিত্র আঁকার সময় পেন্সিল ব্যবহার করবেন। ডানদিকে চিহ্নিতকরণগুলি পরিষ্কারভাবে লিখবেন।
[ টেলোমিয়ার ] <--- (প্রান্তভাগ)
|
+---------+---------+
| (ক্রোমাটিড) |
| __ __ __ |
| / \ / \ / \ |
| \__/ \__/ \__/ |
+---------+---------+
|
[ গৌণ খাঁজ / NOR ]
|
+---------+---------+
| __ __ __ |
| / \ / \ / \ |
| \__/ \__/ \__/ |
+---------+---------+
|
( সেন্ট্রোমিয়ার ) <--- (প্রাথমিক খাঁজ)
|
[ কাইনেটোফোর ]
|
+---------+---------+
| |
| __ __ __ |
| / \ / \ / \ |
| \__/ \__/ \__/ |
+---------+---------+
|
[ স্যাটেলাইট ] <--- (গোলকাকার প্রান্ত অংশ)
চিহ্নিতকরণ ও সংক্ষিপ্ত বিবরণ:
- ক্রোমাটিড (Chromatid): মেটাফেজ দশায় ক্রোমোজোম লম্বালম্বিভাবে দুটি সমান সুতোর মতো অংশে বিভক্ত থাকে, এদের ক্রোমাটিড বলে।
- সেন্ট্রোমিয়ার (Centromere): ক্রোমোজোমের প্রাথমিক খাঁজ অংশ, যেখানে দুটি ক্রোমাটিড পরস্পর যুক্ত থাকে।
- কাইনেটোফোর (Kinetochore): সেন্ট্রোমিয়ারে অবস্থিত প্রোটিন নির্মিত অংশ, যেখানে কোষ বিভাজনের সময় বেমতত্ত্ব যুক্ত হয়।
- গৌণ খাঁজ (Secondary Constriction) বা NOR: প্রাথমিক খাঁজ ছাড়াও ক্রোমোজোমে অতিরিক্ত খাঁজ, যা নিউক্লিওলাস গঠনে সাহায্য করে।
- টেলোমিয়ার (Telomere): ক্রোমোজোমের দুটি প্রান্তভাগ, যা ক্রোমোজোমকে পরস্পরের সাথে জুড়ে যেতে বাধা দেয়।
- স্যাটেলাইট (Satellite): গৌণ খাঁজের পরবর্তী অংশ যা দেখতে ফোলা গোলকের মতো হয়।
প্রশ্ন ২: মাইটোসিস কোষ বিভাজনের মেটাফেজ এবং অ্যানাফেজ দশার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি চিত্রসহ বর্ণনা করো।
(ক) মেটাফেজ দশা (Metaphase Stage)
চিত্রের বিবরণ: কোষের মাঝখানে (বিষুব অঞ্চলে) ক্রোমোজোমগুলি সারিবদ্ধভাবে বেমতন্তুর সাথে যুক্ত থাকে।
[ উত্তর মেরু ]
/ | \
/ | \ <--- বেমতত্ত্ব (Spindle Fibres)
/ | \
======(==Chrom.==)====== <--- বিষুব অঞ্চল (Equatorial Plane)
\ | /
\ | /
\ | /
[ দক্ষিণ মেরু ]
প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- বিষুব অঞ্চলে বিন্যাস: ক্রোমোজোমগুলি কোষের বিষুব অঞ্চলে (Equatorial plane) বা নিরক্ষীয় অঞ্চলে সারিবদ্ধভাবে সজ্জিত হয়ে মেটাফেজ প্লেট তৈরি করে।
- স্পষ্ট রূপদান: এই দশায় ক্রোমোজোমগুলি সবচেয়ে বেশি ঘনীভূত, মোটা ও স্পষ্ট হয়, ফলে অণুবীক্ষণ যন্ত্রে ক্রোমোজোম গণনার জন্য এটি শ্রেষ্ঠ দশা।
- বেমতত্ত্ব সংযুক্তি: কাইনেটোফোরের সাহায্যে ক্রোমোজোমগুলি ক্রোমোজোমাল বেমতন্তুর (Chromosomal spindle fibre) সাথে যুক্ত হয়।
(খ) অ্যানাফেজ দশা (Anaphase Stage)
চিত্রের বিবরণ: সেন্ট্রোমিয়ার দ্বিখণ্ডিত হয়ে অপত্য ক্রোমাটিডগুলি উল্টো দুটি মেরুর দিকে দৌড়াচ্ছে (V, L, J, I রূপ)।
[ উত্তর মেরু ]
^ ^ ^
V V V <--- অপত্য ক্রোমোজোমের মেরু অভিমুখী চলন
^ ^ ^
[ দক্ষিণ মেরু ]
প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- সেন্ট্রোমিয়ারের বিভাজন: প্রতিটি ক্রোমোজোমের সেন্ট্রোমিয়ার লম্বালম্বিভাবে বিভাজিত হয়ে দুটি অপত্য সেন্ট্রোমিয়ার এবং দুটি অপত্য ক্রোমোজোম তৈরি করে।
- অ্যানাফেজীয় চলন: ক্রোমোজোমাল তন্তুর সংকোচন এবং আন্তঃমেরু তন্তুর প্রসারণের ফলে অপত্য ক্রোমোজোমগুলি বিপরীত মেরুর দিকে ধাবিত হয়।
- বিভিন্ন আকৃতি: অ্যানাফেজীয় চলনের সময় সেন্ট্রোমিয়ারের অবস্থান অনুযায়ী ক্রোমোজোমগুলি V (মেটাসেন্ট্রিক), L (সাব-মেটাসেন্ট্রিক), J (এক্রোসেন্ট্রিক) এবং I (টেলোসেন্ট্রিক) রূপ ধারণ করে।
প্রশ্ন ৩: কোষ চক্র বলতে কী বোঝো? কোষ চক্রের S-দশাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলা হয় কেন? কোষ চক্র অনিয়ন্ত্রিত হলে কী ঘটে?
১. কোষ চক্র (Cell Cycle):
একটি কোষের সৃষ্টি থেকে শুরু করে তার বৃদ্ধি, বিকাশ এবং পরবর্তী বিভাজনের শেষ পর্যন্ত যে ধারাবাহিক চক্রাকারে ঘটনাবলী ঘটে, তাকে কোষ চক্র বলে।
২. S-দশার গুরুত্ব:
ইন্টারফেজ দশার S (Synthesis) দশা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ:
- DNA রেপ্লিকেশন: এই দশায় কোষের নিউক্লিয়াসে থাকা DNA-র স্বপ্রতিরূপ গঠন বা রেপ্লিকেশন ঘটে, যার ফলে DNA-র পরিমাণ দ্বিগুণ (2C থেকে 4C) হয়।
- হিস্টোন প্রোটিন সংশ্লেষ: এই দশায় DNA পেঁচানোর জন্য আবশ্যক হিস্টোন প্রোটিন তৈরি হয়।
- S-দশা সঠিকভাবে সম্পন্ন না হলে পরবর্তী বিভাজন দশা (M-Phase) শুরু হতে পারে না।
৩. কোষ চক্র অনিয়ন্ত্রিত হলে ফলাফল:
- কোষ চক্রের বিভিন্ন বিন্দুতে (Checkpoint) জিনগত নিয়ন্ত্রণ নষ্ট হলে কোষের বিভাজন ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
- এর ফলে অনিয়ন্ত্রিতভাবে কোষ বিভাজিত হতে থাকে এবং টিউমার (Tumor) সৃষ্টি করে।
- এই টিউমার কোষে ক্ষতিকারক পরিবর্তন ঘটলে তা ম্যালিগন্যান্ট (Malignant) হয়, যার ফলে মারাত্মক ক্যান্সার (Cancer) রোগের উৎপত্তি হয়।
প্রশ্ন ৪: উদ্ভিদের বিভিন্ন প্রকার প্রাকৃতিক অঙ্গজ জনন পদ্ধতি উদাহরণসহ আলোচনা করো। মাইক্রোপ্রোপাগেশন বা অণুবিস্তারের ধাপগুলি লেখো।
(ক) উদ্ভিদের প্রাকৃতিক অঙ্গজ জনন পদ্ধতি:
- মূলের মাধ্যমে: রসেভরা অস্থানিক মুকুলযুক্ত মূল মাটি থেকে নতুন উদ্ভিদ সৃষ্টি করে।
- উদাহরণ: রাঙা আলু (মিষ্টি আলু), পটল।
- কাণ্ডের মাধ্যমে:
- স্ফীতকন্দ (Tuber): কন্দের ‘চোখ’ বা মুকুল থেকে নতুন চারা উৎপন্ন হয়। (যেমন: আলু)
- গুড়িকন্দ ও প্রকাণ্ড: কন্দের পর্ব থেকে অস্থানিক মুকুল হয়ে নতুন উদ্ভিদ জন্মায়। (যেমন: আদা, ওল)
- ধাবক (Runner): মাটির ওপর দিয়ে যাওয়া কাণ্ড ভেঙে নতুন গাছ তৈরি করে। (যেমন: থানকুনি, সুষনি)
- পত্রের মাধ্যমে: পাতার কিনারে থাকা অস্থানিক মুকুল মাটি স্পর্শ করলে তা থেকে স্বাধীন অপত্য উদ্ভিদ সৃষ্টি হয়।
- উদাহরণ: পাথরকুচি (Bryophyllum)।
(খ) মাইক্রোপ্রোপাগেশন (অণুবিস্তার)-এর ধাপসমূহ:
অণুবিস্তার প্রক্রিয়াটি মূলত নিচের চারটি ধাপে সম্পন্ন হয়:
উপযুক্ত উদ্ভিদাংশ (Explant) নির্বাচন — কৃত্রিম পুষ্টি মাধ্যমে কৃষ্টি (Culture)—ক্যালস (Callus) গঠন \longrightarrow \text{এমব্রয়েড ও প্ল্যান্টলেট (Plantlet) গঠন}$$
- এক্সপ্ল্যান্ট নির্বাচন: উদ্ভিদের মুকুল বা কচি পাতার টিস্যু সংগ্রহ করা হয়।
- ক্যালস গঠন: পুষ্টি মাধ্যমে ওই টিস্যু বৃদ্ধি পেয়ে অবিভেদেিত কোষপুঞ্জ বা ক্যালস (Callus) তৈরি করে।
- প্ল্যান্টলেট গঠন: হরমোন প্রয়োগের মাধ্যমে ক্যালস থেকে ছোট চারাগাছ বা প্ল্যান্টলেট তৈরি হয়।
- টবে স্থানান্তর: প্ল্যান্টলেটগুলিকে মাটিতে স্থানান্তরিত করে পূর্ণাঙ্গ উদ্ভিদে পরিণত করা হয়।
প্রশ্ন ৫: একটি আদর্শ সপুষ্পক উদ্ভিদের ফুলের বিভিন্ন স্তবকগুলির কাজ সংক্ষেপে আলোচনা করো। স্ব-পরাগযোগ ও ইতর-পরাগযোগের দুটি করে সুবিধা ও অসুবিধা লেখো।
(ক) ফুলের বিভিন্ন স্তবকের কাজ:
- বৃত্তি (Calyx): ফুলের সবচেয়ে বাইরের সবুজ অংশ।
- কাজ: কুঁড়ি অবস্থায় ভেতরের অংশকে রোদ, বৃষ্টি ও পোকামাকড় থেকে রক্ষা করে।
- দলমন্ডল (Corolla): উজ্জ্বল ও রঙিন পাপড়ি সমন্বিত অংশ।
- কাজ: উজ্জ্বল রঙের সাহায্যে কীটপতঙ্গকে আকর্ষণ করে পরাগযোগে সাহায্য করে।
- পুংস্তবক (Androecium): পরাগধানী ও পুংদণ্ড নিয়ে গঠিত।
- কাজ: পরাগধানীতে পরাগরেণু উৎপন্ন করে পুংগ্যামেট তৈরি করে।
- স্ত্রীস্তবক (Gynoecium): গর্ভমুণ্ড, গর্ভদণ্ড ও গর্ভাশয় নিয়ে গঠিত।
- কাজ: ডিম্বাশয়ে ডিম্বাণু উৎপন্ন করে এবং নিষেকের পর ফল ও বীজ গঠনে অংশ নেয়।
(খ) স্ব-পরাগযোগ ও ইতর-পরাগযোগের সুবিধা ও অসুবিধা:
১. স্ব-পরাগযোগ (Self-Pollination):
- সুবিধা:
- পরাগযোগের জন্য কোনো বাহকের (পশু-পাখি, বাতাস) ওপর নির্ভর করতে হয় না।
- প্রজাতি বা বংশের বিশুদ্ধতা বজায় থাকে।
- অসুবিধা:
- নতুন কোনো ভালো গুণ বা বৈশিষ্ট্য (প্রকরণ) সৃষ্টি হয় না।
- উৎপন্ন বীজ ও নতুন উদ্ভিদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হয়।
২. ইতর-পরাগযোগ (Cross-Pollination):
- সুবিধা:
- নতুন নতুন বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় ঘটে এবং প্রতিকূল পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা বেশি হয়।
- বীজ উন্নতমানের, রোগপ্রতিরোধী ও অধিক সহনশীল হয়।
- অসুবিধা:
- সম্পূর্ণভাবে বহিরাগত বাহকের ওপর নির্ভর করতে হয়, তাই পরাগযোগ অনিশ্চিত।
- প্রচুর পরিমাণে পরাগরেণুর অপচয় ঘটে।
উপসংহার (Conclusion)
পরিশেষে বলা যায়, “জীবনের প্রবাহমানতা” (Continuity of Life) অধ্যায়টি কেবল পড়াশোনা বা পরীক্ষার নম্বর অর্জনের একটি বিষয় নয়, বরং এটি পৃথিবীর প্রতিটি জীবের অস্তিত্ব রক্ষার এক বিস্ময়কর জীববৈজ্ঞানিক মেলবন্ধন। এককোষী জীব থেকে শুরু করে জটিল মানবদেহে কীভাবে ক্রোমাটিন জালিকা থেকে ক্রোমোজোম গঠিত হয়, কীভাবে $G_1, S, G_2$ এবং M-দশায় অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে কোষ চক্র পরিচালিত হয়—তা আমাদের জীবনধারণের জটিল রসায়নকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে।
কোষ বিভাজনের মাধ্যমে দেহের বৃদ্ধি ও ক্ষয়পূরণ ঘটে, আবার মিওসিস বিভাজন ও জনন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পিতা-মাতার বংশগত বৈশিষ্ট্য সন্তানের দেহে পরিবাহিত হয়। এই প্রসেসের প্রতিটি ধাপেই নিহিত রয়েছে প্রজাতির বংশধারা টিকিয়ে রাখার মূল চালিকাশক্তি। সপুষ্পক উদ্ভিদের দ্বি-নিষেক থেকে শুরু করে জীবজগতের জনুক্রম পর্যন্ত—প্রতিটি বিষয় মাধ্যমিক পরীক্ষা (WBBSE Class 10 Life Science)-র জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো ফল নিশ্চিত করতে হলে অধ্যায়টির সংজ্ঞা, বিভিন্ন কোষ বিভাজনের তুলনা, চিত্র চিহ্নিতকরণ (যেমন: ক্রোমোজোমের গঠন, মেটাফেজ ও অ্যানাফেজ দশা) এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন-উত্তর নিয়মিত পুনরাবৃত্তি ও অনুশীলন করা উচিত।
আশা করি, এই আর্টিকেলে দেওয়া বিস্তারিত নোটস, সাজেস্টিভ প্রশ্নাবলী এবং চিত্রচিত্রণ আপনার প্রস্তুতির সফরকে আরও সহজ ও নির্ভরযোগ্য করে তুলবে। জীববিজ্ঞানের এই অধ্যায়টি নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে নির্দ্বিধায় কমেন্ট সেকশনে জানাতে পারেন!