ভূমিকা:
ভারতের বিচারব্যবস্থায় ভারতের হাইকোর্ট বা রাজ্য উচ্চ আদালত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং শক্তিশালী উপাদান। সাধারণ মানুষের বিচার পাওয়ার শেষ ভরসাস্থলগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। একটি গণতান্ত্রিক ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্তম্ভ কেবল তার শাসন ব্যবস্থা কিংবা আইনসভার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; রাষ্ট্রের ভিত্তি মজবুত রাখতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগ। ভারতের শাসনতন্ত্রে একক এবং সমন্বিত এক বিচার কাঠামোর পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার শীর্ষস্থানে রয়েছে দেশের সুপ্রিম কোর্ট এবং তার ঠিক পরেই রাজ্য পর্যায়ে রয়েছে ভারতের হাইকোর্ট।
আইনি জটিলতা বা সাধারণ নাগরিক হিসেবে নিজ অধিকার রক্ষার কথা যখনই আসে, তখনই ভারতের হাইকোর্ট শব্দটির গুরুত্ব প্রতিটি মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভারতের প্রশাসনিক কাঠামোয় একাধিক রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলজুড়ে এই আদালতগুলো কীভাবে তাদের বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করে, সংবিধানে এর পেছনের আইনগত ভিত্তি কী, এবং কীভাবে এই বিচারালয়গুলো সংবিধানের মূল রক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে—তা জানা প্রতিটি সচেতন নাগরিকের কর্তব্য। নিচে ভারতের আইন ও সংবিধানের আলোকেই হাইকোর্টের বিস্তারিত ইতিহাস, ভূমিকা, গঠন ও কার্যপ্রণালী সহজ ভাষায় তুলে ধরা হলো।

ভারতের হাইকোর্ট-এর ইতিহাস ও উৎপত্তি:
ভারতের বিচারিক ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, আধুনিক হাইকোর্ট ব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল ব্রিটিশ শাসন আমলে। তৎকালীন সময়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে থাকা বিভিন্ন বিচারালয় এবং প্রেসিডেন্সি শহরের অ্যাডমিরালটি কোর্টগুলোকে বিলুপ্ত করে এক ছাতার নিচে আনার পরিকল্পনা করা হয়।
১৮৬১ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ইন্ডিয়ান হাইকোর্টস অ্যাক্ট ১৮৬১ (Indian High Courts Act 1861) পাস করে। এই আইনের ওপর ভিত্তি করেই তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতে তিনটি বিখ্যাত ও ঐতিহ্যবাহী প্রেসিডেন্সি শহরে তিনটি হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেওয়া হয়।
- কলকাতা হাইকোর্ট:১৮৬২ সালের ১ জুলাই প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই বিচারালয়টি দেশের সবচেয়ে প্রাচীন উচ্চ আদালত।
- বম্বে হাইকোর্ট: ১৮৬২ সালের ১৪ আগস্ট তৎকালীন বোম্বাই শহরে এই হাইকোর্টটি কাজ শুরু করে।
- মাদ্রাজ হাইকোর্ট: ১৮৬২ সালের ২৬ জুন এর অনুমোদন পাওয়ার পর ১৫ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে।
পরবর্তীতে ১৮৬৬ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি যখন ভারতের সংভাধান কার্যকর হয়, তখন থেকেই সংবিধানের ষষ্ঠ অংশের আওতায় ভারতের হাইকোর্ট ব্যবস্থাকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং রাজ্যের সর্বোচ্চ আদালতের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা হয়।
আরো পড়ুন: মানবাধিকার কমিশন:
সংবিধানের অধীনে ভারতের হাইকোর্ট-এর কাঠামো
ভারতের সংবিধানের ষষ্ঠ অধ্যায়ের (Part VI) অধীনে ২১৪ থেকে ২৩১ নম্বর অনুচ্ছেদে ভারতের হাইকোর্ট গঠন, একচ্ছত্র অধিকার এবং তাদের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা করা হয়েছে।
সংবিধানের ২১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রতিটি রাজ্যের জন্য অন্তত একটি করে হাইকোর্ট থাকবে। তবে সংবিধানে এটিও বলা হয়েছে যে, সংসদ চাইলে আইনের মাধ্যমে একাধিক রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের জন্য একটি সাধারণ বা যৌথ হাইকোর্ট গঠন করতে পারে।
বর্তমানে ভারতে মোট ২৮টি রাজ্য এবং ৮টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল রয়েছে। কিন্তু প্রশাসনিক দক্ষতা ও সমন্বয়ের সুবিধার্থে সারা দেশে মোট ২৫টি হাইকোর্ট সক্রিয় রয়েছে।
সংযুক্ত বা যৌথ হাইকোর্টের কিছু উদাহরণ:
১. কলকাতা হাইকোর্ট: পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলকে কভার করে।
২. বম্বে হাইকোর্ট: মহারাষ্ট্র ও গোয়া রাজ্য ছাড়াও দাদরা ও নগর হাভেলি এবং দমন ও দিউ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল কভার করে।
৩. পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্ট: এটি দুটি পৃথক রাজ্য (পাঞ্জাব ও হরিয়ানা) এবং তাদের যৌথ রাজধানী চণ্ডীগড়ের বিচারকাজ সম্পাদন করে।
৪. গুয়াহাটি হাইকোর্ট: অসম, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম এবং অরুণাচল প্রদেশ—এই চার রাজ্যের বিচারিক কাজ পরিচালনা করে।
ভারতের হাইকোর্ট-এর গঠন ও বিচারক নিয়োগ ব্যবস্থা
প্রতিটি হাইকোর্ট একজন প্রধান বিচারপতি (Chief Justice) এবং ভারতের রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নির্ধারিত সংখ্যক অন্যান্য বিচারপতিদের নিয়ে গঠিত হয়। অন্যান্য সরকারি পদের মতো হাইকোর্টের মোট বিচারক সংখ্যা সংবিধানে নির্দিষ্ট করে দেওয়া নেই; রাষ্ট্রপতির ওপর এই সিদ্ধান্ত ছেড়ে দেওয়া হয়েছে যে, একটি আদালতের মামলা নিষ্পত্তির চাপ অনুযায়ী কতজন বিচারকের প্রয়োজন।
ভারতের হাইকোর্ট -এর বিচারক নিয়োগ পদ্ধতি:
সংবিধানের ২১৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ করেন ভারতের রাষ্ট্রপতি। এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতি দেশের প্রধান বিচারপতি (Chief Justice of India) এবং সংশ্লিষ্ট রাজ্যের রাজ্যপালের সাথে পরামর্শ করেন।
অন্যান্য বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির মতামত গ্রহণ করা হয়। বাস্তবে ভারতে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে কলেজিয়াম ব্যবস্থা (Collegium System) অনুসরণ করা হয়, যেখানে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ও জেষ্ঠ্য বিচারকদের সমন্বয়ে গঠিত টিম রাষ্ট্রপতির কাছে নতুন বিচারক নিয়োগ বা বদলির সুপারিশ পাঠায়।
ভারতের হাইকোর্ট -এর বিচারক হওয়ার যোগ্যতা:
ভারতের হাইকোর্ট -এর বিচারক হতে হলে কোনো ব্যক্তিকে নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূরণ করতে হয়:
- তাকে অবশ্যই ভারতের নাগরিক হতে হবে।
- ভারতের যেকোনো অঞ্চলের বিচার বিভাগীয় পদে (Judicial Office) অন্তত ১০ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে, অথবা—
- এক বা একাধিক হাইকোর্টে টানা অন্তত ১০ বছর আইনজীবী হিসেবে প্র্যাকটিস করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
কার্যকাল ও অপসারণ প্রক্রিয়া:
ভারতের হাইকোর্ট -এর একজন বিচারক ৬২ বছর বয়স পর্যন্ত তাঁর পদে অধিষ্ঠিত থাকতে পারেন। অবসর গ্রহণের পূর্বে তিনি স্বেচ্ছায় রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারেন।
তবে অপসারণের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল ও কড়া। কোনো বিচারককে তাঁর পদ থেকে সরাতে হলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের মতো একই প্রক্রিয়ায় সংসদে প্রস্তাব পাস করতে হয়। প্রমাণিত অসং আচরণ বা অক্ষমতার ভিত্তিতে সংসদের দুই কক্ষে পৃথকভাবে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় প্রস্তাব পাস হওয়ার পর কেবল রাষ্ট্রপতির আদেশে তাঁকে পদচ্যুত করা যায়।
ভারতের হাইকোর্ট-এর ক্ষমতা ও এখতিয়ার (Jurisdiction)
আইন অনুযায়ী ভারতের হাইকোর্ট কেবল রাজ্যের সাধারণ আদালতের আপিল শোনে না, এটি নাগরিকদের সাংবিধানিক রক্ষক হিসেবেও কাজ করে। নিচে হাইকোর্টের মূল ক্ষমতাগুলোকে কয়েকটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে তুলে ধরা হলো:
মূল এখতিয়ার (Original Jurisdiction)
কিছু নির্দিষ্ট মামলা সরাসরি কোনো নিচু আদালতে না গিয়ে সরাসরি হাইকোর্টে দায়ের করা যায়।
- বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উইল, কোম্পানি আইন এবং আদালত অবমাননা সংক্রান্ত মামলা।
- সংসদ সদস্য বা বিধানসভার সদস্যদের নির্বাচন সংক্রান্ত বিরোধ।
- নির্দিষ্ট রাজস্ব সংক্রান্ত বিরোধ বা অর্থ সংক্রান্ত মামলা।
রিট জারির ক্ষমতা (Writ Jurisdiction – Article 226)
এটি ভারতের হাইকোর্ট-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতার একটি। সংবিধানের ২২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মৌলিক অধিকার রক্ষা এবং সাধারণ আইনি অধিকার ভঙ্গের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট যেকোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সরকারের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট রিট জারি করতে পারে। এই রিটগুলো হলো:
- হেবিয়াস কর্পাস (Habeas Corpus): বেআইনিভাবে আটকে রাখা ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করার আদেশ।
- মানডামাস (Mandamus): কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান বা কর্মীকে তাঁর আইনগত দায়িত্ব পালনের নির্দেশ।
- প্রোহিবিশন (Prohibition): অধস্তন আদালতকে নিজ এখতিয়ারের বাইরে কাজ করতে বাধা দেওয়া।
- কো-ওয়ারেন্টো (Quo-Warranto): কোনো ব্যক্তি কোন অধিকারে সরকারি পদে রয়েছেন তা জানতে চাওয়া।
- সার্টিওরারি (Certiorari): নিম্ন আদালতের কোনো রায় বা মামলার নথি পর্যালোচনা বা বাতিলের জন্য ওপরে পাঠানোর আদেশ।
নোট: সুপ্রিম কোর্ট কেবল অনুচ্ছেদ ৩২ অনুযায়ী মৌলিক অধিকারের জন্য রিট জারি করতে পারে, কিন্তু হাইকোর্ট মৌলিক অধিকার ছাড়াও সাধারণ আইনি সুরক্ষার জন্যও রিট ইস্যু করতে পারে। ফলে রিট জারির ক্ষেত্রে হাইকোর্টের পরিধি ক্ষেত্রবিশেষে ব্যাপক।
আপিল সংক্রান্ত এখতিয়ার (Appellate Jurisdiction)
ভারতের হাইকোর্ট মূলত রাজ্যের প্রধান আপিল আদালত। নিচু স্তরের জেলা আদালত বা ট্রাইবিউনালের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করা যায়।
- দেওয়ানি আপিল (Civil Appeals): জেলা আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ আইনগত ব্যাখ্যার প্রয়োজন হলে হাইকোর্টে আপিল দায়ের করা যায়।
- ফৌজদারি আপিল (Criminal Appeals): যদি কোনো সেশনস কোর্ট বা জেলা আদালত কোনো আসামিকে ৭ বছরের বেশি কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ড দেয়, তবে সেই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করা যায়। উল্লেখ্য, জেলা আদালত মৃত্যুদণ্ড দিলে তা কার্যকর করার পূর্বে হাইকোর্টের অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক।
তত্ত্বাবধানের ক্ষমতা (Supervising Jurisdiction – Article 227)
সংবিধানের ২২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, হাইকোর্ট তার অধীনস্থ সমস্ত জেলা আদালত, দায়রা আদালত ও ট্রাইবিউন্যালের (সামরিক আদালত ব্যতীত) কাজের তদারকি করার অধিকার রাখে। অধস্তন আদালতগুলো কীভাবে কাজ পরিচালনা করবে, তার জন্য হাইকোর্ট প্রয়োজনীয় নিয়মাবলি তৈরি করতে পারে।
নথির আদালত (Court of Record – Article 215)
সংবিধানের ২১৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিটি হাইকোর্ট একটি ‘কোর্ট অব রেকর্ড’। এর অর্থ হলো:
- হাইকোর্টের সমস্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত ও রায়কে ভবিষ্যতে আইনগত প্রমাণ ও নজির (Precedent) হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়। নিম্ন আদালতগুলো এই রায়গুলো মানতে বাধ্য।
- আদালত অবমাননা (Contempt of Court) করলে যেকোনো ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা হাইকোর্টের রয়েছে।
আরো পড়ুন: ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থা:
ভারতের ২৫টি হাইকোর্টের তালিকা
নিচে ভারতের ২৫টি সক্রিয় হাইকোর্ট, তাদের প্রতিষ্ঠার সাল এবং আঞ্চলিক এখতিয়ার টেবিল আকারে দেওয়া হলো:
| হাইকোর্টের নাম | প্রতিষ্ঠার বছর | বিচারিক এলাকা (Jurisdiction) | প্রধান বেঞ্চ (Seat) |
| ১. কলকাতা হাইকোর্ট | ১৮৬২ | পশ্চিমবঙ্গ, আন্দামান ও নিকোবর | কলকাতা |
| ২. বম্বে হাইকোর্ট | ১৮৬২ | মহারাষ্ট্র, গোয়া, দাদরা ও নগর হাভেলি, দমন ও দিউ | মুম্বাই |
| ৩. মাদ্রাজ হাইকোর্ট | ১৮৬২ | তামিলনাড়ু, পুদুচেরি | চেন্নাই |
| ৪. এলাহাবাদ হাইকোর্ট | ১৮৬৬ | উত্তর প্রদেশ | প্রয়াগরাজ |
| ৫. কর্ণাটক হাইকোর্ট | ১৮৮৪ | কর্ণাটক | বেঙ্গালুরু |
| ৬. পাটনা হাইকোর্ট | ১৯১৬ | বিহার | পাটনা |
| ৭. জম্মু ও কাশ্মীর হাইকোর্ট | ১৯২৮ | জম্মু ও কাশ্মীর, লাদাখ | শ্রীনগর/জম্মু |
| ৮. পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্ট | ১৯৪৭ | পাঞ্জাব, হরিয়ানা, চণ্ডীগড় | চণ্ডীগড় |
| ৯. গুয়াহাটি হাইকোর্ট | ১৯৪৮ | অসম, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম, অরুণাচল প্রদেশ | গুয়াহাটি |
| ১০. উড়িষ্যা হাইকোর্ট | ১৯৪৮ | ওড়িশা | কটক |
| ১১. রাজস্থান হাইকোর্ট | ১৯৪৯ | রাজস্থান | যোধপুর |
| ১২. অন্ধ্রপ্রদেশ হাইকোর্ট | ২০১৯ | অন্ধ্রপ্রদেশ | অমরাবতী |
| ১৩. কেরালা হাইকোর্ট | ১৯৫৬ | কেরালা, লাক্ষাদ্বীপ | এর্নাকুলাম |
| ১৪. মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট | ১৯৫৬ | মধ্যপ্রদেশ | জবলপুর |
| ১৫. গুজরাট হাইকোর্ট | ১৯৬০ | গুজরাট | আহমেদাবাদ |
| ১৬. দিল্লি হাইকোর্ট | ১৯৬৬ | দিল্লি | নতুন দিল্লি |
| ১৭. হিমাচল প্রদেশ হাইকোর্ট | ১৯৭১ | হিমাচল প্রদেশ | শিমলা |
| ১৮. সিকিম হাইকোর্ট | ১৯৭৫ | সিকিম | গ্যাংটক |
| ১৯. ছত্তিশগড় হাইকোর্ট | ২০০০ | ছত্তিশগড় | বিলাসপুর |
| ২০. উত্তরাখণ্ড হাইকোর্ট | ২০০০ | উত্তরাখণ্ড | নৈনিতাল |
| ২১. ঝাড়খণ্ড হাইকোর্ট | ২০০০ | ঝাড়খণ্ড | রাঁচি |
| ২২. মেঘালয় হাইকোর্ট | ২০১৩ | মেঘালয় | শিলং |
| ২৩. মণিপুর হাইকোর্ট | ২০১৩ | মণিপুর | ইম্ফল |
| ২৪. ত্রিপুরা হাইকোর্ট | ২০১৩ | ত্রিপুরা | আগরতলা |
| ২৫. তেলেঙ্গানা হাইকোর্ট | ২০১৯ | তেলেঙ্গানা | হায়দরাবাদ |
উপসংহার:
সংক্ষেপে বলতে গেলে, ভারতীয় আইনি ও শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল স্তম্ভ হলো ভারতের হাইকোর্ট। নিচু স্তরের আদালতগুলোতে চলমান হাজার হাজার মামলার জট কমানো থেকে শুরু করে নাগরিকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সংবিধানে সুরক্ষিত মৌলিক অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখার ক্ষেত্রে এর ভূমিকা অনস্বীকার্য।
দেশের বিভিন্ন রাজ্যের হাইকোর্টগুলো প্রতিদিন শত শত গুরুত্বপূর্ণ মামলা নিষ্পত্তির মাধ্যমে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করছে। আধুনিক যুগে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় আদালতের কার্যক্রম ডিজিটাল করা, মামলার ই-ফাইলিং ব্যবস্থা চালু করা এবং ভার্চুয়াল শুনানির মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাতে ভারতের হাইকোর্ট বিচারিক নিরপেক্ষতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
ভারতের হাইকোর্ট সংক্রান্ত সেরা ১০টি প্রশ্ন ও উত্তর:
১. ভারতে মোট কতটি হাইকোর্ট রয়েছে?
বর্তমানে ভারতে মোট ২৫টি হাইকোর্ট রয়েছে। ভারতের সংবিধানে প্রতিটি রাজ্যের জন্য পৃথক হাইকোর্টের বিধান থাকলেও, সপ্তম সংবিধান সংশোধনীর (১৯৫৬) মাধ্যমে একটি হাইকোর্টকে একাধিক রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের বিচারিক দায়িত্ব দেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়।
২. ভারতের সবচেয়ে প্রাচীন এবং সর্বশেষ গঠিত হাইকোর্ট কোনটি?
- সবচেয়ে প্রাচীন: কলকাতা হাইকোর্ট (১৮৬২ সালের ১ জুলাই প্রতিষ্ঠিত)।
- সর্বশেষ গঠিত: অন্ধ্রপ্রদেশ হাইকোর্ট ও তেলেঙ্গানা হাইকোর্ট (২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত)।
৩. হাইকোর্টের বিচারপতিদের কে নিয়োগ করেন?
ভারতের রাষ্ট্রপতি হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারপতিদের নিয়োগ দেন। এই নিয়োগের ক্ষেত্রে ভারতের প্রধান বিচারপতি (CJI), সংশ্লিষ্ট রাজ্যের রাজ্যপাল এবং কলিজিয়াম ব্যবস্থার সুপারিশের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
৪. হাইকোর্টের বিচারকের পদের মেয়াদ বা অবসর গ্রহণের বয়স কত?
হাইকোর্টের একজন বিচারপতি ৬২ বছর বয়স পর্যন্ত স্বপদে বহাল থাকতে পারেন।(১৫তম সংবিধান সংশোধনী আইন, ১৯৬৩ অনুযায়ী অবসর গ্রহণের বয়স ৬০ থেকে বাড়িয়ে ৬২ বছর করা হয়)।
৫. সংবিধানের কত নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্ট রিট (Writ) জারি করতে পারে?
সংবিধানের ২২৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মৌলিক অধিকার রক্ষা ও অন্যান্য আইনগত সুরক্ষার জন্য হাইকোর্ট ৫ ধরনের রিট (হেবিয়াস কর্পাস, মানডামাস, প্রোহিবিশন, কো-ওয়ারেন্টো ও সার্টিওরারি) জারি করতে পারে।
৬. হাইকোর্টের বিচারক হওয়ার প্রধান যোগ্যতাগুলো কী কী?
- প্রার্থীকে অবশ্যই ভারতের নাগরিক হতে হবে।
- ভারতের অভ্যন্তরে যেকোনো বিচার বিভাগীয় পদে অন্তত ১০ বছর কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে, অথবা—
- কোনো হাইকোর্টে অন্তত ১০ বছর আইনজীবী হিসেবে প্র্যাকটিস করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
৭. হাইকোর্টের বিচারককে কীভাবে পদচ্যুত করা যায়?
হাইকোর্টের বিচারককে কেবল প্রমাণিত অসদাচরণ বা অক্ষমতার ভিত্তিতে সংসদের উভয় কক্ষে (লোকসভা ও রাজ্যসভা) দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় অভিশংসন বা অপসারণ প্রস্তাব পাস হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির আদেশে পদচ্যুত করা যায় (যা সুপ্রিম কোর্টের বিচারকের অপসারণ পদ্ধতির অনুরূপ)।
৮. কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোর জন্য কি আলাদা হাইকোর্ট রয়েছে?
একমাত্র দিল্লি এবং জম্মু ও কাশ্মীর-এর নিজস্ব বা যৌথ হাইকোর্ট রয়েছে। অন্যান্য কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলো নিকটবর্তী কোনো রাজ্যের হাইকোর্টের বিচারিক অধিক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্ত (যেমন: আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ কলকাতা হাইকোর্টের অধীনে)।
৯. হাইকোর্টকে কেন ‘Court of Record’ বা নথির আদালত বলা হয়?
সংবিধানের ২১৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্ট হলো একটি ‘Court of Record’। এর অর্থ হলো হাইকোর্টের সমস্ত রায় ও নথিপত্র ভবিষ্যতের জন্য আইনি প্রমাণ বা নজির হিসেবে সংরক্ষিত থাকে এবং আদালত অবমাননার জন্য জরিমানা বা শাস্তির আদেশ দেওয়ার একচ্ছত্র ক্ষমতা হাইকোর্টের রয়েছে।
১০. সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের রিট জারির ক্ষমতার মূল পার্থক্য কী?
সুপ্রিম কোর্ট (অনুচ্ছেদ ৩২ অনুযায়ী) কেবল নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ভঙ্গের ক্ষেত্রেই রিট জারি করে, কিন্তু হাইকোর্ট (অনুচ্ছেদ ২২৬ অনুযায়ী) মৌলিক অধিকারের পাশাপাশি যেকোনো সাধারণ আইনি অধিকার সুরক্ষার জন্য রিট জারি করতে পারে।ফলে রিট জারির ক্ষেত্র পরিধিতে হাইকোর্টের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের চেয়েও ব্যাপক।