ভূমিকা:
ভারতীয় সংবিধানের ৫২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ভারতের রাষ্ট্রপতির পদের সৃষ্টি হয়েছে। তিনি ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ শাসনতান্ত্রিক প্রধান এবং দেশের প্রথম নাগরিক। ভারতীয় রাষ্ট্র কাঠামোর সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত মূলত তাঁর নামেই গৃহীত হয়। যদিও ভারত একটি সংসদীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার অধীন এবং প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভাই মূল নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী, তাহলেও সংবিধান অনুযায়ী ভারতের রাষ্ট্রপতির হাতে বেশ কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে।
ভারতীয় শাসনব্যবস্থা, রাজনীতি এবং যেকোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার (যেমন WBCS, UPSC, SSC, WBPSC) জন্য ভারতের রাষ্ট্রপতি সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য জানা অত্যন্ত জরুরী। বিশেষ করে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বের পরিধি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে তাঁর ভূমিকা ভারতীয় সংবিধানের ভিত্তি সুদৃঢ় রাখতে সাহায্য করে।

ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি এবং যোগ্যতা:
ভারতীয় সংবিধানে রাষ্ট্রপতির পদ অর্জনের জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু যোগ্যতার কথা উল্লেখ রয়েছে:
- যোগ্যতা:
- তাঁকে অবশ্যই ভারতের নাগরিক হতে হবে।
- ন্যূনতম ৩৫ বছর বয়স হতে হবে।
- লোকসভার সদস্য হওয়ার প্রয়োজনীয় যোগ্যতাসম্পন্ন হতে হবে।
- কোনো প্রকার সরকারি লাভজনক পদে (Office of Profit) বহাল থাকা চলবে না।
- নির্বাচন প্রক্রিয়া:ভারতের রাষ্ট্রপতি সরাসরি দেশের নাগরিকদের দ্বারা নির্বাচিত হন না। তিনি একটি বিশেষ ‘ইলেকটোরাল কলেজ’ (Electoral College) দ্বারা পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন। এই নির্বাচন মণ্ডলীর সদস্য হিসেবে থাকেন:
- ভারতের একক সংসদের উভয় কক্ষের (লোকসভা ও রাজ্যসভা) নির্বাচিত সদস্যবৃন্দ।
- সমস্ত অঙ্গরাজ্যের বিধানসভার নির্বাচিত সদস্যবৃন্দ।
- দিল্লি ও পদুচেরি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের বিধানসভার নির্বাচিত সদস্যগণ।
আরো পড়ুন: ভারতের সংবিধানে জরুরি অবস্থা:
ভারতের রাষ্ট্রপতির ১৫টি সর্বশ্রেষ্ঠ ক্ষমতা ও কার্যাবলী:
ভারতের রাষ্ট্রপতি পদটি শুধু সম্মানীয় প্রধানের পদ নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ নীতি, বিচার ব্যবস্থা এবং জাতীয় নিরাপত্তা বজায় রাখতে তাঁর অবদান অসীম। নিম্নে ভারতের রাষ্ট্রপতি এর গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা ও কার্যবলীর বিশদ বিবরণ আলোচনা করা হলো:
┌─────────────────────────────────────────┐
│ ভারতের রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা │
└────────────────────┬────────────────────┘
│
┌──────────────┬──────────────┼──────────────┬──────────────┐
│ │ │ │ │
┌────┴─────┐ ┌────┴─────┐ ┌────┴─────┐ ┌────┴─────┐ ┌────┴─────┐
│ শাসন সংক্রান্ত │ │ আইন সংক্রান্ত │ │ বিচার সংক্রান্ত │ │ অর্থ সংক্রান্ত │ │জরুরি অবস্থা সংক্রান্ত│
│ ক্ষমতা │ │ ক্ষমতা │ │ ক্ষমতা │ │ ক্ষমতা │ │ ক্ষমতা │
└──────────┘ └──────────┘ └──────────┘ └──────────┘ └──────────┘
শাসনসংক্রান্ত ক্ষমতা (Executive Powers):
- প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা: ভারতের সংবিধান অনুযায়ী কেন্দ্রীয় শাসনবিভাগের সমস্ত ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত। দেশের সকল প্রশাসনিক কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর নামেই পরিচালিত হয়।
- গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ প্রদান: ভারতের রাষ্ট্রপতি দেশের প্রধানমন্ত্রীকে নিয়োগ করেন এবং প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে অন্যান্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের নিয়োগ দেন।
- অন্যান্য প্রশাসনিক পদে নিয়োগ: অ্যাটর্নি জেনারেল, কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (CAG), প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনারবৃন্দ, রাজ্যপালগণ এবং ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (UPSC) চেয়ারম্যান ও সদস্যদের তিনি নিয়োগ প্রদান করেন।
আইনসংক্রান্ত ক্ষমতা (Legislative Powers):
- সংসদের অধিবেশন আহ্বান: রাষ্ট্রপতি রাজ্যসভা ও লোকসভার অধিবেশন আহ্বান ও স্থগিত করতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিসভার অনুমোদনে তিনি লোকসভা ভেঙে দিতে পারেন।
- বিলে সম্মতিদান: সংসদে কোনো বিল পাস হওয়ার পর তা আইনে পরিণত করার জন্য রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর ও সম্মতি আবশ্যিক।
- মনোনয়ন ক্ষমতা: সাহিত্য, বিজ্ঞান, কলা এবং সমাজসেবার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি রাজ্যসভায় ১২ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে মনোনীত করতে পারেন।
- অর্ডিন্যান্স বা অধ্যাদেশ জারি: যখন সংসদের অধিবেশন বন্ধ থাকে এবং দেশে কোনো জরুরি আইন প্রবর্তনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, তখন সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভারতের রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ (Ordinance) জারি করতে পারেন।
বিচারসংক্রান্ত ক্ষমতা (Judicial Powers):
- বিচারপতি নিয়োগ: ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারপতিদের পাশাপাশি হাইকোর্টের বিচারপতিদেরও তিনি নিয়োগ দেন।
- ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতা (Pardon Power): ভারতীয় সংবিধানের ৭২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ভারতের রাষ্ট্রপতি যেকোনো অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড মকুব, হ্রাস বা শাস্তি স্থগিত করার পূর্ণ সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী।
অর্থসংক্রান্ত ক্ষমতা (Financial Powers):
- অর্থ বিল (Money Bill): রাষ্ট্রপতির পূর্বানুমতি ব্যতিরেকে লোকসভায় কোনো অর্থ বিল পেশ করা সম্ভব নয়।
- বাজেট পেশ: দেশের বার্ষিক আর্থিক বিবরণী বা বাজেট সংসদে উপস্থাপনের তদারকি রাষ্ট্রপতির সম্মতি সাপেক্ষেই সম্পন্ন হয়।
- আকস্মিক তহবিল পরিচালনা: ভারতের আকস্মিক তহবিল (Contingency Fund of India) তাঁর নিয়ন্ত্রণে থাকে, যেখান থেকে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত খরচ মেটানো সম্ভব।
সামরিক ক্ষমতা (Military Powers):
- সর্বাধিনায়ক: ভারতের রাষ্ট্রপতি হলেন দেশের ত্রি-সংকেত প্রতিরক্ষা বাহিনীর (স্থলবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী) সর্বাধিনায়ক (Supreme Commander)।
- যুদ্ধ ও শান্তি ঘোষণা: সংসদের অনুমোদন সাপেক্ষে তিনি যেকোনো দেশের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা অথবা শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
জরুরি অবস্থা সংক্রান্ত ক্ষমতা (Emergency Powers):
ভারতের সংবিধানের ১৮ নম্বর অংশে (Part XVIII) রাষ্ট্রপতিকে জরুরি অবস্থা ঘোষণা ও পরিচালনা করার অভূতপূর্ব ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। দেশে যদি কোনো অভ্যন্তরীণ গোলযোগ, বাইরের কোনো দেশের আক্রমণ বা চরম আর্থিক সংকট তৈরি হয়, তবে দেশের সার্বভৌমত্ব, ঐক্য ও নিরাপত্তা রক্ষা করার জন্য রাষ্ট্রপতি মোট ৩টি বিশেষ ধারায় জরুরি অবস্থা জারি করতে পারেন:
জাতীয় জরুরি অবস্থা (National Emergency) — অনুচ্ছেদ ৩৫২
- কারণ: যুদ্ধ (War), বহিরাগত আক্রমণ (External Aggression) বা সশস্ত্র বিদ্রোহের (Armed Rebellion) আশঙ্কা তৈরি হলে রাষ্ট্রপতি সমগ্র ভারতে বা দেশের কোনো নির্দিষ্ট অংশে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে পারেন।
- অনুমোদন: ঘোষণার ১ মাসের মধ্যে সংসদের উভয় কক্ষে ২/৩ (দুই-তৃতীয়াংশ) সংখ্যাগরিষ্ঠতায় এটি অনুমোদিত হতে হয়।
- প্রভাব:
- কেন্দ্রীয় সরকার সরাসরি রাজ্য তালিকাভুক্ত বিষয়ে আইন তৈরির ক্ষমতা পায়।
- নাগরিকদের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত স্বাধীনতার মৌলিক অধিকার সাময়িকভাবে স্থগিত থাকে (তবে অনুচ্ছেদ ২০ ও ২১ কোনো অবস্থাতেই স্থগিত করা যায় না)।
রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন (President’s Rule / State Emergency) — অনুচ্ছেদ ৩৫৬
- কারণ: কোনো অঙ্গরাজ্যের রাজ্যপালের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বা রাষ্ট্রপতি নিজে যদি নিশ্চিত হন যে ঐ রাজ্যে সংবিধান অনুযায়ী শাসনতন্ত্র পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে (Constitutional Machinery failure), তবে তিনি রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করতে পারেন।
- অনুমোদন: ২ মাসের মধ্যে সংসদে অনুমোদিত হতে হয়।
- প্রভাব:
- সংশ্লিষ্ট রাজ্যের বিধানসভা ভেঙে দেওয়া হয় বা স্থগিত রাখা হয়।
- রাজ্য সরকারের প্রশাসনিক ও নির্বাহী ক্ষমতা সরাসরি রাষ্ট্রপতি ও রাজ্যপালের হাতে চলে যায়।
আর্থিক জরুরি অবস্থা (Financial Emergency) — অনুচ্ছেদ ৩৬০
- কারণ: যদি এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয় যার ফলে ভারতের বা তার কোনো অংশের আর্থিক স্থায়িত্ব বা ঋণ চরম ঝুঁকিতে পড়ে, তবে রাষ্ট্রপতি এই জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে পারেন।
- অনুমোদন: ঘোষণার ২ মাসের মধ্যে সংসদের অনুমোদন প্রয়োজন।
- প্রভাব:
- সরকারি কর্মচারীদের (এমনকি সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারপতিদেরও) বেতন ও ভাতা কমানো যেতে পারে।
- রাজ্য সরকারগুলির আর্থিক খরচের ওপর কেন্দ্র সরাসরি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে।(উল্লেখ্য: ভারতে আজ পর্যন্ত কখনো আর্থিক জরুরি অবস্থা জারি করা হয়নি।)
বিশেষ নোট: জরুরি অবস্থা সংক্রান্ত সমস্ত সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রপতি নিজে একতরফাভাবে নেন না। সংবিধানের ৪৪তম সংশোধনী (১৯৭৮) অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার লিখিত পরামর্শ পাওয়ার পরেই রাষ্ট্রপতি জাতীয় জরুরি অবস্থা জারি করতে পারেন।
ভারতের রাষ্ট্রপতি অপসারণ বা ইমপিচমেন্ট পদ্ধতি:
ভারতীয় সংবিধানের ৬১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভারতের রাষ্ট্রপতিকে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদচ্যুত করা যায়। এই বিশেষ প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় ইমপিচমেন্ট (Impeachment) বা মহাভোট গঠন।
ইমপিচমেন্টের একমাত্র কারণ:
সংবিধানে স্পষ্ট বলা আছে, কেবল “সংবিধান লঙ্ঘন” (Violation of the Constitution) করার অপরাধেই রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনা যায়। তবে সংবিধানে “সংবিধান লঙ্ঘন” শব্দটির নির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
ইমপিচমেন্ট পদ্ধতির ধারাবাহিক ধাপসমূহ:
1.প্রস্তাব উত্থাপন ও লিখিত নোটিশ:সংশ্লিষ্ট কক্ষে ১/৪ অংশ সদস্যের স্বাক্ষর এবং ১৪ দিনের নোটিশ আবশ্যিক.
সংসদের যেকোনো একটি কক্ষে (লোকসভা বা রাজ্যসভা) ইমপিচমেন্টের প্রস্তাব আনা যেতে পারে। প্রস্তাবটি পেশ করার আগে:
- যে কক্ষে প্রস্তাবটি আসছে, সেই কক্ষের মোট সদস্য সংখ্যার অন্তত এক-চতুর্থাংশ (১/৪) সদস্যের স্বাক্ষর থাকতে হয়।
- রাষ্ট্রপতিকে ১৪ দিন আগে একটি লিখিত লিখিত নোটিশ পাঠাতে হয়।
2.প্রথম কক্ষে প্রস্তাব গ্রহণ ও ভোটাভুটি:বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা (২/৩ অংশ ভোট) প্রয়োজন.
১৪ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর যে কক্ষে প্রস্তাবটি উত্থাপিত হয়েছিল, সেখানে এটি নিয়ে আলোচনা ও ভোটাভুটি হয়। প্রস্তাবটি অনুমোদন পেতে ঐ কক্ষের মোট সদস্য সংখ্যার অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩) সদস্যের সমর্থন বা ভোটের প্রয়োজন হয়।
3.দ্বিতীয় কক্ষে তদন্ত পরিচালনা:রাষ্ট্রপতির নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার অধিকার থাকে.
প্রথম কক্ষে পাস হওয়ার পর প্রস্তাবটি দ্বিতীয় কক্ষে পাঠানো হয়।
- দ্বিতীয় কক্ষ প্রস্তাবিত অভিযোগটি তদন্ত করে অথবা একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।
- এই তদন্ত চলাকালে রাষ্ট্রপতির আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার থাকে। তিনি নিজে উপস্থিত হয়ে বা আইনজীবী পাঠিয়ে নিজের বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারেন।
4.দ্বিতীয় কক্ষে চূড়ান্ত ভোটাভুটি ও পদচ্যুতি:অভিযোগ প্রমাণিত হলে পদ শূন্য হয়ে যায়.
তদন্তের পর যদি দ্বিতীয় কক্ষও মনে করে যে অভিযোগ সত্যি, তবে সেখানেও ভোটাভুটি হয়। যদি দ্বিতীয় কক্ষের মোট সদস্য সংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩) সদস্য প্রস্তাবটি পাস করেন, তবে সেই দিন থেকেই রাষ্ট্রপতি পদচ্যুত হন।
এই প্রক্রিয়ার কিছু বিশেষ দিক:
- মনোনীত সদস্যদের ভূমিকা: রাষ্ট্রপতির নির্বাচনে সংসদের মনোনীত সদস্যরা (Nominated Members) ভোট দিতে পারেন না, কিন্তু ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়ায় তাঁরা অংশগ্রহণ করেন এবং ভোট দেন।
- রাজ্য বিধানসভার ভূমিকা: রাষ্ট্রপতির নির্বাচনে রাজ্য বিধানসভা ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের নির্বাচিত সদস্যরা অংশ নেন, কিন্তু ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়ায় তাঁদের কোনো ভূমিকা থাকে না।
- বাস্তব ইতিহাস: ভারতের ইতিহাসে এ পর্যন্ত কোনো রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনা হয়নি।
ভারত সরকারের রাষ্ট্রপতি বনাম প্রধানমন্ত্রী:
একটি সংবিধানে দুই শীর্ষ পদের অবস্থান কেমন, তা বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:
┌────────────────────────────────────────────────────────┐
│ রাষ্ট্রপতি │
│ • দেশের প্রধান (Head of the State) │
│ • নামসর্বস্ব বা শাসনতান্ত্রিক প্রধান │
└──────────────────────────┬─────────────────────────────┘
│ পরামর্শ প্রদান
▼
┌────────────────────────────────────────────────────────┐
│ প্রধানমন্ত্রী │
│ • সরকারের প্রধান (Head of the Government) │
│ • প্রকৃত নির্বাহী ক্ষমতাকর্তা │
└────────────────────────────────────────────────────────┘
সংবিধানের ৭৪(১) অনুচ্ছেদ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, রাষ্ট্রপতিকে তাঁর কার্য সম্পাদনে সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রী পরিষদ থাকবে। ফলে ভারতের রাষ্ট্রপতি হলেন সাংবিধানিক প্রধান, আর প্রধানমন্ত্রী হলেন দেশের প্রকৃত প্রধান।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, ভারতের রাষ্ট্রপতি হলেন দেশের সংবিধানিক মর্যাদা, ঐক্য এবং অখণ্ডতার প্রতীক। আপাতদৃষ্টিতে ভারতীয় শাসনব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রিসভাকে ক্ষমতাশালী বলে মনে হলেও, সংকটময় মুহূর্তগুলিতে রাষ্ট্রপতির সঠিক রাজনৈতিক অবস্থান ও তাঁর ক্ষমতা দেশ রক্ষা এবং গণতান্ত্রিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। রাষ্ট্রপতির পদ এবং ক্ষমতার সুষ্ঠু প্রয়োগই ভারতীয় শাসনতন্ত্রের সুদৃঢ়তার আসল ভিত্তি।
আরো পড়ুন: ভারতের নির্বাচন কমিশন: গঠন, কার্যাবলী ও ক্ষমতা
ভারতের রাষ্ট্রপতি সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ):
১. ভারতের বর্তমান রাষ্ট্রপতি কে?
বর্তমানে ভারতের রাষ্ট্রপতি হলেন দ্রৌপদী মুর্মু। তিনি দেশের ১৫তম রাষ্ট্রপতি এবং ভারতের প্রথম আদিবাসী ও দ্বিতীয় নারী রাষ্ট্রপতি।
২. ভারতের রাষ্ট্রপতি কীভাবে নির্বাচিত হন?
তিনি একটি ‘ইলেকটোরাল কলেজ’ (Electoral College) দ্বারা পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন, যেখানে লোকসভা, রাজ্যসভা এবং রাজ্য বিধানসভাগুলির নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ভোট দেন।
৩. রাষ্ট্রপতির পদের মেয়াদ কত বছর?
রাষ্ট্রপতির পদের সাধারণ মেয়াদ ৫ বছর।
৪. ভারতের রাষ্ট্রপতি হতে গেলে ন্যূনতম বয়স কত হতে হয়?
অন্তত ৩৫ বছর বয়স হতে হয়।
৫. সংবিধানের কত নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির পদের কথা বলা হয়েছে?
সংবিধানের ৫২ নম্বর অনুচ্ছেদে।
৬. রাষ্ট্রপতির প্রধান প্রশাসনিক ক্ষমতা কী?
তিনি প্রধানমন্ত্রী, অন্যান্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, রাজ্যপাল, সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারপতি এবং গুরুত্বপূর্ণ কমিশনের প্রধানদের নিয়োগ করেন।
৭. রাষ্ট্রপতিকে কে শপথ বাক্য পাঠ করান?
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি (Chief Justice of India)।
৮. ভারতের রাষ্ট্রপতিকে কীভাবে পদচ্যুত করা যায়?
সংবিধান লঙ্ঘনের অপরাধে সংবিধানের ৬১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘ইমপিচমেন্ট’ (Impeachment) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।
৯. ভারতের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সর্বাধিনায়ক (Supreme Commander) কে?
ভারতের রাষ্ট্রপতি।
১০. রাষ্ট্রপতির জরুরি অবস্থা সংক্রান্ত ক্ষমতাগুলি কী কী?
জাতীয় জরুরি অবস্থা (অনুচ্ছেদ ৩৫২), রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন (অনুচ্ছেদ ৩৫৬), এবং আর্থিক জরুরি অবস্থা (অনুচ্ছেদ ৩৬০)।
১১. ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি কে ছিলেন?
ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ (তিনি পরপর দুইবার রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন)।
১২. অর্ডিন্যান্স বা অধ্যাদেশ জারির ক্ষমতা সংবিধানের কত ধারায় আছে?
১২৩ নম্বর অনুচ্ছেদে।
১৩. রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতা (Pardon Power) কত নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত?
৭২ নম্বর অনুচ্ছেদে।
১৪. রাষ্ট্রপতি কার লিখিত পরামর্শে জাতীয় জরুরি অবস্থা জারি করেন?
প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার লিখিত পরামর্শে।
১৫. রাষ্ট্রপতির পদ খালি হলে কে সাময়িকভাবে দায়িত্ব সামলান?
উপরাষ্ট্রপতি। উপরাষ্ট্রপতির পদও খালি থাকলে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব পালন করেন।
১৬. লোকসভায় অর্থ বিল (Money Bill) পেশ করতে কার পূর্বানুমতি লাগে?
ভারতের রাষ্ট্রপতির।
১৭. রাষ্ট্রপতি রাজ্যসভায় কতজন সদস্যকে মনোনীত করতে পারেন?
বিশেষ ক্ষেত্রে (সাহিত্য, বিজ্ঞান, কলা, সমাজসেবা) অবদানের জন্য ১২ জন সদস্যকে।
১৮. ভারতে এ পর্যন্ত কতবার আর্থিক জরুরি অবস্থা (Financial Emergency) জারি করা হয়েছে?
একবারও নয়।
১৯. রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে চাইলে পদত্যাগপত্র কার কাছে জমা দেন?
ভারতের উপরাষ্ট্রপতির (Vice-President) কাছে।
২০. ভারতে রাষ্ট্রপতি কি একাধিকবার পুনঃনির্বাচিত হতে পারেন?
হ্যাঁ, সংবিধান অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি যতবার খুশি রাষ্ট্রপতি পদের জন্য পুনরায় নির্বাচিত হতে পারেন।