ভারতের শাসনব্যবস্থা, সংবিধান এবং প্রশাসনিক কাঠামোর ভিত্তিমূল বুঝতে হলে নির্দেশমূলক নীতি (Directive Principles of State Policy বা DPSP) সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন। একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ভারতকে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত করতে সংবিধান প্রণেতারা যে সুদূরপ্রসারী রূপরেখা তৈরি করেছিলেন, তার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হলো এই নির্দেশাত্মক নির্দেশাবলি।
WBCS, UPSC, SSC, Rail বা যেকোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে কিংবা ভারতের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে সংবিধানের এই অংশটি জানা অত্যন্ত জরুরি। এই প্রবন্ধে আমরা ভারতীয় সংবিধানের Part IV-এ উল্লেখিত নির্দেশাত্মক নীতিগুলির খুঁটিনাটি সহজ ভাষায় আলোচনা করব।

নির্দেশমূলক নীতি কী?
সহজ কথায়, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সংবিধান প্রদত্ত কতগুলি মৌলিক পরামর্শ, উদ্দেশ্য বা নির্দেশনাবলিকে নির্দেশমূলক নীতি বলা হয়। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার যখন কোনো নতুন আইন প্রণয়ন করবে বা দেশ পরিচালনার জন্য নতুন কোনো নীতি নির্ধারণ করবে, তখন তাদের এই নীতিগুলি অনুসরণ করা উচিত।
ভারতের সংবিধান রচয়িতারা নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন যে, ভারত কেবল একটি প্রশাসনিক রাজ্য হিসেবে গড়ে উঠবে না, বরং এটি হবে একটি প্রকৃত জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র (Welfare State)। সেই লক্ষ্যেই আয়ারল্যান্ডের সংবিধান অনুসরণে ভারতের সংবিধানে এই নীতিগুলি অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
আরো পড়ুন: ভারতের সংবিধানের মৌলিক অধিকার:
সংবিধানিক অবস্থান ও পটভূমি
ভারতীয় সংবিধানের চতুর্থ অংশে (Part IV) এবং ৩৬ নম্বর থেকে ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদে (Articles 36 to 51) এই নীতিগুলি বিশদভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে।
- উৎস: আয়ারল্যান্ডের সংবিধান (যা তারা মূলতঃ স্পেনের সংবিধান থেকে গ্রহণ করেছিল)।
- অনুচ্ছেদ: Article 36 থেকে Article 51।
- সংবিধানের অংশ: Part IV।
- প্রকৃতি: অ-বিচারযোগ্য (Non-justiciable)।
ড. বি. আর. আম্বেদকর এই নীতিগুলিকে “ভারতীয় সংবিধানের নোবেল বা অনন্য বৈশিষ্ট্য” (Novel Features of the Indian Constitution) বলে অভিহিত করেছিলেন। অন্যদিকে প্রখ্যাত সংবিধান বিশেষজ্ঞ গ্র্যানভিল অস্টিন মৌলিক অধিকার এবং নির্দেশাত্মক নীতিগুলিকে একত্রে “সংবিধানের বিবেক” (Conscience of the Constitution) বলে আখ্যা দিয়েছেন।
নির্দেশমূলক নীতি সমূহের প্রধান বৈশিষ্ট্য
ভারতীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়নে এই নীতিগুলির বৈশিষ্ট্যসমূহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিচে প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি তুলে ধরা হলো:
- আইন প্রণয়নের দিকনির্দেশক: কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকার এবং স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন সংস্থাগুলিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন যেকোনো আইন বানানোর সময় তারা এই নীতিগুলি মাথায় রাখে।
- অ-বিচারযোগ্য (Non-Justiciable): মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হলে নাগরিকরা যেমন সরাসরি সুপ্রিম কোর্ট বা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হতে পারেন, এই নীতিগুলির ক্ষেত্রে কিন্তু তা সম্ভব নয়। অর্থাৎ রাষ্ট্র যদি এই নীতি প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়, তবে আদালতে মামলা করা যায় না।
- জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠন: এই নীতিগুলির প্রধান লক্ষ্য হলো সামাজিক ও অর্থনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। রাজনৈতিক গণতন্ত্র মৌলিক অধিকারের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হলেও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সামাজিক সাম্য আসে এই নির্দেশাত্মক নীতিগুলির মাধ্যমে।
- আইনের বৈধতা বিচারে ভূমিকা: কোনো আইনের সাংবিধানিক বৈধতা বিচার করার সময় দেশের আদালতগুলি বিচার করে দেখে যে আইনটি কোনো নির্দেশাত্মক নীতিকে বাস্তবায়িত করছে কি না।
নির্দেশমূলক নীতি সমূহের শ্রেণিবিভাগ:
ভারতের সংবিধানে নীতিগুলিকে কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণিতে ভাগ করা হয়নি। তবে নীতিগুলির অভ্যন্তরীণ ভাবধারা এবং মতাদর্শের ওপর ভিত্তি করে গবেষক ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা এগুলিকে প্রধানত ৩টি ভাগে ভাগ করে আলোচনা করেন:
┌─────────────────────────────────────────┐
│ নির্দেশমূলক নীতি (DPSP) শ্রেণিবিভাগ │
└────────────────────┬────────────────────┘
│
┌─────────────────────────────────┼─────────────────────────────────┐
▼ ▼ ▼
┌──────────────────┐ ┌──────────────────┐ ┌──────────────────┐
│ সমাজতান্ত্রিক নীতি │ │ গান্ধীবাদী নীতি │ │উদার-বুদ্ধিবৃত্তিক নীতি │
│ (Articles 38-43)│ │ (Articles 40,43) │ │ (Articles 44-51) │
└──────────────────┘ └──────────────────┘ └──────────────────┘
সমাজতান্ত্রিক নীতি (Socialistic Principles)
এই নীতিগুলির মূল উদ্দেশ্য হলো সমাজে অর্থনৈতিক সমতা আনা এবং একটি সমাজকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়ে তোলা।
- অনুচ্ছেদ ৩৮: জনকল্যাণ সাধনে একটি ন্যায়সংগত সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং বৈষম্য দূর করা।
- অনুচ্ছেদ ৩৯: সকল নাগরিকের জন্য পর্যাপ্ত জীবিকার সুযোগ, সম্পদ বণ্টন, নারী ও পুরুষের সমান কাজের জন্য সমান বেতন নিশ্চিত করা।
- অনুচ্ছেদ ৩৯A: দরিদ্রদের জন্য বিনামূল্যে আইনি সহায়তা (Free Legal Aid) প্রদান করা।
- অনুচ্ছেদ ৪১: বেকারত্ব, বার্ধক্য বা অসুস্থতার সময় কাজ ও শিক্ষার অধিকার এবং সরকারি সাহায্য পাওয়ার নিশ্চয়তা।
- অনুচ্ছেদ ৪২: কর্মক্ষেত্রে ন্যায়সংগত ও মানবিক পরিবেশ বজায় রাখা এবং মাতৃত্বকালীন ছুটির (Maternity Relief) ব্যবস্থা করা।
- অনুচ্ছেদ ৪৩: শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম জীবনযাত্রার মান ও মজুরি নিশ্চিত করা।
গান্ধীবাদী নীতি (Gandhian Principles)
জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর স্বপ্নের ভারত পুনর্গঠনের আদর্শের ওপর ভিত্তি করে এই নীতিগুলি রচিত হয়েছে।
- অনুচ্ছেদ ৪০: গ্রাম পঞ্চায়েত গঠন করা এবং তাদের স্বায়ত্তশাসনের ক্ষমতা দেওয়া।
- অনুচ্ছেদ ৪৩: গ্রামাঞ্চলে কুটির শিল্প ও সমবায় সমিতির বিকাশ ঘটানো।
- অনুচ্ছেদ ৪৬: তপশিলি জাতি (SC), তপশিলি উপজাতি (ST) এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণীর শিক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষা করা।
- অনুচ্ছেদ ৪৭: মাদকদ্রব্য ও ক্ষতিকর পানীয়ের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা এবং জনস্বাস্থ্য উন্নত করা।
- অনুচ্ছেদ ৪৮: দুগ্ধজাত ও কর্মক্ষম গবাদিপশু (যেমন গরু ও বাছুর) হত্যা বন্ধ করা এবং পশুপালনের আধুনিকীকরণ।
উদার-বুদ্ধিবৃত্তিক নীতি (Liberal-Intellectual Principles)
এই নীতিগুলি আধুনিক, প্রগতিশীল এবং বিশ্বজনীন ভাবধারার ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
- অনুচ্ছেদ ৪৪: সমগ্র ভারতের নাগরিকদের জন্য অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (Uniform Civil Code – UCC) চালু করা।
- অনুচ্ছেদ ৪৫: ৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রারম্ভিক বাল্যকাল যত্ন ও শিক্ষা প্রদান।
- অনুচ্ছেদ ৪৮A: পরিবেশ, বন এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করা।
- অনুচ্ছেদ ৪৯: জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন ঐতিহাসিক স্মৃতিসৌধ ও স্থান রক্ষা করা।
- অনুচ্ছেদ ৫০: বিচার বিভাগকে শাসন বিভাগ (Executive) থেকে সম্পূর্ণ পৃথক করা।
- অনুচ্ছেদ ৫১: আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা এবং আন্তর্জাতিক আইনকে শ্রদ্ধা জানানো।
সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদসমূহের তালিকা
নিচে পরীক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদগুলি সংক্ষিপ্ত সারণীতে দেওয়া হলো:
| অনুচ্ছেদ (Article) | বিষয়বস্তু (Subject Matter) |
| অনুচ্ছেদ ৩৬ | রাষ্ট্রের সংজ্ঞা (Definition of State) |
| অনুচ্ছেদ ৩৭ | এই নীতিগুলির প্রয়োগ ও প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা |
| অনুচ্ছেদ ৩৯A | সমান বিচার ও বিনামূল্যে আইনি সাহায্য |
| অনুচ্ছেদ ৪০ | গ্রাম পঞ্চায়েতের সংগঠন ও ক্ষমতা |
| অনুচ্ছেদ ৪৪ | অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (Uniform Civil Code) |
| অনুচ্ছেদ ৪৮A | পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষা |
| অনুচ্ছেদ ৫০ | শাসন বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ |
| অনুচ্ছেদ ৫১ | আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা |
মৌলিক অধিকার ও নির্দেশমূলক নীতির মধ্যে পার্থক্য
সংবিধানের এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের মধ্যে বেশ কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে, যা নিচে দেওয়া হলো:
- আইনি ভিত্তি: মৌলিক অধিকার আইন দ্বারা বলবৎযোগ্য (Justiciable)। অধিকার ভঙ্গ হলে সংবিধানে প্রতিকারের পথ রয়েছে। অন্যদিকে নির্দেশমূলক নীতি আইন দ্বারা বলবৎযোগ্য নয় (Non-justiciable)।
- উদ্দেশ্য: মৌলিক অধিকার দেশে রাজনৈতিক গণতন্ত্র বজায় রাখে। পক্ষান্তরে, এই নীতিগুলি দেশে সামাজিক ও অর্থনৈতিক গণতন্ত্র নিশ্চিত করে।
- প্রভাব: মৌলিক অধিকার মূলত ব্যক্তিকেন্দ্রিক। এটি ব্যক্তি নাগরিককে সুরক্ষা দেয়। তবে নির্দেশক নীতিগুলি সমাজকেন্দ্রিক এবং রাষ্ট্রকেন্দ্রিক।
- জরুরি অবস্থা: জাতীয় জরুরি অবস্থার সময় মৌলিক অধিকারের বেশ কিছু ধারা বাতিল বা স্থগিত করা যেতে পারে, কিন্তু এই নির্দেশাত্মক নীতিগুলির ক্ষেত্রে স্থগিতকরণের প্রশ্ন ওঠে না।
নির্দেশমূলক নীতি সমূহের গুরুত্ব ও সীমাবদ্ধতা
সীমাবদ্ধতা:
আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকায় অনেকে এই নীতিগুলিকে কেবল “সংবিধানের কিছু উপদেশ বাণী” বলে সমালোচনা করে থাকেন। সাবেক অর্থমন্ত্রী টি. টি. কৃষ্ণমাচারী এগুলিকে “আবেগের এক আধার” বলে উল্লেখ করেছিলেন।
গুরুত্ব ও সাফল্য:
সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও স্বাধীন ভারতের অগ্রযাত্রায় এই নীতিগুলির অবদান অনস্বীকার্য। সরকার বিভিন্ন সময়ে নীতিগুলি রূপায়ণে নানা আইন প্রণয়ন করেছে:
- জমিদারি প্রথার বিলোপ: অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে এটি কার্যকর করা হয়।
- পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা: ৭৩তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে গ্রাম পঞ্চায়েতকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
- বিনামূল্যে শিক্ষা: ৮৬তম সংশোধনীর মাধ্যমে শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা হয়।
- পরিবেশ সংরক্ষণ: বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন (১৯৭২) ও বন সংরক্ষণ আইন (১৯৮০) প্রণয়ন করা হয়।
- মনরেগা (MGNREGA): কর্মসংস্থানের অধিকার (Article 41) বাস্তবায়নে এটি একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।
আরো পড়ুন: ভারতের রাষ্ট্রপতি:
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত নির্দেশমূলক নীতি কেবল কাগজ-কলমে বন্দি কোনো নিয়মাবলী নয়; এটি একটি ন্যায়পরায়ণ, বৈষম্যহীন এবং সমৃদ্ধ ভারতের দূরদর্শী রূপরেখা। আদালত সরাসরি এগুলি প্রয়োগ করতে না পারলেও, ভারতের সচেতন জনগণ ভোটদানের মাধ্যমে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সরকারকে নীতিগুলি বাস্তবায়নের জন্য দায়বদ্ধ করে তোলে। রাষ্ট্র পরিচালনায় জনকল্যাণ সুনিশ্চিত করতে এই দিকনির্দেশক নীতিগুলির প্রাসঙ্গিকতা আজ অত্যন্ত গভীর।
নির্দেশমূলক নীতি (DPSP) সংক্রান্ত সেরা ২০টি প্রশ্নোত্তর:
১. নির্দেশমূলক নীতি (DPSP) বলতে কী বোঝায়?
নির্দেশমূলক নীতি হলো রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সংবিধান প্রদত্ত কতগুলি মৌলিক দিকনির্দেশনা ও সুপারিশ, যা আইন ও নীতি প্রণয়নের সময় কেন্দ্র, রাজ্য ও স্থানীয় সরকারগুলিকে মনে রাখতে হয়।
২. ভারতীয় সংবিধানে কোন অংশে এবং কত নম্বর অনুচ্ছেদে এটি বর্ণিত আছে?
সংবিধানের চতুর্থ অংশে (Part IV) এবং ৩৬ থেকে ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদে নির্দেশমূলক নীতিসমূহ লিপিবদ্ধ রয়েছে।
৩. এই ধারণাটি কোন দেশের সংবিধান থেকে নেওয়া হয়েছে?
এই ধারণাটি আয়ারল্যান্ডের ১৯৩৭ সালের সংবিধান থেকে নেওয়া হয়েছে (যা তারা মূলতঃ স্পেনের সংবিধান থেকে গ্রহণ করেছিল)।
৪. নির্দেশমূলক নীতি কি আদালতের মাধ্যমে বলবৎযোগ্য (Justiciable)?
না। মৌলিক অধিকারের মতো নির্দেশমূলক নীতিগুলি আইনত বা বিচারবিভাগ দ্বারা বাধ্যবাধকতামূলক নয়। সরকার এগুলি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে আদালতে মামলা করা যায় না।
৫. নির্দেশমূলক নীতির মূল উদ্দেশ্য কী?
এর মূল উদ্দেশ্য হলো ভারতকে একটি জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র (Welfare State) হিসেবে গড়ে তোলা এবং দেশে সামাজিক ও অর্থনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা।
৬. সংবিধানে কি এই নীতিগুলির কোনো আনুষ্ঠানিক শ্রেণিবিভাগ আছে?
না। সংবিধানে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শ্রেণিবিভাগ নেই। তবে মতাদর্শের ভিত্তিতে গবেষকরা এগুলিকে তিনটি ভাগে ভাগ করে আলোচনা করেন: সমাজতান্ত্রিক, গান্ধীবাদী এবং উদার-বুদ্ধিবৃত্তিক নীতি।
৭. সংবিধানের ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদে কী বলা হয়েছে?
৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদে সারা ভারতে সমস্ত নাগরিকদের জন্য একটি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (Uniform Civil Code – UCC) চালু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৮. মৌলিক অধিকার ও নির্দেশমূলক নীতির মধ্যে মূল পার্থক্য কী?
- মৌলিক অধিকার (Part III): রাজনৈতিক গণতন্ত্র বজায় রাখে, ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং আইনত বলবৎযোগ্য।
- নির্দেশমূলক নীতি (Part IV): সামাজিক ও অর্থনৈতিক গণতন্ত্র গড়ে তোলে, সমাজকেন্দ্রিক এবং আইনত অ-বলবৎযোগ্য।
৯. গ্রাম পঞ্চায়েত গঠনের কথা কোন অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে?
৪০ নম্বর অনুচ্ছেদে গ্রাম পঞ্চায়েত গঠন এবং স্বায়ত্তশাসনের ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
১০. ড. বি. আর. আম্বেদকর এই নীতিগুলিকে কীভাবে বর্ণনা করেছেন?
ড. বি. আর. আম্বেদকর নির্দেশমূলক নীতিগুলিকে “ভারতীয় সংবিধানের অনন্য বা অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য” (Novel Features) হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
১১. ৩৯A নম্বর অনুচ্ছেদটি কী সম্পর্কিত?
৩৯A নম্বর অনুচ্ছেদে দরিদ্র ও অনগ্রসর নাগরিকদের জন্য সমান বিচার ও বিনামূল্যে আইনি সহায়তা (Free Legal Aid) প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
১২. শাসন বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক করার কথা কোন অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে?
৫০ নম্বর অনুচ্ছেদে শাসন বিভাগ (Executive) থেকে বিচার বিভাগকে (Judiciary) সম্পূর্ণ পৃথক করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
১৩. ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদের মূল বিষয়বস্তু কী?
৫১ নম্বর অনুচ্ছেদে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা, আন্তর্জাতিক আইনকে শ্রদ্ধা জানানো এবং মধ্যস্থতার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিবাদের নিষ্পত্তির কথা বলা হয়েছে।
১৪. পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষার কথা কোন অনুচ্ছেদে আছে?
৪৮A নম্বর অনুচ্ছেদে পরিবেশ, বন এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও সংবর্ধনের কথা বলা হয়েছে।
১৫. এই অংশে কি কোনো সংবিধান সংশোধনী করা হয়েছে?
হ্যাঁ। উল্লেখযোগ্য সংশোধনীসমূহ:
- ৪২তম সংশোধনী (১৯৭৬): ৩৯A, ৪৩A, এবং ৪৮A ধারা যুক্ত হয়।
- ৪৪তম সংশোধনী (১৯৭৮): ৩৮(২) ধারা যুক্ত করে আয় ও মর্যাদার বৈষম্য কমানোর কথা বলা হয়।
- ৮৬তম সংশোধনী (২০০২): ৪৫ নম্বর অনুচ্ছেদের বিষয়বস্তু পরিবর্তন করে প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ তৈরির কথা বলা হয়।
১৬. মৌলিক অধিকার ও নির্দেশমূলক নীতির মধ্যে সংঘাত হলে কোনটি প্রাধান্য পাবে?
সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায় অনুযায়ী (বিশেষত মিনার্ভা মিলস মামলা, ১৯৮০), সংবিধান মৌলিক অধিকার ও নির্দেশমূলক নীতির ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। তবে মৌলিক অধিকার সাধারণত প্রাধান্য পায়।
১৭. ৪৫ নম্বর অনুচ্ছেদে কী বলা হয়েছে?
৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রারম্ভিক বাল্যকালের যত্ন ও শিক্ষা (Early Childhood Care & Education) প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
১৮. নির্দেশমূলক নীতির ভিত্তিতে বাস্তবায়িত কিছু আইন বা প্রকল্পের নাম কী?
- মনরেগা (MGNREGA): কর্মসংস্থানের অধিকার (Article 41)।
- মাতৃত্বকালীন সুবিধা আইন: মাতৃত্বকালীন ত্রাণ (Article 42)।
- পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা (৭৩তম সংশোধনী): গ্রাম শাসন (Article 40)।
- বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন (১৯৭২): পরিবেশ সুরক্ষা (Article 48A)।
১৯. সংবিধান প্রণেতারা কেন এগুলিকে আইনি বাধ্যবাধকতামূলক করেননি?
স্বাধীনতার সময়ে নতুন ভারতের পর্যাপ্ত আর্থিক সম্পদ, প্রশাসনিক পরিকাঠামো এবং সামাজিক প্রস্তুতির অভাব ছিল বলে এগুলিকে সরাসরি আদালতের অধীনে বাধ্যতামূলক করা হয়নি।
২০. ৩৬ নম্বর অনুচ্ছেদে কী বলা আছে?
৩৬ নম্বর অনুচ্ছেদে ‘রাষ্ট্র’ (State)-এর সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, যা মৌলিক অধিকারের সংজ্ঞার (Article 12) অনুরূপ।