রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতি: Directive Principles of State Policy.
ভারতের সংবিধান শুধুমাত্র একটি শাসনতান্ত্রিক আইনগ্রন্থ নয়, বরং এটি একটি আধুনিক, প্রগতিশীল এবং জনকল্যাণকামী রাষ্ট্র (Welfare State) গড়ে তোলার এক অনন্য মহাপরিকল্পনা। একটি স্বাধীন দেশের সরকার কীভাবে নীতি নির্ধারণ করবে, দেশের নাগরিকদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে—তারই একটি স্পষ্ট এবং সুদূরপ্রসারী দিকনির্দেশনা রয়েছে আমাদের সংবিধানে। আর এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রূপরেখাকেই বলা হয় রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতি (Directive Principles of State Policy – DPSP)।
আজকের এই বিস্তারিত নিবন্ধে আমরা ভারতীয় সংবিধানের চতুর্থ অংশে বর্ণিত রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করব। এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, গুরুত্ব, বিভিন্ন ধারা, শ্রেণীবিভাগ এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে পোস্টটি শেষ পর্যন্ত পড়ুন।
রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতি কী? (What is DPSP?)
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতি হলো সংবিধান কর্তৃক দেশের কেন্দ্রীয়, রাজ্য এবং স্থানীয় সরকার বা প্রশাসনের প্রতি কিছু ইতিবাচক নির্দেশনাবলী। দেশের আইনসভা যখন কোনো নতুন আইন তৈরি করবে কিংবা প্রশাসন যখন কোনো নতুন নীতি নির্ধারণ করবে, তখন তাদের এই নীতিগুলোকে আদর্শ হিসেবে মাথায় রাখতে হবে।
সংবিধানের ধারা ৩৭ অনুযায়ী: এই নীতিগুলো দেশের শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি (Fundamental in the governance of the country)। আইন প্রণয়নের সময় এই নীতিগুলিকে প্রয়োগ করা রাষ্ট্রের প্রধান কর্তব্য হবে।
১. উৎস (Source):
এই ধারণার মূল উৎস হলো আয়ারল্যান্ডের সংবিধান (Irish Constitution, 1937)। আয়ারল্যান্ড আবার এই নীতিটি গ্রহণ করেছিল স্পেনের সংবিধান থেকে।
২. সংবিধানের অবস্থান:
ভারতীয় সংবিধানের চতুর্থ খণ্ডে (Part IV) এবং ৩৬ থেকে ৫১ নম্বর ধারায় রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতিসমূহ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।
৩. আইনি প্রকৃতি:
এই নীতিগুলো আদালত কর্তৃক বলবৎযোগ্য নয় (Non-justiciable)। অর্থাৎ, সরকার যদি এই নীতিগুলোর কোনো একটি বাস্তবায়ন করতে না পারে, তবে দেশের কোনো নাগরিক তার বিরুদ্ধে আদালতে গিয়ে মামলা করতে পারবেন না বা রাষ্ট্রকে তা করতে বাধ্য করতে পারবেন না।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও দর্শনের উৎস
১৯৪৭ সালে ভারত যখন ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে, তখন দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক ছিল। দেশের এক বিশাল অংশ দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, কুসংস্কার এবং তীব্র সামাজিক বৈষম্যের শিকার ছিল। সংবিধান সভার দূরদর্শী সদস্যরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, একটি সদ্য স্বাধীন দেশের পক্ষে রাতারাতি সমস্ত নাগরিককে সমস্ত প্রকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কারণ তার জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন, যা তৎকালীন ভারতের ছিল না।
এই সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধানের জন্য ১৯৪৫ সালের সাপ্রু কমিটির (Sapru Committee) রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে নাগরিকদের অধিকারকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়:
- আদালত কর্তৃক বলবৎযোগ্য অধিকার: যা সংবিধানের তৃতীয় খণ্ডে (Part III) ‘মৌলিক অধিকার’ (Fundamental Rights) হিসেবে স্থান পায়।
- আদালত কর্তৃক অবলবৎযোগ্য অধিকার: যা চতুর্থ খণ্ডে (Part IV) রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতি হিসেবে যুক্ত করা হয়, যাতে দেশ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সাথে সাথে এগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা যায়।
সংবিধানের জনক ড. বি. আর. আম্বেদকর এই নীতিগুলোকে ভারতীয় সংবিধানের একটি ‘অনন্য বৈশিষ্ট্য’ (Novel Features) হিসেবে অবিহিত করেছিলেন। অন্যদিকে বিখ্যাত সংবিধান বিশেষজ্ঞ গ্র্যানভিল অস্টিন মৌলিক অধিকার ও নির্দেশমূলক নীতিকে একসঙ্গে ‘সংবিধানের বিবেক’ (Conscience of the Constitution) বলে বর্ণনা করেছেন।
রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতি এর মূল শ্রেণীবিভাগ
যদিও ভারতীয় সংবিধানে এই নীতিগুলোর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা আনুষ্ঠানিক শ্রেণীবিভাগ করা হয়নি, তবে এদের অন্তর্নিহিত আদর্শ, উদ্দেশ্য ও দর্শনের ওপর ভিত্তি করে সমাজবিজ্ঞানীরা ও আইনজ্ঞরা একে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন:
- সমাজতান্ত্রিক নীতি (Socialistic Principles)
- গান্ধীবাদী নীতি (Gandhian Principles)
- উদার-বৌদ্ধিক নীতি (Liberal-Intellectual Principles)
নিচে এই তিনটি ভাগের অধীনে থাকা গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো:
১. সমাজতান্ত্রিক নীতি (Socialistic Principles)
এই নীতিগুলোর মূল লক্ষ্য হলো ভারতে সমাজতন্ত্রের রূপরেখা তৈরি করা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসমতা দূর করা এবং একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্র গঠন করা। এর আওতাধীন প্রধান ধারাগুলো হলো:
- ধারা ৩৮: জনগণের কল্যাণের জন্য সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে একটি সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং আয়ের বৈষম্য হ্রাস করা।
- ধারা ৩৯: পুরুষ ও নারী নির্বিশেষে সমস্ত নাগরিকের পর্যাপ্ত জীবিকার অধিকার নিশ্চিত করা, সমাজের যৌথ কল্যাণের জন্য দেশের ভৌত সম্পদের সুষম বণ্টন, সম্পদের একচেটিয়া কেন্দ্রীভবন রোধ করা এবং সমান কাজের জন্য সমান মজুরি প্রদান।
- ধারা ৩৯ (ক): দরিদ্র এবং অনগ্রসরদের জন্য বিনামূল্যে আইনি সহায়তা (Free Legal Aid) প্রদান এবং সমান ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
- ধারা ৪১: বেকারত্ব, বার্ধক্য, অসুস্থতা এবং অক্ষমতার ক্ষেত্রে কাজের অধিকার, শিক্ষার অধিকার এবং সরকারি সাহায্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা।
- ধারা ৪২: কাজের মানবিক ও ন্যায়সংগত পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং প্রসূতি সহায়তা (Maternity Relief) প্রদান করা।
- ধারা ৪৩: সমস্ত শ্রমিকের জন্য জীবনধারণের উপযোগী মজুরি (Living Wage), ভালো জীবনযাত্রার মান এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সুযোগ নিশ্চিত করা।
- ধারা ৪৩ (ক): বিভিন্ন শিল্প ও কারখানার ব্যবস্থাপনায় শ্রমিকদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া।
- ধারা ৪৭: জনগণের পুষ্টির স্তর ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধন করা।
২. Gandhian Principles (গান্ধীবাদী নীতি)
জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর জাতীয় আন্দোলন, গ্রাম স্বরাজ ও পুনর্গঠন কর্মসূচির আদর্শের ওপর ভিত্তি করে এই নীতিগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গ্রামীণ ভারতের আত্মনির্ভরতা ও উন্নয়নই ছিল এর মূল লক্ষ্য:
- ধারা ৪০: গ্রাম পঞ্চায়েত গঠন করা এবং স্বায়ত্ত শাসনের ইউনিট হিসেবে কাজ করার জন্য তাদের প্রয়োজনীয় ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব প্রদান করা।
- ধারা ৪৩: গ্রামীণ এলাকায় ব্যক্তিগত বা সমবায় ভিত্তিতে কুটির শিল্পের (Cottage Industries) বিকাশ ঘটানো।
- ধারা ৪৩ (খ) [৯৭তম সংশোধনী, ২০১১]: সমবায় সমিতিগুলির (Co-operative Societies) স্বেচ্ছামূলক গঠন, স্বায়ত্তশাসিত কাজকর্ম, গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ এবং পেশাদারী ব্যবস্থাপনার উন্নতি করা।
- ধারা ৪৬: সমাজের অনগ্রসর শ্রেণী, বিশেষ করে তফশিলি जाति (SC), তফশিলি উপজাতি (ST) এবং অন্যান্য দুর্বল শ্রেণীর শিক্ষাগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থের উন্নয়ন ঘটানো এবং তাদের সামাজিক অন্যায় ও শোষণ থেকে রক্ষা করা।
- ধারা ৪৭: জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করে এমন ক্ষতিকারক মাদক, নেশাজাতীয় দ্রব্য ও মদ্যপান নিষিদ্ধ করা।
- ধারা ৪৮: গবাদি পশু, বিশেষ করে গাভী, বাছুর এবং অন্যান্য দুগ্ধবতী পশুর জবাই নিষিদ্ধ করা এবং তাদের বংশবৃদ্ধি ও দুগ্ধ উৎপাদন ব্যবস্থার উন্নতি করা।
৩. উদার-বৌদ্ধিক নীতি (Liberal-Intellectual Principles)
এই নীতিগুলো আধুনিকতা এবং উদারতাবাদের আদর্শকে প্রতিফলিত করে। এর মূল ধারাগুলো হলো:
- ধারা ৪৪: ভারতের সমগ্র ভূখণ্ডে সমস্ত ধর্মের নাগরিকদের জন্য একটি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (Uniform Civil Code – UCC) কার্যকর করার চেষ্টা করা।
- ধারা ৪৫: সমস্ত শিশুর জন্য ৬ বছর বয়স পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত প্রাথমিক শৈশবকালীন যত্ন (Early Childhood Care) এবং শিক্ষার ব্যবস্থা করা।
- ধারা ৪৮: আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে কৃষি ও পশুপালন ব্যবস্থার সংগঠন করা।
- ধারা ৪৮ (ক) [৪২তম সংশোধনী, ১৯৭৬]: পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন এবং দেশের বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ করা।
- ধারা ৪৯: জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন ও আইন দ্বারা ঘোষিত স্মৃতিস্তম্ভ, স্থান ও ঐতিহাসিক বস্তুসমূহকে ধ্বংস, ক্ষতি বা বিকৃতি থেকে রক্ষা করা।
- ধারা ৫০: রাষ্ট্রের জনস্বার্থমূলক কাজে বিচারবিভাগকে শাসনবিভাগ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক করা (Separation of Judiciary from Executive)।
- ধারা ৫১: আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা, বিভিন্ন দেশের মধ্যে সম্মানজনক ও ন্যায়সংগত সম্পর্ক গড়ে তোলা, আন্তর্জাতিক আইন ও চুক্তির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা এবং সালিশির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিবাদের নিষ্পত্তি করা।
মৌলিক অধিকার এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতি এর মধ্যে পার্থক্য
ভারতীয় শাসনব্যবস্থায় মৌলিক অধিকার (Part III) এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতি (Part IV) দুটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। তবে এদের আইনি প্রকৃতি ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে, যা নিচে টেবিলের মাধ্যমে দেখানো হলো:
| পার্থক্যের বিষয় | মৌলিক অধিকার (Fundamental Rights) | রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতি (DPSP) |
| ১. উৎস ও দেশ | এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের (USA) বিল অব রাইটস থেকে অনুপ্রাণিত। | এটি আয়ারল্যান্ডের (Ireland) সংবিধান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নেওয়া হয়েছে। |
| ২. আইনি প্রকৃতি | এগুলি আদালত কর্তৃক বলবৎযোগ্য (Justiciable)। ক্ষুণ্ণ হলে সুপ্রিম কোর্ট বা হাইকোর্টে যাওয়া যায়। | এগুলি আদালত কর্তৃক বলবৎযোগ্য নয় (Non-justiciable)। লঙ্ঘিত হলে আদালতের শরণাপন্ন হওয়া যায় না। |
| ৩. মূল উদ্দেশ্য | দেশে রাজনৈতিক গণতন্ত্র (Political Democracy) প্রতিষ্ঠা করা এর মূল লক্ষ্য। | দেশে সামাজিক ও অর্থনৈতিক গণতন্ত্র এবং কল্যাণকামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা এর লক্ষ্য। |
| ৪. দৃষ্টিভঙ্গি | এগুলি মূলত নেতিবাচক, কারণ এগুলি রাষ্ট্রের ক্ষমতার ওপর বাধানিষেধ বা সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। | এগুলি ইতিবাচক, কারণ এগুলি রাষ্ট্রকে জনকল্যাণে নির্দিষ্ট কিছু কাজ করার নির্দেশ বা উৎসাহ দেয়। |
| ৫. স্থায়িত্ব | জাতীয় জরুরি অবস্থার সময় (ধারা ২০ ও ২১ বাদে) মৌলিক অধিকার স্থগিত করা যেতে পারে। | এগুলি স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থগিত করার প্রয়োজন হয় না, বরং স্থায়ী আইন প্রণয়নের মাধ্যমে ধাপে ধাপে কার্যকর করা হয়। |
| ৬. প্রয়োগ বা বাস্তবায়ন | এগুলি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বলবৎ থাকে। কার্যকর করার জন্য আলাদা কোনো আইনের প্রয়োজন হয় না। | এগুলি সরাসরি কার্যকর নয়। এগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে রাষ্ট্রকে নির্দিষ্ট আইন বা প্রকল্প তৈরি করতে হয়। |
| ৭. লক্ষ্যবস্তু | এটি মূলত ব্যক্তিবিশেষের অধিকার রক্ষা করে (Individualistic)। | এটি সমগ্র সমাজের কল্যাণ সাধন করতে চায় (Socialistic & Collectivist)। |
মৌলিক অধিকার বনাম নির্দেশমূলক নীতি: ঐতিহাসিক আইনি লড়াই
সংবিধানের এই দুটি অংশের মধ্যে কোনটি বেশি শক্তিশালী বা কার গুরুত্ব বেশি, তা নিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে বহু বছর ধরে আইনি লড়াই চলেছে। এই বিবর্তনের প্রধান মামলাগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
- চম্পকম দোরাইরাজন মামলা (১৯৫১): সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় যে, মৌলিক অধিকার এবং নির্দেশমূলক নীতির মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিলে মৌলিক অধিকারই প্রাধান্য পাবে। নির্দেশমূলক নীতি মৌলিক অধিকারের “সহায়ক” (Subsidiary) হিসেবে কাজ করবে।
- গোলকনাথ মামলা (১৯৬৭): এই মামলায় আদালত জানায় যে, নির্দেশমূলক নীতি বাস্তবায়নের জন্য মৌলিক অধিকারকে খর্ব বা সংশোধন করা যাবে না।
- केशवानंद भारती মামলা (১৯৭৩): আদালত নির্দেশমূলক নীতির গুরুত্ব স্বীকার করে এবং জানায় যে সংবিধানের ২৪ নম্বর সংশোধনী বৈধ, তবে সংসদের এমন কোনো ক্ষমতা নেই যা সংবিধানের ‘মূল কাঠামো’ (Basic Structure) ধ্বংস করতে পারে।
- মিনার্ভা মিলস মামলা (১৯৮০): এই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট একটি ঐতিহাসিক রায় দেয়। আদালত বলে যে—ভারতীয় সংবিধান মূলত মৌলিক অধিকার (Part III) এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতি (Part IV) এর মধ্যে একটি সুষম ভারসাম্যের (Bedrock of balance) ওপর দাঁড়িয়ে আছে। একটিকে বাদ দিয়ে অপরটির পূর্ণতা আসে না। তারা একে অপরের পরিপূরক।
রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতি এর গুরুত্ব ও সমালোচনা
গুরুত্ব কেন অপরিসীম?
আদালত দ্বারা সরাসরি বলবৎযোগ্য না হলেও দেশের বাস্তব শাসনব্যবস্থায় এর গুরুত্ব অনন্য। এর প্রধান কারণগুলো হলো:
- স্থিতিশীলতা ও ধারাবাহিকতা: গণতান্ত্রিক দেশে ঘনঘন সরকার পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু এই নীতিগুলো থাকার কারণে দলমত নির্বিশেষে যেকোনো সরকারের মূল লক্ষ্য ও জাতীয় নীতি একই থাকে।
- কল্যাণকামী রাষ্ট্রের মজবুত ভিত্তি: এটি ভারতকে ব্রিটিশ আমলের পুলিশি রাষ্ট্র (Police State) থেকে একটি আধুনিক জনকল্যাণকামী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে।
- আদালতের আলোকবর্তিকা: কোনো আইনের সাংবিধানিক বৈধতা বিচার করার সময় সুপ্রিম কোর্ট বা হাইকোর্ট প্রায়শই নির্দেশমূলক নীতির সাহায্য নেয়। যদি দেখা যায় কোনো আইন DPSP বাস্তবায়নের জন্য তৈরি হয়েছে, তবে আদালত তাকে বৈধ বলে ঘোষণা করতে পারে।
- জনগণের রায় ও নৈতিক চাপ: সরকার এই নীতিগুলো বাস্তবায়নে অবহেলা করলে সাধারণ মানুষ নির্বাচনের মাধ্যমে ব্যালট বক্সে তার জবাব দিতে পারে। তাই এর পেছনে কোনো আইনি শক্তি না থাকলেও ‘জনমত’ বা ‘রাজনৈতিক শক্তি’ রয়েছে।
সমালোচনা
অনেক সংবিধান বিশেষজ্ঞ আবার এই নীতির কার্যকারিতা নিয়ে কড়া সমালোচনাও করেছেন। ব্রিটিশ আইনবিদ স্যার আইভর জেনিংসের মতে, এটি কেবলই কিছু “পবিত্র আকাঙ্ক্ষা” (Pious Aspirations)। প্রধান সমালোচনাগুলো হলো:
- আইনি শক্তির অভাব (No Legal Sanction): আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যায় না বলে সমালোচকরা একে “নববর্ষের শুভেচ্ছা বার্তার” সাথে তুলনা করেছেন, যা বছরের শুরুতে তৈরি হয় কিন্তু পরে কেউ মনে রাখে না।
- অযৌক্তিক বিন্যাস: সমালোচকদের মতে, এই নীতিগুলোকে সংবিধানে কোনো সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক, ক্রমানুসার বা যৌক্তিক উপায়ে সাজানো হয়নি। সমাজতান্ত্রিক, গান্ধীবাদী ও আন্তর্জাতিক নীতিগুলো একসাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে।
- সংবিধানের রক্ষণশীলতা: অনেকের মতে এই নীতিগুলোর কিছু অংশ (যেমন কুটির শিল্প বা গো-বধ নিধনের মতো ধারা) ১৯ শতকের চিন্তাভাবনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বায়নের যুগে কতটা প্রাসঙ্গিক তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
নির্দেশমূলক নীতি বাস্তবায়নে ভারতের কিছু সফল পদক্ষেপ
স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত ভারতের কেন্দ্রীয় এবং বিভিন্ন রাজ্য সরকারগুলো রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অসংখ্য যুগান্তকারী আইন, যোজনা ও প্রকল্প গ্রহণ করেছে। নিচে কিছু বাস্তব উদাহরণ দেওয়া হলো:
- পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা (ধারা ৪০): ১৯৯২ সালের ৭৩ তম এবং ৭৪ তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে গ্রামীণ পঞ্চায়েত এবং শহুরে পৌরসভাকে সাংবিধানিক রূপ দেওয়া হয়েছে।
- বিনামূল্যে শিক্ষা (ধারা ৪৫): ২০০২ সালের ৮৬ তম সংশোধনীর মাধ্যমে ধারা ২১(ক) যুক্ত করে ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সীদের জন্য শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার করা হয়েছে এবং ২০০৯ সালে আরটিই (RTE) আইন পাস করা হয়েছে।
- মনরেগা বা ১০০ দিনের কাজ (ধারা ৪১): গ্রামীণ মানুষের কাজের অধিকার নিশ্চিত করতে ‘মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা আইন’ (MGNREGA) চালু করা হয়।
- মাতৃত্বকালীন সুবিধা আইন (ধারা ৪২): কর্মজীবী নারীদের স্বাস্থ্য ও সুরক্ষার জন্য বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটির সময়সীমা বাড়িয়ে ২৬ সপ্তাহ করা হয়েছে।
- বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ সংরক্ষণ (ধারা ৪৮ক): পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন (১৯body২), ব্যাঘ্র প্রকল্প (Project Tiger) এবং বন সংরক্ষণ আইন (১৯৮০) কার্যকর করা হয়েছে।
- বিনামূল্যে আইনি সহায়তা (ধারা ৩৯ক): ১৯৮৭ সালে ‘আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষ আইন’ (NALSA) পাসের মাধ্যমে গরিবদের জন্য লোক আদালত এবং বিনামূল্যে আইনি সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
- খাদ্য নিরাপত্তা আইন (ধারা ৪৭): ২০১৩ সালের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে দেশের কোটি কোটি দরিদ্র মানুষকে অত্যন্ত কম মূল্যে বা বিনামূল্যে চাল ও গম সরবরাহ করা হচ্ছে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতি হলো ভারতীয় সংবিধানের এমন এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা, যা অন্ধকার, দারিদ্র্য ও বৈষম্য দূর করে একটি সাম্যবাদী ও প্রগতিশীল সমাজ গঠনের পথ দেখায়। মৌলিক অধিকার যদি ভারতীয় নাগরিকের বাহ্যিক অবয়ব বা শরীরের মতো হয়, তবে নির্দেশমূলক নীতি হলো তার অন্তরের আত্মা। আদালতের কঠোর সিলমোহর না থাকলেও নৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে এই নীতিগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। একটি প্রকৃত উন্নত, স্বাবলম্বী ও বৈষম্যহীন ভারত গড়ে তুলতে এই নীতিগুলোর প্রতিটি ধারার পূর্ণাঙ্গ ও সঠিক বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
১. রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতি সংবিধানের কোন অংশে রয়েছে?
উত্তর: এটি ভারতীয় সংবিধানের চতুর্থ খণ্ডে (Part IV) ধারা ৩৬ থেকে ৫১ এর মধ্যে স্থান পেয়েছে।
২. এই নীতিগুলি কি আদালত দ্বারা বলবৎযোগ্য?
উত্তর: না, ধারা ৩৭ অনুযায়ী এগুলি আদালত কর্তৃক বলবৎযোগ্য নয় (Non-justiciable)। অর্থাৎ সরকার এগুলি পালন না করলে আদালতে মামলা করা যায় না।
৩. নির্দেশমূলক নীতি কোন দেশের সংবিধান থেকে নেওয়া হয়েছে?
উত্তর: এটি ১৯৩৭ সালের আয়ারল্যান্ডের (Ireland) সংবিধান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ভারতীয় সংবিধানে যুক্ত করা হয়েছে।
৪. অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (Uniform Civil Code) কত নম্বর ধারায় বর্ণিত আছে?
উত্তর: সংবিধানের ৪৪ নম্বর ধারায় ভারতের সমগ্র ভূখণ্ডে একটি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৫. কোন সংশোধনীর মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণের ধারাটি যুক্ত হয়?
উত্তর: ১৯৭৬ সালের ৪২তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে ধারা ৪৮(ক) যুক্ত করে পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের কথা বলা হয়।