ভূমিকা:
WBBSE বোর্ড পরীক্ষার সেরা প্রস্তুতির জন্য Class 7 History Chapter 1 Question Answer বা সপ্তম শ্রেণির ইতিহাস প্রথম অধ্যায় ‘ইতিহাসের ধারণা’-র সংক্ষিপ্ত ও রচনাভিত্তিক প্রশ্নোত্তর ভালোভাবে অনুশীলন করা অত্যন্ত জরুরি। ইতিহাস কেবল শুকনো সাল-তারিখ মুখস্থ করার বিষয় নয়; এটি অতীত সমাজ, রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশের এক ধারাবাহিক বিবরণ। এই অধ্যায়ে ঐতিহাসিক উপাদান, প্রাক-ইতিহাস ও আদি-মধ্যযুগের ধারণা এবং সময় গণনার পদ্ধতি সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আজকের এই আর্টিকেলে Class 7 History Chapter 1 Question Answer পর্বের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ১, ২ ও ৫ নম্বরের প্রশ্ন এবং নির্ভুল উত্তর তুলে ধরা হলো, যা শিক্ষার্থীদের সম্পূর্ণ অধ্যায়টির মূল ভাবনা অনুধাবন করতে এবং পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে সাহায্য করবে।
Class 7 History Chapter 1. ইতিহাসের ধারণা মূল বিষয়বস্তু:
- ইতিহাসের সংজ্ঞা ও সময়কাল: ইতিহাস হলো মানুষের অতীতের ধারাবাহিক বিবরণ। এটি অনুধাবনের জন্য সাল-তারিখ, শতাব্দী, সহস্রাব্দ এবং ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট বোঝার গুরুত্ব অপরিসীম।
- উপাদান ও ঐতিহাসিক: ঐতিহাসিকগণ প্রত্নতাত্ত্বিক, লিখিত ও মৌখিক উপাদানের টুকরো জোড়া লাগিয়ে অতীতকে পুনর্গঠন করেন। এই কাজে তাদের সতর্কতা, ধৈর্য, যুক্তি, নিরপেক্ষতা ও সুসংহত কল্পনাশক্তির প্রয়োজন হয়।
- ইতিহাসের ফাঁক ও গোয়েন্দা রূপক: ঐতিহাসিক উপাদানের অপূর্ণতার কারণে ইতিহাসে কিছু ফাঁক বা অন্তরাল থেকে যায়। ঐতিহাসিকরা ঠিক একজন গোয়েন্দার মতোই সূত্র (Clue) খুঁজে যুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সেই ফাঁক পূরণের চেষ্টা করেন।
- মধ্যযুগের ভারত ও সমাজজীবন: মধ্যযুগের অর্থনীতি (কৃষি ও বাণিজ্য), ধর্মীয় পরিবর্তন (ভক্তি আন্দোলন), আঞ্চলিক ভাষার বিকাশ এবং সমাজব্যবস্থার বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয় কীভাবে ‘পরদেশি’ বা ‘অজনবি’ জাতীয় শব্দ ও ধারণাসমূহ সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়।
শিক্ষার্থীদের ইতিহাসকে কেবল মুখস্থবিদ্যার বদলে একটি যুক্তিভিত্তিক ও রোমাঞ্চকর অনুসন্ধান হিসেবে উপস্থাপন করতে এই প্রশ্নোত্তর সিরিজটি অত্যন্ত কার্যকর।

Class 7 History Chapter 1. ইতিহাসের ধারণা সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর:
আরো পড়ুন: সুলতানি যুগ (Delhi Sultanate)
Class 7 History Chapter 1: ১ নম্বরের অতি-সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
১. ইতিহাস বর্ণনা করার সময় কোন বিষয়গুলির ওপর আপাতভাবে জোর দেওয়া হয়?
উত্তর: ইতিহাস বর্ণনা করার সময় স্থান, কাল এবং পাত্র—এই তিনটি বিষয়ের ওপর আপাতভাবে জোর দেওয়া হয়।
২. একটি নদীমাতৃক সভ্যতার নাম লেখো।
উত্তর: প্রাচীন ভারতে গড়ে ওঠা সিন্ধু সভ্যতা হলো একটি বিখ্যাত নদীমাতৃক সভ্যতা।
৩. ভারতবর্ষের নামটি কোন জনগোষ্ঠীর নামানুসারে হয়েছে?
উত্তর: প্রাচীন বৈদিক যুগের ‘ভরত’ নামক জনগোষ্ঠীর নামানুসারে আমাদের দেশের নাম ‘ভারতবর্ষ’ হয়েছে।
৪. ভারতবর্ষকে উত্তর ও দক্ষিণ অংশে ভাগ করেছে কোন পর্বত?
উত্তর: ভৌগোলিক দিক থেকে বিন্ধ্য পর্বত ভারতবর্ষকে উত্তর ও দক্ষিণ—এই দুটি অংশে বিভক্ত করেছে।
৫. দাক্ষিণাত্য অঞ্চলের সীমানা বিন্ধ্য পর্বত থেকে কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত?
উত্তর: দাক্ষিণাত্য অঞ্চলের ভৌগোলিক সীমানা উত্তর ভারতের বিন্ধ্য পর্বত থেকে দক্ষিণে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত বিস্তৃত।
৬. যে-কোনো একটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের নাম লেখো।
উত্তর: প্রাচীন স্থাপত্য ও ভাস্কর্য (যেমন: পুরোনো মন্দির, স্তূপ বা রাজপ্রাসাদ) হলো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের অন্যতম উদাহরণ।
৭. হাজার হাজার বছর ধরে পৃথিবীতে যখন বরফ জমেছিল, তখন তাকে কী বলা হতো?
উত্তর: হাজার হাজার বছর ধরে পৃথিবীর সিংহভাগ অংশ যখন বরফে আবৃত ছিল, সেই দীর্ঘ সময়কালকে ‘তুষার যুগ’ বলা হতো।
৮. প্রাক্-ইতিহাস বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: প্রাক্-ইতিহাস বলতে বোঝায় ইতিহাসের শুরুর আগের সময়কালকে, অর্থাৎ যখন মানুষ লেখার শিল্প বা লিপি আয়ত্ত করতে পারেনি।
৯. কুষাণ বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা কে ছিলেন?
উত্তর: কুষাণ বংশের শ্রেষ্ঠ এবং সর্বাধিক বিখ্যাত রাজা ছিলেন সম্রাট কনিষ্ক।
১০. হর্ষাব্দ গণনা কত খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু হয়?
উত্তর: সম্রাট হর্ষবর্ধনের সিংহাসনারোহণের বছর অর্থাৎ ৬০৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ‘হর্ষাব্দ’ গণনা শুরু হয়।
১১. কার জন্মসাল থেকে খ্রিস্টাব্দ গণনা চালু হয়?
উত্তর: প্রবর্তক জিশুখ্রিস্টের জন্মবছরকে ভিত্তি করে বিশ্বজুড়ে ‘খ্রিস্টাব্দ’ (AD) গণনা চালু হয়।
১২. কবে থেকে গুপ্তাব্দ গণনা শুরু হয়?
উত্তর: গুপ্ত সম্রাট প্রথম চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকালে, প্রায় ৩১৯-৩২০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ ‘গুপ্তাব্দ’ গণনা শুরু হয়।
১৩. খ্রিস্টাব্দ গোনা হয় কীভাবে?
উত্তর: খ্রিস্টাব্দ সবসময় ছোটো থেকে বড়ো হিসেবে ক্রমবর্ধিষ্ণু ধারায় (যেমন: ১, ২, ৩… ১৯৪৭, ২০২৪) গণনা করা হয়।
১৪. ‘প্রশস্তি’ শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: প্রাচীন শিলালেখের প্রসঙ্গে ‘প্রশস্তি’ শব্দের অর্থ হলো কোনো রাজা বা ব্যক্তির গুণগান বা প্রশংসা করা।
১৫. খ্রিস্টপূর্বাব্দ বলতে কী বোঝো?
উত্তর: জিশুখ্রিস্টের জন্মের আগের সময়কালকে ‘খ্রিস্টপূর্বাব্দ’ (BC) বলে, যা কালের নিয়মে বড় থেকে ছোটোর দিকে উল্টোভাবে গোনা হয়।
১৬. কোথায় প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন যত্ন করে রাখা থাকে?
উত্তর: প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান থেকে উদ্ধার হওয়া সমস্ত প্রাচীন নিদর্শন সংগ্রহশালা বা জাদুঘরে (Museum) যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করা হয়।
১৭. ভারতের সর্বপ্রাচীন গ্রন্থের নাম কী?
উত্তর: ভারতের সর্বপ্রাচীন সাহিত্যিক নিদর্শন তথা প্রাচীনতম গ্রন্থ হলো ‘ঋগ্বেদ’।
১৮. প্রাচীন ভারতের একটি ধর্মনিরপেক্ষ সাহিত্যের নাম লেখো।
উত্তর: পাণিনির লেখা সংস্কৃত ব্যাকরণ গ্রন্থ ‘অষ্টাধ্যায়ী’ হলো প্রাচীন ভারতের একটি উল্লেখযোগ্য ধর্মনিরপেক্ষ সাহিত্য।
১৯. শক-কুষাণদের ইতিহাস প্রধানত কোথা থেকে জানা যায়?
উত্তর: তৎকালীন লিখিত নথির অভাবে শক ও কুষাণ রাজাদের ইতিহাস মূলত তাঁদের প্রচলিত প্রাচীন মুদ্রা থেকে জানা যায়।
২০. ‘হর্ষচরিত’ বইটি কে লেখেন?
উত্তর: সম্রাট হর্ষবর্ধনের সভাকবি বাণভট্ট ‘হর্ষচরিত’ গ্রন্থটি রচনা করেন।
২১. বাণভট্টের ‘হর্ষচরিত’ কী ধরনের গ্রন্থ?
উত্তর: বাণভট্টের রচিত ‘হর্ষচরিত’ হলো একটি প্রাচীন ঐতিহাসিক জীবনীমূলক কাব্যগ্রন্থ।
২২. সময়ের হিসাব সাধারণত কীভাবে করা হয়?
উত্তর: সাল, তারিখ, মাস, বছর, শতাব্দী ও অব্দ প্রভৃতির সাহায্যে ইতিহাসে সময়ের সুনির্দিষ্ট হিসাব করা হয়।
২৩. শতাব্দ ও সহস্রাব্দ কী?
উত্তর: পর পর ১০০ বছরের সময়কালকে ‘শতাব্দী’ বা ‘শতাব্দ’ এবং ১০০০ বছরের সময়কালকে ‘সহস্রাব্দ’ বলা হয়।
২৪. শিলালেখ কাকে বলে?
উত্তর: প্রাচীনকালে পাথরের গায়ে বা পাহাড়ের গুহায় খোদাই করে লেখা রাজাদেশ বা নথিপত্রকে শিলালেখ বলে (যেমন: সম্রাট অশোকের শিলালেখ)।
২৫. সাহিত্যিক উপাদান বলতে কী বোঝো?
উত্তর: ইতিহাস রচনার কাজে ব্যবহৃত প্রাচীন লিখিত গ্রন্থাবলিকে সাহিত্যিক উপাদান বলে (যেমন: রামায়ণ, মহাভারত বা বিভিন্ন ভ্রমণকাহিনি)।
Class 7 History Chapter 1: ২ নম্বরের সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
১. প্রত্নতাত্ত্বিকদের মূল কাজ কী?
উত্তর: প্রত্নতাত্ত্বিকদের প্রধান কাজ হলো ইতিহাসের বিভিন্ন উপাদান সংগ্রহের উদ্দেশ্যে সম্ভাব্য প্রাচীন প্রত্নক্ষেত্রে খননকার্য চালানো এবং মাটির নিচে পাওয়া বস্তুগুলির বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করে অতীতের ইতিহাস পুনর্গঠন করা।
২. প্রত্নক্ষেত্র বলতে কী বোঝো?
উত্তর: প্রাচীনকালের সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ বা প্রত্নবস্তু খুঁজে বের করার উদ্দেশ্যে পুরাতত্ত্ববিদরা মাটির নিচে যে নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলে পরিকল্পিতভাবে খননকার্য চালান, তাকে প্রত্নক্ষেত্র বলা হয়।
৩. নদীমাতৃক সভ্যতা বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: প্রাচীনকালে জীবনধারণের জন্য মানুষ পানির প্রয়োজনীয়তা ও উর্বর পলিমাটির টানে নদী উপত্যকায় বসবাস শুরু করে। নদীকে কেন্দ্র করে কৃষি, পশুপালন ও বাণিজ্যনির্ভর যে সভ্যতাগুলি (যেমন: সিন্ধু সভ্যতা) গড়ে ওঠে, সেগুলিকে নদীমাতৃক সভ্যতা বলা হয়।
৪. সমতল অঞ্চলের লোকেরা প্রধান খাদ্য হিসেবে ভাত গ্রহণ করে কেন?
উত্তর: সমতল অঞ্চলের পলিমাটি ও পর্যাপ্ত জলবায়ু ধান চাষের পক্ষে অত্যন্ত উপযুক্ত। প্রচুর ধান উৎপাদনের ফলে চাল সহজে ও সুলভে পাওয়া যায়, তাই সমতল অঞ্চলের মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত।
৫. আর্যাবর্ত বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: প্রাচীন ভারতে বহিরাগত আর্যরা এসে যেখানে প্রথম বসতি স্থাপন করেছিল এবং পরবর্তীতে উত্তর ভারতের যে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তাদের সমাজ ও সংস্কৃতি বিস্তার লাভ করেছিল, সেই পুরো উত্তর ভারতকে ‘আর্যাবর্ত’ বলা হতো।
৬. দ্রাবিড় দেশ কোন অঞ্চলকে বলা হতো?
উত্তর: প্রাচীন ভারতের দক্ষিণাঞ্চল অর্থাৎ দাক্ষিণাত্যে অনার্য দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করত। বিশেষ করে কৃষ্ণা ও কাবেরী নদীর দক্ষিণের তামিলনাড়ু অঞ্চলকে প্রধানত ‘দ্রাবিড় দেশ’ বলা হতো।
৭. তামা ও ব্রোঞ্জের যুগ কাকে বলে?
উত্তর: পাথরের যুগের পর মানব ইতিহাসে যে সময়ে মানুষ পাথরের পাশাপাশি তামা এবং তামার সাথে টিন মিশিয়ে তৈরি সংকর ধাতু ব্রোঞ্জের তৈরি হাতিয়ার, পাত্র ও অলংকার ব্যাপকভাবে ব্যবহার করতে শুরু করে, তাকে তামা ও ব্রোঞ্জের যুগ বলা হয়।
৮. প্রায়-ইতিহাস যুগ (Proto-history) কাকে বলে?
উত্তর: মানব ইতিহাসের যে সময়ে মানুষ লিপি বা লেখার ব্যবহার শিখেছিল এবং প্রচুর লিখিত নমুনাও পাওয়া গেছে, কিন্তু আধুনিক গবেষকরা আজ পর্যন্ত সেই লিপির পাঠোদ্ধার করতে পারেননি (যেমন: সিন্ধু সভ্যতার লিপি), সেই সময়কালকে প্রায়-ইতিহাস যুগ বলে।
৯. প্রত্নতাত্ত্বিক কাদের বলা হয়?
উত্তর: যে সমস্ত বিশেষজ্ঞ বা বৈজ্ঞানিক মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা বহু পুরোনো দিনের মানবসভ্যতার প্রত্নবস্তু খনন করে উদ্ধার করেন এবং যুক্তি দিয়ে অতীত ইতিহাস পুনর্গঠন করেন, তাঁদের প্রত্নতাত্ত্বিক বলা হয়।
১০. ইতিহাসের উপাদান কাকে বলে?
উত্তর: অতীতের যেসব ভৌত অবশেষ বা লিখিত নথি (যেমন: মুদ্রা, শিলালিপি, প্রাচীন স্থাপত্য, বইপত্র) পর্যালোচনা করে ঐতিহাসিকরা অতীত দিনের সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনৈতিক চিত্র ফুটিয়ে তোলেন, সেগুলিকে ইতিহাসের উপাদান বলে।
১১. প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান কাকে বলে?
উত্তর: ইতিহাস রচনার উপাদানগুলির মধ্যে যেগুলি প্রাচীন বস্তু বা ধ্বংসাবশেষ হিসেবে মাটির ওপর বা নিচে পাওয়া যায়—যেমন কঙ্কাল, থালা-বাসন, মুদ্রা, প্রাচীন অট্টালিকা ইত্যাদি, সেগুলিকে প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান বলে।
১২. ইতিহাস পাঠ করার প্রধান প্রয়োজন কী?
উত্তর: অতীতের ঘটনামূল্যের ওপরই বর্তমানের সমাজ দাঁড়িয়ে থাকে। অতীত সমাজ, মানুষের ভুল-ত্রুটি, সংস্কৃতির ক্রমবিকাশ ও সভ্যতার পরিবর্তন সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করে ভবিষ্যতের সঠিক পথ নির্ধারণের জন্য ইতিহাস পাঠ করা অত্যন্ত জরুরি।
১৩. ইতিহাস বইতে কম হলেও সাল-তারিখ থাকা বাধ্যতামূলক কেন?
উত্তর: ইতিহাস হলো একটার পর একটা ঘটে যাওয়া ঘটনার ক্রমপর্যায়। ঘটনার সঠিক ধারাবাহিকতা বা কার্যকারণ সম্পর্ক বুঝতে এবং একই সময়ে পৃথিবীর কোথায় কী ঘটছিল তা তুলনা করতেই ইতিহাসের সঠিক সময়সীমা বা সাল-তারিখের প্রয়োজন হয়।
১৪. ইতিহাসে আদি-মধ্যযুগ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ইতিহাসের যুগ পরিবর্তন রাতারাতি ঘটে না। ভারতীয় ইতিহাসে প্রাচীন যুগ যখন ধীরে ধীরে ক্ষয় পাচ্ছিল এবং মধ্যযুগ পুরোপুরি শুরু হয়নি—এই দুই যুগের মিলনস্থল বা অন্তর্বর্তীকালীন সময়টিকে ঐতিহাসিকরা ‘আদি-মধ্যযুগ’ বলেন।
১৫. বর্তমানে ‘বিদেশি’ এবং ‘দেশ’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: বর্তমানে ‘দেশ’ বলতে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ভৌগোলিক সীমানাকে বোঝায় (যেমন: ভারত)। আর আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর ভিত্তিতে আমাদের দেশের নাগরিকত্বের বাইরের যেকোনো দেশের অধিবাসীকে আমরা ‘বিদেশি’ বলি।
আরো পড়ুন: Class 7 History Chapter 7/ জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি: সুলতানি ও মুঘল যুগ
Class 7 History Chapter 1: ৫ নম্বরের বিশ্লেষণাত্মক/রচনামূলক প্রশ্নোত্তর
১. প্রাচীন মুদ্রা ইতিহাস রচনার একটি অন্যতম প্রধান উপাদান—সংক্ষেপে আলোচনা করো।
ভূমিকা: প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান হিসেবে মুদ্রার গুরুত্ব অপরিসীম। লিখিত উপাদানের অভাব সত্ত্বেও কেবল মুদ্রার সাক্ষ্য ওপর ভিত্তি করে ভারতের অনেক সাম্রাজ্যের ইতিহাস পুনর্গঠন করা সম্ভব হয়েছে।
ইতিহাস রচনায় মুদ্রার গুরুত্ব:
- রাজা ও বংশ পরিচয়: মুদ্রায় উৎকীর্ণ রাজার নাম, ছবি ও উপাধি থেকে সংশ্লিষ্ট শাসক ও তাঁর রাজবংশের পরিচয় পাওয়া যায়।
- রাজত্বকাল ও সন তারিখ: মুদ্রায় লিখিত অব্দ বা সন থেকে রাজার সঠিক শাসনকাল নির্ধারণ করা সহজ হয়।
- অর্থনৈতিক অবস্থা: সোনা, রূপা বা তামার তৈরি মুদ্রা থেকে সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বা আর্থিক সংকটের স্পষ্ট প্রমাণ মেলে।
- ধর্মীয় বিশ্বাস: মুদ্রায় খোদাই করা দেব-দেবীর মূর্তি ও প্রতীক থেকে রাজার ব্যক্তিগত ধর্মমত ও ধর্মীয় সহনশীলতার ধারণা মেলে।
- সাম্রাজ্যের সীমা ও বাণিজ্য: কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে প্রচুর মুদ্রা পাওয়া গেলে বোঝা যায় এলাকাটি ওই রাজার সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল অথবা সেখানে বাণিজ্য চলত (যেমন: শক ও কুষাণদের ইতিহাস জানার প্রধান উৎস মুদ্রা)।
উপসংহার: এইভাবে ঐতিহাসিকরা প্রাচীন মুদ্রাকে বিশ্লেষণ করে অতীতের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির ধারাবাহিক ইতিহাস রচনা করেন।
২. মধ্যযুগে ‘বিদেশি’ বা ‘পরদেশি’ বলতে কী বোঝাত? বর্তমান ধারণার সাথে এর পার্থক্য লেখো।
ভূমিকা: সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে ইতিহাসে বিভিন্ন শব্দের অর্থও পরিবর্তিত হয়। মধ্যযুগে ব্যবহৃত ‘বিদেশি’ বা ‘পরদেশি’ শব্দটি তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
মধ্যযুগে ‘বিদেশি’ ধারণার রূপ:
- অচেনা মানুষ: সুলতানি বা মুঘল যুগে ‘বিদেশি’ বা ‘পরদেশি’ বলতে কেবল ভারতের বাইরের দেশের অধিবাসীদের বোঝাত না।
- স্থানভিত্তিক পরিচয়: তখন কোনো গ্রাম বা শহরের বাইরে থেকে আসা যেকোনো অচেনা বা অপরিচিত লোককেই স্থানীয় মানুষ ‘পরদেশি’ বা ‘আজনবি’ বলে মনে করত। উদাহরণস্বরূপ, পার্শ্ববর্তী শহর থেকে কোনো ব্যক্তি গ্রামে এলে গ্রামবাসী তাঁকে ‘পরদেশি’ ভাবত।
বর্তমান ধারণার সাথে পার্থক্য:
- রাষ্ট্রীয় সীমানা: বর্তমানে ‘বিদেশি’ শব্দটির সাথে জাতীয়তা বা পাসপোর্ট-ভিসার রাষ্ট্রীয় আইনি ধারণা যুক্ত। নিজের দেশের বাইরের অন্য দেশের অধিবাসীরাই আজ বিদেশি।
- অর্থের সংকীর্ণতা: মধ্যযুগে যা ছিল এলাকা বা গ্রামভিত্তিক অচেনা মানুষের পরিচয়, তা আজ রাষ্ট্রীয় গণ্ডির পরিচয়ে পরিবর্তিত হয়েছে।
উপসংহার: তাই ঐতিহাসিকদের প্রাচীন বা মধ্যযুগের নথি পড়ার সময় শব্দের সমকালীন অর্থের কথা মাথায় রাখতে হয়, নয়তো ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা ভুল হয়ে যেতে পারে।
৩. ‘ইন্ডিয়া’ বা ‘ভারতবর্ষ’ নামটি কীভাবে এসেছে? বিস্তারিত আলোচনা করো।
ভূমিকা: আমাদের দেশের মূল দুটি নাম হলো ‘ভারত’ (ভারতবর্ষ) এবং ‘ইন্ডিয়া’। প্রাচীন গ্রন্থ ও বৈদেশীদের বিবরণ পর্যালোচনা করলে এই নামগুলির উৎপত্তি জানা যায়।
‘ভারতবর্ষ’ নামের উৎপত্তি:
- প্রাচীন বৈদিক সাহিত্য ও পুরাণ অনুসারে, ঋগ্বৈদিক যুগের অন্যতম প্রধান জনজাতি ছিল ‘ভরত’।
- এই ভরত জনগোষ্ঠীর অধ্যুষিত অঞ্চল এবং পরবর্তীকালে রাজা ভরতের অনুশাসন ক্ষেত্র হিসেবে আমাদের সমগ্র মহাদেশীয় দেশটি ‘ভারতবর্ষ’ নামে পরিচিত লাভ করে।
‘ইন্ডিয়া’ নামের উৎপত্তি:
- পারসিক প্রভাব: খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ-৫ম শতকে পারসিকরা ভারতের উত্তর-পশ্চিমের ‘সিন্ধু’ নদীর অববাহিকা জয় করে। ইরানি বা পারসিক ভাষায় ‘স’ বর্ণের উচ্চারণ ছিল না, তারা ‘স’-এর জায়গায় ‘হ’ উচ্চারণ করত। ফলে ‘সিন্ধু’ শব্দটি পরিবর্তিত হয়ে হয় ‘হিদুষ’।
- গ্রিক প্রভাব: পরবর্তীতে গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস পারসিকদের থেকে দেশটি সম্পর্কে জানতে পারেন। কিন্তু গ্রিক ভাষায় আবার ‘হ’ ধ্বনির উচ্চারণ ছিল না, তাই ‘হ’ এর স্থলে তারা ‘ই’ ব্যবহার করতে শুরু করে।
- চূড়ান্ত রূপ: এই বিবর্তনের মধ্য দিয়ে ‘সিন্ধু’ > ‘হিদুষ’ > ‘ইন্ডিয়া’ শব্দটির উৎপত্তি হয়। প্রাথমিক দিকে কেবল সিন্ধু নদীর ব-দ্বীপ অঞ্চলকে ইন্ডিয়া বলা হলেও পরে সমগ্র উপমহাদেশকেই এই নামে ডাকা হতে থাকে।
৪. ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকে ঐতিহাসিক উপাদানের শ্রেণীবিভাগ এবং জটিল নাম-উপাধির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
ভূমিকা: অতীতের সত্য ঘটনা উন্মোচনের জন্য ঐতিহাসিকরা বিভিন্ন উপাদানের ওপর নির্ভর করেন এবং প্রাচীন জটিল নাম-উপাধির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করেন।
ইতিহাসের উপাদানের শ্রেণীবিভাগ:
ইতিহাসের উপাদানগুলিকে মূলত চারভাগে ভাগ করা যায়:
১. শিলালিখ বা লেখ: পাথর (শিলালেখ) বা তামার পাতে (তাম্রলেখ) খোদাই করা প্রশাসনিক ও ধর্মীয় নির্দেশ।
২. মুদ্রা: ধাতু নির্মিত প্রাচীন মুদ্রা যা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস জানায়।
৩. স্থাপত্য ও ভাস্কর্য: পুরোনো মন্দির, অট্টালিকা, মূর্তি প্রভৃতি যা তৎকালীন শিল্পকলা ও কারিগরি বিদ্যার প্রমাণ দেয়।
৪. লিখিত উপাদান: তালপাতা, কাগজ বা পুঁথিতে লিখিত রামায়ণ, মহাভারত, বায়োগ্রাফি ও বৈদেশীদের বিবরণ।
জটিল নাম ও উপাধির তাৎপর্য:
- ইতিহাস বইতে ‘গঙ্গাইকোন্ড চোল’ বা ‘সকলোত্তরপথনাথ’-এর মতো দীর্ঘ ও জটিল নাম পাওয়া যায়।
- ক্ষমতার প্রতীক: প্রাচীন রাজা-বাদশারা নিজেদের বিশাল সাম্রাজ্য, বীরত্ব এবং মর্যাদা জাহির করতে এই ধরনের আড়ম্বরপূর্ণ সংস্কৃত বা ফারসি উপাধি গ্রহণ করতেন।
- ঐতিহাসিক গুরুত্ব: কঠিন হলেও এই উপাধিগুলি থেকে তৎকালীন রাজাদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও রাজ্য বিস্তারের সীমানা স্পষ্ট বোঝা যায়।
৫. ইতিহাসে কেন সাধারণ মানুষ বা শিল্পীদের নাম খুব একটা পাওয়া যায় না? ইতিহাস রচনার সীমাবদ্ধতা আলোচনা করো।
ভূমিকা: ইতিহাস অধ্যয়ন করার সময় আমরা দেখি সেখানে কেবল রাজা-বাদশা ও রাজনৈতিক ক্ষমতার কথা বেশি রয়েছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের অবদান আড়ালে থেকে গেছে।
সাধারণ মানুষের নাম না থাকার কারণ:
- শাসককেন্দ্রিক ইতিহাস: প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাস রচয়িতা বা সভাকবিরা মূলত রাজার অনুদানে চলতেন। তাই তাঁদের রচনায় সাধারণ মানুষের চেয়ে রাজাদের গুণগান, যুদ্ধজয় ও প্রাসাদের গল্প বেশি গুরুত্ব পেত।
- সাধারণ কারিগরের অবহেলা: তাজমহল বা বিশালাকার মন্দির তৈরিতে হাজার হাজার সাধারণ শ্রমিক ও কারিগর ঘাম ঝরিয়েছেন, কিন্তু নথিপত্রে কেবল নির্দেশদাতা রাজার নামই নথিভুক্ত করা হতো।
- সাহিত্যে উপেক্ষিত শ্রেণি: তৎকালীন সাহিত্য ও সরকারি নথিতে কৃষক, শ্রমিক, তাঁতি বা সাধারণ নারীদের জীবনসংগ্রাম ও অবদানের কথা খুব কমই লিখিত হতো।
আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি (History from Below):
বর্তমানে আধুনিক ঐতিহাসিকরা এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে ‘নীচ থেকে ইতিহাস’ চর্চা শুরু করেছেন, যেখানে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, খাদ্যভ্যাস, সামাজিক সংগ্রামকে মূল ইতিহাসে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, Class 7 History Chapter 1 Question Answer অনুচ্ছেদটির সাহায্যে শিক্ষার্থীরা ‘ইতিহাসের ধারণা’ অধ্যায়ের প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় সহজে বুঝতে পারবে। প্রত্নতাত্ত্বিক ও লিখিত উপাদান কীভাবে অতীতের ফাঁক পূরণ করে ইতিহাসকে রূপ দেয়, তা জানা থাকলে পাঠ্য বিষয়টি আরও রোমাঞ্চকর মনে হবে। পরীক্ষা প্রস্তুতির জন্য এই সাজেস্টিভ প্রশ্ন ও উত্তরগুলি বারবার রিভিশন দেওয়া প্রয়োজন। সপ্তম শ্রেণির ইতিহাসের অন্যান্য অধ্যায়ের সম্পূর্ণ সমাধান, নোটস এবং নিয়মিত মক টেস্ট পেতে আমাদের ওয়েবসাইটের সাথে যুক্ত থাকুন।
