ভূমিকা:
উচ্চমাধ্যমিক (Class XII) শিক্ষাবিজ্ঞান বা এডুকেশন বিষয়ের চতুর্থ সেমিস্টার (4th Semester) হলো শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। এই সেমিস্টারের সিলেবাসে শিখন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন মানসিক উপাদান সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও কার্যকরী উপাদানটি হলো শিখনের প্রেষণা। প্রেষণা হলো এমন একটি অন্তর্নিহিত চালিকাশক্তি যা শিক্ষার্থীকে পড়ার প্রতি আগ্রহী করে তোলে এবং তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে চালিত করে। সঠিক মোটিভেশন বা প্রেষণা ছাড়া কোনো শিক্ষার্থীই দীর্ঘক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। আজকের এই নিবন্ধে আমরা gkpathya.in-এর পাঠকদের জন্য উচ্চমাধ্যমিক এডুকেশন বিষয়ের এই অধ্যায়টির মূল বিষয়বস্তু, প্রেষণার গুরুত্ব এবং প্রেষণা বৃদ্ধিতে শিক্ষকের ভূমিকা সহজ ভাষায় আলোচনা করব।

প্রেষণার সংজ্ঞা
শিক্ষাবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, প্রেষণা (Motivation) হলো এমন একটি অভ্যন্তরীণ মানসিক অবস্থা বা চালিকাশক্তি, যা মানুষের মনে কোনো চাহিদার সৃষ্টি করে, তাকে নির্দিষ্ট একটি লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করে এবং সেই লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তার আচরণকে সক্রিয় ও গতিশীল রাখে।
সহজ কথায়, যে অদৃশ্য শক্তি আমাদের যেকোনো কাজ করতে অনুপ্রাণিত করে এবং সেই কাজটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত থামতে দেয় না, তাকেই প্রেষণা বলে।
বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানীদের প্রদত্ত সংজ্ঞা:
- মনোবিজ্ঞানী ক্রাচফিল্ড ও ক্রাচফিল্ড (Crutchfield & Crutchfield):
“প্রেষণা হলো সেই সমস্ত অভ্যন্তরীণ কারণ যা মানুষের আচরণকে শুরু করে, পরিচালনা করে এবং নিয়ন্ত্রিত করে।” - উডওয়ার্থ (Woodworth):
“প্রেষণা হলো ব্যক্তির এমন একটি মানসিক ও শারীরিক অবস্থা যা তাকে একটি বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য সক্রিয় করে তোলে।” - ম্যাকডোনাল্ড (McDonald):
“প্রেষণা হলো ব্যক্তির ভেতরের এমন এক শক্তিগত পরিবর্তন, যা কোনো লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত আচরণকে জাগ্রত করে।”
আরো পড়ুন: জাতীয় শিক্ষানীতি 2020:
প্রেষণা চক্র (Motivation Cycle)
প্রেষণা কোনো স্থির বা চিরস্থায়ী অবস্থা নয়, এটি একটি নিরবচ্ছিন্ন গতিশীল প্রক্রিয়া। মানুষের মনে অভাববোধ থেকে শুরু করে চাহিদা নিবৃত্তি পর্যন্ত এই প্রক্রিয়াটি একটি চক্রাকারে আবর্তিত হয়, যাকে প্রেষণা চক্র বলা হয়।
প্রেষণা চক্রের প্রধান ধাপগুলি নিচে ক্রমানুসারে আলোচনা করা হলো:
- চাহিদা বা অভাববোধ (Need): প্রেষণা চক্রের প্রথম ধাপ হলো অভাববোধ। মানুষের শারীরিক বা মানসিক কোনো কিছুর অভাব দেখা দিলে এই ধাপের সূচনা হয় (যেমন—ক্ষুধার্ত ব্যক্তির খাদ্যের অভাব বা শিক্ষার্থীর জ্ঞানার্জনের প্রয়োজন)।
- তাড়না বা ড্রাইভ (Drive): অভাববোধ মানুষের মধ্যে এক ধরনের শারীরিক ও মানসিক উত্তেজনা বা তাড়নার সৃষ্টি করে। এই তাড়নাই ব্যক্তিকে কোনো কাজ করার জন্য উদ্দীপ্ত করে তোলে (যেমন—ক্ষুধার তাড়না)।
- সক্রিয়তা বা আচরণ (Arousal / Goal-directed Behavior): তাড়নার ফলে ব্যক্তি নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে না। সে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সাধনের জন্য বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক কার্যক্রম শুরু করে (যেমন—খাদ্য সংগ্রহের জন্য চেষ্টা করা বা পড়াশোনা করা)।
- লক্ষ্যবস্তু বা প্রলোভন (Goal / Incentive): সক্রিয়তার মাধ্যমে ব্যক্তি এমন একটি লক্ষ্য বা বস্তুর কাছে পৌঁছায় যা তার অভাব বা তাড়না দূর করতে সক্ষম (যেমন—খাদ্য বা পরীক্ষার সাফল্য)।
- চাহিদা নিবৃত্তি ও তৃপ্তি (Satisfaction / Relief): লক্ষ্য অর্জিত হলে ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা ও তাড়না প্রশমিত হয়। চাহিদা নিবৃত্ত হওয়ায় সে মানসিক শান্তি বা তৃপ্তি লাভ করে এবং প্রেষণা চক্র সাময়িকভাবে সমাপ্ত হয়।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: মানুষের জীবনচক্রে নতুন নতুন অভাব ও চাহিদার সৃষ্টি হতে থাকায় এই প্রেষণা চক্রটি অবিরামভাবে চলতেই থাকে।

প্রেষণার বৈশিষ্ট্য:
শিক্ষাবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞান অনুযায়ী প্রেষণার কিছু নির্দিষ্ট ও মৌলিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়, যা মানুষের আচরণকে বুঝতে সাহায্য করে। প্রেষণার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:
১. অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া (Internal Process): প্রেষণা হলো মানুষের মনের একটি অভ্যন্তরীণ মানসিক অবস্থা। এটি সরাসরি চোখে দেখা যায় না, তবে ব্যক্তির বহিঃপ্রকাশ বা আচরণ পর্যবেক্ষণ করে প্রেষণার অস্তিত্ব অনুমান করা যায়।
২. লক্ষ্যমুখী (Goal-directed): প্রেষণা সবসময় কোনো না কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত হয়। লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত প্রেষিত আচরণ চলতে থাকে।
৩. চাহিদা থেকে উৎপত্তি (Arises from Need): যেকোনো প্রেষণার মূলে থাকে কোনো না কোনো শারীরিক বা মানসিক অভাববোধ বা চাহিদা। অভাববোধ থেকেই তাড়না জন্ম নেয়।
৪. শক্তি ও গতি সঞ্চারকারী (Energizer): প্রেষণা মানুষের অলসতা দূর করে তার মধ্যে শক্তি ও গতি সঞ্চার করে। এটি মানুষকে নির্দিষ্ট কাজ করার জন্য উদ্দীপ্ত ও সক্রিয় করে তোলে।
৫. পরিবর্তনশীলতা (Dynamic Nature): প্রেষণা চিরস্থায়ী বা স্থির নয়। পরিস্থিতি, বয়স, পরিবেশ এবং চাহিদার পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের প্রেষণার ধরণ ও মাত্রাও পরিবর্তিত হতে থাকে।
৬. জন্মগত ও অর্জিত উভয় রূপ: কিছু প্রেষণা মানুষ জন্মসূত্রেই লাভ করে (যেমন—ক্ষুধা, তৃষ্ণা), আবার কিছু প্রেষণা সমাজ বা পরিবেশের সংস্পর্শে এসে অর্জিত হয় (যেমন—খ্যাতি, সম্মান বা সাফল্যের চাহিদা)।
প্রেষণার প্রকারভেদ (Types of Motivation):
উৎপত্তি, প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে প্রেষণাকে মূল দুই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ভাগ করা যায়:
উৎসের ওপর ভিত্তি করে প্রেষণার প্রকারভেদ
মনোবিজ্ঞানীরা উৎসের ওপর ভিত্তি করে প্রেষণাকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করেছেন:
- অন্তঃজাত বা অভ্যন্তরীণ প্রেষণা (Intrinsic Motivation):
- সংজ্ঞা: যে প্রেষণা ব্যক্তির ভেতরের ইচ্ছা, আগ্রহ বা আনন্দ থেকে উৎপন্ন হয়, তাকে অভ্যন্তরীণ প্রেষণা বলে।
- বৈশিষ্ট্য: এটি পূরণের জন্য বাইরের কোনো পুরস্কার বা চাপের প্রয়োজন হয় না।
- উদাহরণ: কোনো বিষয় ভালোবেসে পড়া, নিজের কৌতূহল মেটানোর জন্য বই পড়া বা ছবি আঁকা।
- বহিঃজাত বা বাহ্যিক প্রেষণা (Extrinsic Motivation):
- সংজ্ঞা: যে প্রেষণা বাইরের কোনো উদ্দীপক, পুরস্কার বা পরিবেশের প্রভাবে তৈরি হয়, তাকে বাহ্যিক প্রেষণা বলে।
- বৈশিষ্ট্য: এটি কোনো নির্দিষ্ট বাহ্যিক ফল বা লাভ অর্জনের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়।
- উদাহরণ: ভালো নম্বর পাওয়ার আশায় পড়া, শিক্ষকের কাছে প্রশংসা পাওয়ার ইচ্ছা, বা শাস্তির ভয়ে পড়াশোনা করা।
চাহিদার ওপর ভিত্তি করে প্রেষণার প্রকারভেদ
চাহিদার ধরণ ও প্রয়োজনের ওপর নির্ভর করে প্রেষণাকে আরও দুটি ভাগে ভাগ করা হয়:
- জৈবিক বা প্রাথমিক প্রেষণা (Biological / Primary Motivation):
- যেগুলি মানুষের শারীরিক অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অপরিহার্য এবং জন্মগত।
- উদাহরণ: ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ঘুম, নিদ্রা ইত্যাদি।
- সামাজিক বা গৌণ প্রেষণা (Social / Secondary Motivation):
- যা মানুষ সমাজে বসবাস করার ফলে এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অর্জন করে।
- উদাহরণ: সাফল্যের চাহিদা, স্বীকৃতির প্রেষণা, ক্ষমতার প্রেষণা এবং নিরাপত্তার চাহিদা।
জৈবিক প্রেষণার বৈশিষ্ট্য (Characteristics of Biological Motivation):
জৈবিক প্রেষণা (Biological/Physiological Motivation) হলো মানুষের প্রাথমিক ও জন্মগত প্রেষণা, যা তার শারীরিক অস্তিত্ব রক্ষা ও বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরি। জৈবিক প্রেষণার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:
১. জন্মগত প্রেষণা (Innate Nature): জৈবিক প্রেষণাগুলি মানুষ বা কোনো জীব জন্মসূত্রেই লাভ করে। এগুলি অর্জিত নয়, বরং জন্ম থেকেই প্রতিটি জীবের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবে উপস্থিত থাকে।
২. শারীরবৃত্তীয় চাহিদার ওপর নির্ভরশীল (Physiological Basis): এই প্রেষণাগুলি শরীরের জৈবিক ভারসাম্য বা ঘাটতি থেকে উৎপন্ন হয় (যেমন—শরীরের শক্তির ঘাটতি থেকে ক্ষুধার সৃষ্টি হয়)।
৩. হোমিওস্ট্যাসিস বা ভারসাম্য রক্ষা (Homeostasis): জৈবিক প্রেষণা পূরণের পেছনে শরীরের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য বা হোমিওস্ট্যাসিসের নীতি কাজ করে। শরীরের স্বাভাবিক অবস্থা বিঘ্নিত হলে এই প্রেষণা জেগে ওঠে এবং তা পূরণ হলে ভারসাম্য ফিরে আসে।
৪. অস্তিত্ব রক্ষা ও অপরিহার্যতা (Survival Necessity): জৈবিক প্রেষণাগুলি (যেমন—ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ঘুম) মেটানো জীবের বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত অপরিহার্য। এই চাহিদাগুলি দীর্ঘসময় অপূর্ণ থাকলে জীবের জীবন বিপন্ন হতে পারে।
৫. সার্বজনীনতা (Universality): এই প্রেষণাগুলি কেবল মানুষ নয়, বরং সমস্ত উচ্চশ্রেণির প্রাণীর মধ্যেই কমবেশি সমানভাবে লক্ষ্য করা যায়। জাতি, ধর্ম বা সংস্কৃতি নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের জৈবিক প্রেষণা একই রকম হয়।
ব্যক্তিগত প্রেষণা (Personal Motivation)
ব্যক্তিগত প্রেষণা হলো এমন এক ধরনের মানসিক চালিকাশক্তি যা প্রতিটি মানুষের নিজস্ব ব্যক্তিত্ব, অভিজ্ঞতা, দৃষ্টিভঙ্গি, আগ্রহ এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। জৈবিক প্রেষণা সবার ক্ষেত্রে এক হলেও ব্যক্তিগত প্রেষণা একেক মানুষের ক্ষেত্রে আলাদা হয়। ব্যক্তিগত প্রেষণার প্রধান বৈশিষ্ট্য ও দিকগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:
১. স্বাতন্ত্র্য বা স্বকীয়তা (Individuality): ব্যক্তিগত প্রেষণা প্রতিটি মানুষের ক্ষেত্রে ভিন্ন হয়। একজনের কাছে যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ (যেমন—সংগীতচর্চা), অন্যজনের কাছে তা নাও হতে পারে। এটি ব্যক্তির রুচি ও পছন্দের ওপর নির্ভর করে।
২. উচ্চাকাঙ্ক্ষার স্তর (Level of Aspiration): ব্যক্তিগত প্রেষণার একটি অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো উচ্চাকাঙ্ক্ষা। মানুষ নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ করে এবং ভবিষ্যতে সে কতটা উন্নতি করতে চায়, তার ওপর ভিত্তি করেই তার ব্যক্তিগত প্রেষণা নির্ধারিত হয়।
৩. আত্মসম্মান ও আত্মপ্রতিষ্ঠা (Self-Esteem and Self-Actualization): নিজের সমাজে নিজস্ব একটা পরিচিতি তৈরি করা, আত্মসম্মান রক্ষা করা এবং নিজের সুপ্ত প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটানোর প্রবল ইচ্ছাই হলো ব্যক্তিগত প্রেষণা।
৪. অর্জিত বৈশিষ্ট্য (Acquired Nature): যদিও এর পেছনে জিনগত বা মানসিক কিছু প্রবণতা থাকে, তবুও মূলত জীবনযাত্রার মান, শিক্ষা, পরিবেশ এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এই প্রেষণা গড়ে ওঠে।
৫. কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি: ব্যক্তিগত প্রেষণা মানুষকে নিজের পেশাগত বা ব্যক্তিগত লক্ষ্য অর্জনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে তোলে এবং কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করার মানসিক শক্তি জোগায়।
সামাজিক প্রেষণা (Social Motivation):
মানুষ একটি সামাজিক জীব। সমাজে অন্যান্য মানুষের সাথে মেলামেশা করে, দলবদ্ধভাবে বসবাস করতে গিয়ে মানুষের মনে কিছু বিশেষ চাহিদার জন্ম হয়, যেগুলিকে সামাজিক প্রেষণা বা গৌণ প্রেষণা বলা হয়। জৈবিক চাহিদা সবার এক হলেও সামাজিক প্রেষণা মূলত সমাজ, সংস্কৃতি এবং মানুষের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমেই গড়ে ওঠে।
সামাজিক প্রেষণা এবং ছয় প্রকার সামাজিক প্রেষণা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা:
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের সামাজিক প্রেষণাগুলির মধ্যে প্রধান ও উল্লেখযোগ্য ছয়টি প্রকার নিচে আলোচনা করা হলো:
১. অনুমোদনের প্রেষণা (Need for Approval): সমাজের অন্যান্য মানুষের কাছ থেকে প্রশংসা, স্বীকৃতি বা ভালো কাজের জন্য অনুমোদন পাওয়ার প্রবল মানসিক ইচ্ছাই হলো অনুমোদনের প্রেষণা। মানুষ সবসময় চায় তার কাজ বা আচরণ যেন সমাজ বা আশেপাশের মানুষ দ্বারা প্রশংসিত হয়।
২. ক্ষমতার প্রেষণা (Need for Power): অন্যান্য মানুষকে প্রভাবিত করা, নিয়ন্ত্রণ করা বা তাদের ওপর নিজের নেতৃত্ব বজায় রাখার মানসিক চাহিদাকে ক্ষমতার প্রেষণা বলা হয়। এই প্রেষণা সম্পন্ন ব্যক্তিরা সাধারণত দল বা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিতে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ভূমিকায় থাকতে পছন্দ করেন।
৩. সাফল্যের প্রেষণা (Need for Achievement – n-Ach): যেকোনো প্রতিযোগিতায় বা কঠিন কাজে উৎকর্ষ ও শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের অভ্যন্তরীণ তাড়না হলো সাফল্যের প্রেষণা। এই প্রেষণায় উদ্বুদ্ধ ব্যক্তিরা সবসময় উচ্চ লক্ষ্য নির্ধারণ করেন এবং নিজের দক্ষতাকে প্রমাণ করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেন।
৪. সংযোগ বা সাহচর্যের প্রেষণা (Need for Affiliation): অন্যের সাথে মিলেমিশে থাকা, বন্ধুভাবাপন্ন সম্পর্ক তৈরি করা এবং একটি দলের অন্তর্ভুক্ত হয়ে নিঃসঙ্গতা দূর করার সামাজিক ইচ্ছাকে সাহচর্যের প্রেষণা বলে। এর ফলে মানুষ সমাজের সবার সাথে মিলেমিশে থাকতে ভালোবাসে।
৫. নিরাপত্তার প্রেষণা (Need for Security): সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং মানসিক ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা, ভয় বা বিপদমুক্ত থাকার প্রবল ইচ্ছাই হলো নিরাপত্তার প্রেষণা। মানুষ তার ভবিষ্যৎ জীবন, পরিবার ও সম্পদের সুরক্ষার জন্য সবসময় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে চায়।
৬. আত্মপ্রকাশ বা স্বাতন্ত্র্যের প্রেষণা (Need for Self-Assertion): সমাজের মধ্যে নিজের একটি স্বতন্ত্র অস্তিত্ব, ব্যক্তিত্ব এবং নিজস্ব মতামতকে সকলের সামনে ফুটিয়ে তোলার প্রেষণা। এর মাধ্যমে ব্যক্তি নিজের স্বকীয়তা বজায় রাখতে এবং ভিড়ের মাঝেও আলাদাভাবে পরিচিতি লাভ করতে সচেষ্ট হয়।
প্রেষণার নির্ধারক ও শর্তসমূহ (Determinants and Conditions of Motivation):
প্রেষণা কোনো নিজে থেকেই তৈরি হওয়া প্রক্রিয়া নয়; এর পেছনে বেশ কিছু মানসিক, শারীরিক ও পরিবেশগত উপাদান কাজ করে। যে সমস্ত উপাদান বা শর্তগুলো প্রেষণাকে জাগিয়ে তোলে, শক্তিশালী করে বা এর গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করে, সেগুলোকে প্রেষণার নির্ধারক বলা হয়। প্রেষণার উল্লেখযোগ্য নির্ধারক বা শর্তগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:
১. চাহিদা ও অভাববোধ (Needs and Deficiencies): প্রেষণার সবচেয়ে বড় এবং মূল নির্ধারক হলো চাহিদা। মানুষের শারীরিক বা মানসিক কোনো কিছুর অভাব বা ঘাটতি দেখা দিলেই প্রেষণার জন্ম হয়। অভাববোধ যত তীব্র হয়, প্রেষণার মাত্রাও তত প্রবল হয়।
২. উদ্দীপক বা প্রলোভন (Incentives): বাইরের যে সমস্ত বস্তু বা পরিস্থিতি ব্যক্তির চাহিদাকে মেটাতে সাহায্য করে, সেগুলোকে উদ্দীপক বা প্রলোভন বলে। যেমন—পরীক্ষায় ভালো ফল বা পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা শিক্ষার্থীর মধ্যে পড়াশোনার প্রেষণা বাড়িয়ে দেয়।
৩. আবেগ ও অনুভূতি (Emotions): মানুষের আবেগ প্রেষণাকে সরাসরি প্রভাবিত করে। আনন্দ, উৎসাহ, কৌতূহল বা আশাবাদী মনোভাব প্রেষণাকে তীব্রতর করে। অন্যদিকে, ভয়, হতাশা বা অতিরিক্ত উদ্বেগ প্রেষণাকে কমিয়ে দেয়।
৪. লক্ষ্যের স্পষ্টতা (Clarity of Goal): লক্ষ্য যত স্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত হবে, প্রেষণা তত শক্তিশালী হবে। শিক্ষার্থী যদি জানে যে সে কেন পড়ছে এবং তার নির্দিষ্ট লক্ষ্য কী, তবে সে আরও বেশি উৎসাহ নিয়ে কাজ করবে।
৫. পূর্বের অভিজ্ঞতা ও সাফল্য (Past Experience and Success): অতীতে কোনো কাজে সফলতা পেলে মানুষের আত্মবিশ্বাস বাড়ে, যা পরবর্তী সময়ে নতুন কাজ করার জন্য প্রবল প্রেষণা জোগায়। বিপরীতভাবে, বারবার ব্যর্থতা প্রেষণাকে নষ্ট করে দিতে পারে।
৬. সামাজিক ও পরিবেশগত অনুকূল পরিবেশ (Social and Environmental Conditions): ব্যক্তির পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, পরিবার, স্কুল ও সমাজের পরিবেশ প্রেষণার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। একটি ভয়মুক্ত, সহযোগিতাপূর্ণ ও উৎসাহব্যঞ্জক পরিবেশ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক প্রেষণা সৃষ্টি করে।
ম্যাসলোর চাহিদার ক্রমপর্যায় তত্ত্ব (Maslow’s Hierarchy of Needs)
বিখ্যাত মানবতাবাদী মনোবিজ্ঞানী আব্রাহাম ম্যাসলো (Abraham Maslow) ১৯৪৩ সালে তাঁর বিখ্যাত প্রেষণা তত্ত্বে মানুষের চাহিদার একটি সুন্দর ও ধারাবাহিক বিন্যাস তুলে ধরেন। তাঁর মতে, মানুষের চাহিদাগুলি এলোমেলো নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট ক্রম বা পিরামিডের আকারে সাজানো থাকে। নিম্নস্তরের চাহিদা পূরণ হওয়ার পরেই কেবল মানুষ উচ্চস্তরের চাহিদার দিকে অগ্রসর হয়।
ম্যাসলোর এই চাহিদার সোপান বা ক্রমপর্যায়টিকে প্রধানত ৫টি ভাগে ভাগ করা হয়, যা নিচ থেকে ওপরের দিকে ক্রমান্বয়ে বিন্যস্ত থাকে:
১. শারীরিক বা প্রবৃত্তিগত চাহিদা (Physiological Needs): এটি পিরামিডের সবচেয়ে নিচের এবং সবচেয়ে মৌলিক স্তর। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যে প্রাথমিক উপাদানগুলি প্রয়োজন—যেমন খাদ্য, পানীয়, বস্ত্র, বাসস্থান, নিদ্রা এবং শারীরিক আরাম—সেগুলি এই স্তরের অন্তর্ভুক্ত। এই চাহিদাগুলি পূরণ না হলে মানুষ অন্য কোনো উচ্চতর চিন্তার দিকে যেতে পারে না।
২. নিরাপত্তার চাহিদা (Safety Needs): শারীরিক চাহিদা কিছুটা পূরণ হওয়ার পর মানুষ তার ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তার জন্য সচেষ্ট হয়। এর মধ্যে রয়েছে শারীরিক আঘাত থেকে রক্ষা পাওয়া, অর্থনৈতিক বা চাকুরির নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যহানি থেকে সুরক্ষা এবং বিশৃঙ্খলা বা অনিশ্চয়তা মুক্ত একটি নিরাপদ পরিবেশ পাওয়ার ইচ্ছা।
৩. সামাজিক বা ভালোবাসার চাহিদা (Belongingness and Love Needs): মানুষ যেহেতু সমাজবদ্ধ জীব, তাই শারীরিক ও নিরাপত্তার চাহিদা মিটলে সে ভালোবাসার কাঙাল হয়। পরিবার, বন্ধুবান্ধব ও সমাজের অন্যান্য মানুষের সাথে মিলেমিশে থাকা, স্নেহ, প্রীতি ও ভালোবাসা পাওয়া এবং একটি নির্দিষ্ট দলের অংশীদার হওয়ার তীব্র মানসিক চাহিদা এই পর্যায়ে দেখা যায়।
৪. আত্মমর্যাদার চাহিদা (Esteem Needs): এই স্তরে মানুষ সমাজের চোখে নিজের একটি সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করতে চায়। এর মধ্যে রয়েছে আত্মবিশ্বাস, সমাজে নিজের প্রতিষ্ঠা, অপরের কাছ থেকে স্বীকৃতি, প্রশংসা, সম্মান এবং ক্ষমতা অর্জনের প্রবল আকাঙ্ক্ষা।
৫. আত্মপ্রতিষ্ঠা বা আত্মোপলব্ধির চাহিদা (Self-Actualization Needs): এটি ম্যাসলোর চাহিদাপরম্পরার সর্বউচ্চ স্তর। মানুষের মধ্যে যে সুপ্ত প্রতিভা ও সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে, তার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটানোই হলো এই স্তরের মূল লক্ষ্য। ব্যক্তি নিজের জীবনের পূর্ণ সার্থকতা খুঁজে পেতে এবং নিজের সর্বোচ্চ ক্ষমতা বা দক্ষতার সদ্ব্যবহার করতে চায় (যেমন—একজন ভালো শিল্পী তার শিল্পকলায় পূর্ণতা আনতে চাওয়া)।
তত্ত্বটির মূল শিক্ষা:
ম্যাসলোর মতে, নিচের দিকের চাহিদাগুলি হলো ঘাটতিজনিত চাহিদা (Deficiency Needs), যা পূরণ না হলে মানুষ অসুস্থ বা অসন্তুষ্ট হয়ে পড়ে। আর ওপরের দিকের চাহিদাগুলি হলো বৃদ্ধিমূলক চাহিদা (Growth Needs), যা মানুষকে আরও উন্নত ও বিকশিত হতে সাহায্য করে। শিক্ষাক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনায় প্রেষণা জোগাতে তাদের মৌলিক ও নিরাপত্তার চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আত্মমর্যাদা ও আত্মপ্রকাশের সুযোগ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
আরো পড়ুন: পরিনমন — Class 12 Education 4th Semester:
ওয়াইনারের কারণ নির্দেশক তত্ত্ব (Weiner’s Attribution Theory)
প্রেষণা সম্পর্কিত বার্নার্ড ওয়াইনারের (Bernard Weiner) কারণ নির্দেশক তত্ত্ব বা অ্যাট্রিবিউশন তত্ত্ব (Attribution Theory) শিক্ষাবিজ্ঞান এবং মনোবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই তত্ত্বে মূলত ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, একজন শিক্ষার্থী তার নিজের বা অন্যের সাফল্য (Success) এবং ব্যর্থতার (Failure) কারণগুলি কীভাবে নির্ধারণ করে এবং সেই কারণগুলি তার পরবর্তী আচরণ ও প্রেষণাকে কীভাবে প্রভাবিত করে।
নিচে ওয়াইনারের কারণ নির্দেশক তত্ত্বটি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
তত্ত্বের মূল ভিত্তি
ওয়াইনারের মতে, মানুষ যখন কোনো কাজে সফল বা ব্যর্থ হয়, তখন সে মনে মনে তার পেছনের কারণ খোঁজার চেষ্টা করে। এই কারণগুলি মূলত চার ভাগে বিভক্ত। পরবর্তীতে ওয়াইনার এই কারণগুলিকে তিনটি প্রধান মাত্রায় (Dimensions) বিন্যস্ত করেছেন।
সাফল্যের বা ব্যর্থতার চারটি প্রধান কারণ
শিক্ষার্থীরা সাধারণত নিম্নলিখিত চারটি কারণের মাধ্যমেই তাদের সাফল্য বা ব্যর্থতাকে ব্যাখ্যা করে থাকে:
- সামর্থ্য বা দক্ষতা (Ability): শিক্ষার্থী মনে করে তার নিজের বুদ্ধি বা ক্ষমতা বেশি বা কম থাকার কারণে সে সফল বা ব্যর্থ হয়েছে।
- কাজের কাঠিন্য (Task Difficulty): কাজটি কতটা সহজ বা কঠিন ছিল, তার ওপরও ফলাফল নির্ভর করে।
- ভাগ্য বা সুযোগ (Luck): অনেক সময় হুট করে ঘটে যাওয়া ভাগ্যের ফলেও সাফল্য বা ব্যর্থতা আসতে পারে।
- প্রচেষ্টা (Effort): নির্দিষ্ট কাজের পেছনে শিক্ষার্থী কতটা পরিশ্রম বা চেষ্টা করেছে।
কারণগুলির তিনটি প্রধান মাত্রা (Dimensions)
ওয়াইনার এই চারটি কারণকে তিনটি মূল মাত্রার ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করেছেন:
- ক) নিয়ন্ত্রণযোগ্যতা (Controllability):
- যে কারণগুলি শিক্ষার্থীর নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে (যেমন—প্রচেষ্টা)। সে চাইলে পরিশ্রম বাড়াতে বা কমাতে পারে।
- যে কারণগুলি শিক্ষার্থীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে (যেমন—ভাগ্য বা কাজের কাঠিন্য)।
- খ) স্থিতিশীলতা (Stability):
- যে কারণগুলি অপরিবর্তনশীল বা স্থিতিশীল (যেমন—সামর্থ্য বা কাজের কাঠিন্য—এগুলি সহজে বদলায় না)।
- যে কারণগুলি পরিবর্তনশীল বা অস্থির (যেমন—প্রচেষ্টা বা ভাগ্য—এগুলি একেক সময়ে একেক রকম হতে পারে)।
- গ) অবস্থান বা উৎস (Locus of Control):
- অভ্যন্তরীণ কারণ: যা ব্যক্তির নিজস্ব গুণাবলীর সাথে যুক্ত (যেমন—সামর্থ্য এবং প্রচেষ্টা)।
- বাহ্যিক কারণ: যা পরিবেশ বা পরিস্থিতির সাথে যুক্ত (যেমন—ভাগ্য এবং কাজের কাঠিন্য)।
শিক্ষাক্ষেত্রে এই তত্ত্বের প্রভাব ও গুরুত্ব
শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়ায় ওয়াইনারের তত্ত্বের প্রভাব অপরিসীম:
- প্রেষণা নিয়ন্ত্রণ: কোনো শিক্ষার্থী যদি তার ব্যর্থতার কারণ হিসেবে ‘প্রচেষ্টার অভাব’-কে দায়ী করে, তবে সে পরবর্তীতে আরও বেশি চেষ্টা করবে এবং তার প্রেষণা বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু সে যদি ব্যর্থতার জন্য ‘নিজের কম সামর্থ্য বা ভাগ্য’-কে দায়ী করে, তবে সে হতাশ হয়ে পড়বে এবং পড়াশোনা থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।
- শিক্ষকের ভূমিকা: শিক্ষকদের উচিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই মনোভাব গড়ে তোলা যাতে তারা সাফল্যের বা ব্যর্থতার জন্য ভাগ্য বা সামর্থ্যের চেয়ে সঠিক প্রচেষ্টাকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
ম্যাকলেল্যান্ড এবং অ্যাটকিনসনের সাফল্য লাভের তত্ত্ব:
প্রেষণা সম্পর্কিত ডেভিড ম্যাকলেল্যান্ড (David McClelland) এবং জন অ্যাটকিনসন (John Atkinson)-এর সাফল্যের প্রেষণা তত্ত্ব বা অ্যাচিভমেন্ট মোটিভেশন থিওরি (Achievement Motivation Theory) শিক্ষাবিজ্ঞান এবং মনোবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারণা। এই তত্ত্বে মূলত আলোচনা করা হয়েছে কীভাবে মানুষের মধ্যে সাফল্য অর্জনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা কাজ করে এবং তা তার আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে।
নিচে ম্যাকলেল্যান্ড এবং অ্যাটকিনসনের তত্ত্বটি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
ম্যাকলেল্যান্ডের চাহিদার তত্ত্ব (McClelland’s Theory of Needs)
ডেভিড ম্যাকলেল্যান্ড তাঁর তত্ত্বে মানুষের মূলত তিনটি প্রধান সামাজিক বা মনস্তাত্ত্বিক চাহিদার কথা বলেছেন, যেগুলি মানুষকে কোনো কাজের প্রতি প্রেষিত করে:
- সাফল্যের চাহিদা (Need for Achievement – n-Ach): কোনো কাজ নিখুঁতভাবে করার, প্রতিযোগিতায় জেতার এবং উচ্চমানের মানদণ্ড অর্জনের প্রবল মানসিক তাগিদ।
- ক্ষমতার চাহিদা (Need for Power – n-Power): অন্যকে প্রভাবিত, নিয়ন্ত্রিত বা পরিচালনা করার প্রবল ইচ্ছা।
- সংযোগ বা সাহচর্যের চাহিদা (Need for Affiliation – n-Aff): সমাজের অন্যান্য মানুষের সাথে বন্ধুভাবাপন্ন সম্পর্ক তৈরি করা এবং সকলের সাথে মিলেমিশে থাকার প্রেষণা।
এর মধ্যে সাফল্যের চাহিদা (n-Ach)-যুক্ত ব্যক্তিরা সাধারণত চ্যালেঞ্জিং কাজ পছন্দ করেন এবং নিজেদের কাজের ফলাফলের দায়িত্ব নিজে নিতে ভালোবাসেন।
অ্যাটকিনসনের সাফল্য লাভের ঝুঁকি তত্ত্ব (Atkinson’s Risk-Taking Model)
জন অ্যাটকিনসন ম্যাকলেল্যান্ডের তত্ত্বটিকে আরও এগিয়ে নিয়ে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, সাফল্য লাভের প্রেষণা মূলত দুটি বিপরীত শক্তির বা দ্বন্দ্বের ওপর নির্ভর করে:
- সাফল্য লাভের তীব্র আকাঙ্ক্ষা (Ms – Motive to Succeed): এটি হলো কোনো কঠিন বা চ্যালেঞ্জিং কাজে সফল হওয়ার আনন্দ ও গর্ব পাওয়ার প্রবল মানসিক চাহিদা।
- ব্যর্থতার ভীতি (Maf – Motive to Avoid Failure): এটি হলো কোনো কাজে ব্যর্থ হলে লজ্জা, অপমান বা তিরস্কার পাওয়ার ভয়।
অ্যাটকিনসনের মতে, মানুষের আচরণ নির্ভর করে এই দুটির ভারসাম্যের ওপর। যে সমস্ত শিক্ষার্থীর মধ্যে ‘সাফল্য লাভের আকাঙ্ক্ষা’ বেশি থাকে, তারা মাঝারি ধরনের কঠিন কাজ বেছে নেয়। কারণ খুব সহজ কাজ তাদের আনন্দ দেয় না, আবার অত্যন্ত অসম্ভব বা কঠিন কাজ তাদের ব্যর্থতার মুখে ফেলতে পারে। পক্ষান্তরে, যাদের মধ্যে ‘ব্যর্থতার ভয়’ বেশি থাকে, তারা হয় অত্যন্ত সহজ কাজ বেছে নেয় (যাতে ফেল করার ঝুঁকি নেই) অথবা খুব কঠিন কাজ বেছে নেয় (যাতে ব্যর্থ হলে অজুহাত দেখানো যায় যে কাজটি অসম্ভব ছিল)।
শিক্ষাক্ষেত্রে তত্ত্বটির গুরুত্ব ও প্রভাব
শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়ায় এই তত্ত্বটির প্রভাব অপরিসীম:
- উপযুক্ত লক্ষ্য নির্ধারণ: এই তত্ত্বের মাধ্যমে শিক্ষক বুঝতে পারেন যে প্রতিটি শিক্ষার্থীর সাফল্যের চাহিদা সমান নয়। তাই তাদের মানসিকতা অনুযায়ী বাস্তবসম্মত ও মাঝারি মানের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে সাহায্য করা উচিত।
- ভীতি দূরীকরণ: শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শাস্তি বা নেতিবাচক মূল্যায়নের ভয় কমালে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘ব্যর্থতার ভয়’ (Maf) হ্রাস পায় এবং ‘সাফল্য লাভের আকাঙ্ক্ষা’ (Ms) বৃদ্ধি পায়।
- আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি: ছোট ছোট সাফল্যে উৎসাহ দেওয়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘সাফল্যের চাহিদা’ (n-Ach) জাগিয়ে তোলা সম্ভব, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদী শিক্ষাগত সাফল্যের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।
শিখনের ক্ষেত্রে প্রেষণার ভূমিকা:
শিক্ষাবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে শিখন প্রক্রিয়াকে সফল, ফলপ্রসূ ও স্থায়ী করার ক্ষেত্রে প্রেষণার (Motivation) ভূমিকা অপরিসীম। প্রেষণাকে প্রায়শই শিখন প্রক্রিয়ার ‘রাজপথ’ (Royal road to learning) বলা হয়ে থাকে।
নিচে শিখনের ক্ষেত্রে প্রেষণার মূল ভূমিকাগুলি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
মনোযোগ আকর্ষণ ও ধরে রাখা
শেখার ক্ষেত্রে প্রথম শর্ত হলো মনোযোগ। প্রেষণা শিক্ষার্থীর মধ্যে কৌতূহল ও আগ্রহ জাগিয়ে তোলে, যার ফলে তারা যেকোনো পাঠ্যবিষয়ে সহজে মনোনিবেশ করতে পারে এবং দীর্ঘক্ষণ সেই মনোযোগ ধরে রাখতে সক্ষম হয়।
কর্মপ্রয়াস ও সক্রিয়তা বৃদ্ধি
প্রেষণা শিক্ষার্থীর সুপ্ত শক্তিকে জাগিয়ে তোলে এবং তাকে নিষ্ক্রিয়তা থেকে মুক্ত করে। যে শিক্ষার্থীর মধ্যে সঠিক প্রেষণা কাজ করে, সে নিজে থেকেই পড়াশোনা বা কাজের প্রতি সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং বারবার প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়।
লক্ষ্যমুখী আচরণ পরিচালনা
প্রেষণা শিক্ষার্থীকে উদ্দেশ্যহীন কাজ থেকে বিরত রেখে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করে। এর ফলে শিক্ষার্থী বুঝতে পারে সে কী শিখছে এবং কেন শিখছে, যা তার শিখনকে সুনির্দিষ্ট ও গতিশীল রূপ দেয়।
শিখনকে দীর্ঘস্থায়ী ও অর্থবহ করা
অন্তঃজাত বা অভ্যন্তরীণ প্রেষণার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান দীর্ঘস্থায়ী হয়। প্রেষিত শিক্ষার্থীরা কোনো বিষয় কেবল মুখস্থ করার বদলে গভীরভাবে অনুধাবন করার চেষ্টা করে, ফলে সেই শিখন তাদের দীর্ঘকাল মনে থাকে।
ক্লান্তি ও অবসাদ দূরীকরণ
দীর্ঘক্ষণ পড়াশোনা বা কাজ করার ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একঘেয়েমি, ক্লান্তি বা মানসিক অবসাদ চলে আসতে পারে। সঠিক প্রেষণা বা উৎসাহ এই ক্লান্তি দূর করে শিক্ষার্থীর মনোবল ও কার্যক্ষমতা পুনরুজ্জীবিত করতে সাহায্য করে।
আত্মবিশ্বাস ও মানসিক দৃঢ়তা বৃদ্ধি
সফলতার প্রেষণা শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। এর ফলে তারা যেকোনো কঠিন বা চ্যালেঞ্জিং কাজের মুখোমুখি হতে ভয় পায় না এবং কোনো কারণে ব্যর্থতা আসলেও তা থেকে শিক্ষা নিয়ে পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিক শক্তি অর্জন করে।
শিক্ষার্থীর মধ্যে শিখনের প্রেষণা সৃষ্টিতে শিক্ষকের ভূমিকা:
শিক্ষাবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে শিখন প্রক্রিয়াকে সফল, ফলপ্রসূ ও স্থায়ী করার ক্ষেত্রে প্রেষণার (Motivation) ভূমিকা অপরিসীম। প্রেষণাকে প্রায়শই শিখন প্রক্রিয়ার ‘রাজপথ’ (Royal road to learning) বলা হয়ে থাকে।
নিচে শিখনের ক্ষেত্রে প্রেষণার মূল ভূমিকাগুলি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
মনোযোগ আকর্ষণ ও ধরে রাখা
শেখার ক্ষেত্রে প্রথম শর্ত হলো মনোযোগ। প্রেষণা শিক্ষার্থীর মধ্যে কৌতূহল ও আগ্রহ জাগিয়ে তোলে, যার ফলে তারা যেকোনো পাঠ্যবিষয়ে সহজে মনোনিবেশ করতে পারে এবং দীর্ঘক্ষণ সেই মনোযোগ ধরে রাখতে সক্ষম হয়।
কর্মপ্রয়াস ও সক্রিয়তা বৃদ্ধি
প্রেষণা শিক্ষার্থীর সুপ্ত শক্তিকে জাগিয়ে তোলে এবং তাকে নিষ্ক্রিয়তা থেকে মুক্ত করে। যে শিক্ষার্থীর মধ্যে সঠিক প্রেষণা কাজ করে, সে নিজে থেকেই পড়াশোনা বা কাজের প্রতি সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়।
লক্ষ্যমুখী আচরণ পরিচালনা
প্রেষণা শিক্ষার্থীকে উদ্দেশ্যহীন কাজ থেকে বিরত রেখে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করে। এর ফলে শিক্ষার্থী বুঝতে পারে সে কী শিখছে এবং কেন শিখছে, যা তার শিখনকে সুনির্দিষ্ট রূপ দেয়।
শিখনকে দীর্ঘস্থায়ী ও অর্থবহ করা
অন্তঃজাত বা অভ্যন্তরীণ প্রেষণার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান দীর্ঘস্থায়ী হয়। প্রেষিত শিক্ষার্থীরা কোনো বিষয় মুখস্থ করার বদলে গভীরভাবে অনুধাবন করার চেষ্টা করে, ফলে সেই শিখন তাদের দীর্ঘকাল মনে থাকে।
ক্লান্তি ও অবসাদ দূরীকরণ
দীর্ঘক্ষণ পড়াশোনা বা কাজ করার ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একঘেয়েমি, ক্লান্তি বা মানসিক অবসাদ চলে আসতে পারে। সঠিক প্রেষণা বা উৎসাহ এই ক্লান্তি দূর করে শিক্ষার্থীর মনোবল ও কর্মক্ষমতা পুনরুজ্জীবিত করতে সাহায্য করে।
আত্মবিশ্বাস ও মানসিক দৃঢ়তা বৃদ্ধি
সফলতার প্রেষণা শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। এর ফলে তারা যেকোনো কঠিন বা চ্যালেঞ্জিং কাজের মুখোমুখি হতে ভয় পায় না এবং ব্যর্থতা আসলেও তা থেকে শিক্ষা নিয়ে পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিক শক্তি অর্জন করে।
প্রেষণা হ্রাসের কারণ:
শিক্ষণ-শিক্ষণ প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রেষণা বা মোটিভেশন নানা কারণে কমে যেতে পারে। প্রেষণা হ্রাস পেলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও অন্যান্য কার্যক্ষমতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
নিচে শিক্ষার্থীদের প্রেষণা হ্রাসের প্রধান কারণগুলি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
অবাস্তব লক্ষ্য নির্ধারণ (Unrealistic Goal Setting)
শিক্ষার্থীর নিজস্ব সামর্থ্য, মেধা ও মানসিক স্থরের কথা না ভেবে যখন তার ওপর অতিরিক্ত উচ্চাশা বা অবাস্তব লক্ষ্য চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন সে তা অর্জন করতে না পেরে হতাশ হয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে তার প্রেষণা ও আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।
ধারাবাহিক ব্যর্থতা (Repeated Failure)
কোনো শিক্ষার্থী যদি বারবার পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল করে বা কোনো কাজে ক্রমাগত ব্যর্থ হয়, তবে তার মধ্যে হীনম্মন্যতা তৈরি হয়। এই ধারাবাহিক ব্যর্থতা তার আত্মবিশ্বাস সম্পূর্ণ ভেঙে দেয় এবং পরবর্তী সময়ে আর চেষ্টা করার প্রেষণা অবশিষ্ট থাকে না।
একঘেয়ে ও গতানুগতিক শিক্ষণ পদ্ধতি (Monotonous Teaching Methods)
শ্রেণিকক্ষে যদি সবসময় একঘেয়ে লেকচার মেথড বা গতানুগতিক পাঠদান পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, তবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্লান্তি ও বিরক্তি চলে আসে। নতুন কিছু শেখার কৌতূহল বা উদ্দীপনা তখন আর কাজ করে না।
অতিরিক্ত শাস্তি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন (Excessive Punishment and Fear)
শিক্ষক বা অভিভাবকদের পক্ষ থেকে যদি সবসময় অতিরিক্ত শাসন, তিরস্কার বা শাস্তির ভয় দেখানো হয়, তবে শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে আতঙ্কিত থাকে। এই ভয় ও চাপের পরিবেশ তাদের অন্তর্জাত প্রেষণা ও সৃজনশীলতাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়।
অতিরিক্ত পুরস্কারের ওপর নির্ভরতা (Over-reliance on Extrinsic Rewards)
সব কাজের জন্যই যদি সবসময় বাহ্যিক পুরস্কার বা লোভ দেখানো হয়, তবে শিক্ষার্থীদের ভেতরের নিজস্ব কৌতূহল বা অভ্যন্তরীণ প্রেষণা নষ্ট হয়ে যায়। পুরস্কার না পেলে তারা আর সেই কাজ করতে আগ্রহী হয় না।
প্রতিকূল পরিবেশ ও উৎসাহের অভাব (Unfavorable Environment and Lack of Encouragement)
শ্রেণিকক্ষ বা গৃহের পরিবেশ যদি কোলাহলপূর্ণ, অপ্রীতিকর বা প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয় এবং শিক্ষার্থীর ছোটোখাটো প্রচেষ্টাকেও যদি কেউ মূল্যায়ন বা প্রশংসা না করে, তবে সে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে।
Top 10 FAQ: শিখনের প্রেষণা (Class 12 Education)
১. প্রেষণা (Motivation) কাকে বলে?
উত্তর: প্রেষণা হলো এমন একটি অভ্যন্তরীণ মানসিক বা শারীরবৃত্তীয় চালিকাশক্তি যা কোনো প্রাণীর আচরণকে উদ্দীপ্ত করে, একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করে এবং সেই লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আচরণকে বজায় রাখে। ল্যাটিন শব্দ ‘Movere’ থেকে এই শব্দটির উৎপত্তি, যার অর্থ ‘গতিশীল করা’।
২. প্রেষণা চক্রের (Motivation Cycle) প্রধান ধাপগুলি কী কী?
উত্তর: প্রেষণা চক্রের প্রধান ৪টি ধাপ হলো:
- অভাববোধ (Need): চাহিদা বা অভাব থেকে প্রেষণার সৃষ্টি হয়।
- তাড়না (Drive): অভাবের ফলে মানসিক ও শারীরিক উত্তেজনা তৈরি হয়।
- সক্রিয়তা (Behavior): লক্ষ্য অর্জনের জন্য নির্দিষ্ট কাজ বা আচরণ শুরু হয়।
- তৃপ্তি (Satisfaction): লক্ষ্য অর্জিত হলে অভাব দূর হয় এবং মানসিক শান্তি আসে।
৩. অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক প্রেষণার মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর:
- অভ্যন্তরীণ প্রেষণা (Intrinsic): যা ব্যক্তির ভেতর থেকে আসে, যেমন—কৌতূহল, শেখার আনন্দ বা জ্ঞান অর্জনের আগ্রহ।
- বাহ্যিক প্রেষণা (Extrinsic): যা বাইরের কোনো উপাদানের মাধ্যমে তৈরি হয়, যেমন—পুরস্কার, প্রশংসা, সার্টিফিকেট বা শাস্তির ভয়।
৪. ম্যাসলোর চাহিদার ক্রমপর্যায় তত্ত্বের সর্বোচ্চ স্তরটি কী?
উত্তর: ম্যাসলোর (Abraham Maslow) চাহিদার পিরামিডের সর্বোচ্চ স্তরটি হলো “আত্মপ্রতিষ্ঠার চাহিদা” (Need for Self-Actualization)। এই স্তরে মানুষ তার অন্তর্নিহিত সম্ভাবনা ও প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটানোর চেষ্টা করে।
৫. ওয়াইনারের তত্ত্ব অনুযায়ী সাফল্য ও ব্যর্থতার প্রধান কারণগুলি কী কী?
উত্তর: বার্নার্ড ওয়াইনারের (Weiner’s Attribution Theory) মতে মানুষ তার সাফল্য বা ব্যর্থতাকে ৪টি প্রধান কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করে:
- সামর্থ্য (Ability)
- প্রচেষ্টা (Effort)
- কাজের কাঠিন্য (Task Difficulty)
- ভাগ্য (Luck)
৬. ম্যাকলেল্যান্ড এবং অ্যাটকিনসনের সাফল্য লাভের তত্ত্বের মূল বক্তব্য কী?
উত্তর: এই তত্ত্ব অনুসারে মানুষের আচরণের পেছনে সাফল্য লাভের তীব্র আকাঙ্ক্ষা ($Ms$) এবং ব্যর্থতার ভীতি ($Maf$)—এই দুই বিপরীত শক্তির দ্বন্দ্ব কাজ করে। যাদের মধ্যে সাফল্য লাভের আকাঙ্ক্ষা বেশি থাকে, তারা চ্যালেঞ্জিং কাজে এগিয়ে যায়।
৭. শিখনের ক্ষেত্রে প্রেষণার প্রধান ভূমিকা কী?
উত্তর: প্রেষণা শিক্ষার্থীকে শেখার প্রতি মনোযোগী করে তোলে, একঘেয়েমি ও ক্লান্তি দূর করে, আচরণকে লক্ষ্যমুখী করে এবং প্রাপ্ত জ্ঞানকে দীর্ঘস্থায়ী করতে সাহায্য করে। এই কারণেই প্রেষণাকে শিখনের ‘রাজপথ’ বলা হয়।
৮. শিক্ষার্থীর প্রেষণা বৃদ্ধিতে শিক্ষকের ভূমিকা কী হওয়া উচিত?
উত্তর: শিক্ষকের উচিত শ্রেণিকক্ষে ভয়মুক্ত ও আনন্দদায়ক পরিবেশ তৈরি করা, পাঠদানকে বৈচিত্র্যময় ও বাস্তবসম্মত করা, ছোট ছোট সাফল্যে প্রশংসা ও উপযুক্ত পুরস্কার দেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের ক্ষমতার বাইরে অবাস্তব চাপ না দেওয়া।
৯. প্রেষণা হ্রাসের দুটি প্রধান কারণ লেখ।
উত্তর:
অবাস্তব লক্ষ্য নির্ধারণ: শিক্ষার্থীর সামর্থ্যের বাইরে কাজ দিলে সে হতাশ হয়ে পড়ে।
ধারাবাহিক ব্যর্থতা: বারবার পরীক্ষায় বা কাজে ফেল করলে আত্মবিশ্বাস ভেঙে যায় এবং প্রেষণা কমে যায়।
১০. সামাজিক প্রেষণা কাকে বলে? দুটি উদাহরণ দাও।
উত্তর: সমাজবদ্ধ জীবনযাপন করার ফলে মানুষের মধ্যে যে প্রেষণাগুলি গড়ে ওঠে, সেগুলিকে সামাজিক প্রেষণা বলে।
উদাহরণ: অনুমোদনের প্রেষণা (Need for Approval) এবং সাহচর্যের প্রেষণা (Need for Affiliation)।
উপসংহার
শিক্ষাবৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে প্রেষণা (Motivation) হলো যেকোনো শিখন, বিকাশ এবং মানব আচরণের মূল চাবিকাঠি। প্রেষণা চক্র থেকে শুরু করে জৈবিক, ব্যক্তিগত, সামাজিক প্রেষণা, কিংবা ম্যাসলো, ওয়াইনার ও ম্যাকলেল্যান্ড-অ্যাটকিনসনের তত্ত্ব—প্রতিটি ধারণাই আমাদের এটিই শিক্ষা দেয় যে মানুষের প্রতিটি কর্মপ্রয়াসের পেছনে কোনো না কোনো অন্তর্নিহিত তাড়না বা উদ্দেশ্য কাজ করে।
শিক্ষা ও পঠন-পাঠনের ক্ষেত্রে প্রেষণা হলো ‘রাজপথ’তুল্য। একজন শিক্ষার্থীর সঠিক প্রেষণা, আত্মবিশ্বাস এবং সফলতার আকাঙ্ক্ষাই তাকে জীবনের কঠিন পথ পেরিয়ে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিতে পারে। অপরদিকে, অবাস্তব লক্ষ্য, অতিরিক্ত ভয়ভীতি বা ধারাবাহিক ব্যর্থতার কারণে প্রেষণা হ্রাস পেলে ছাত্রছাত্রীদের সম্ভাবনার বিকাশ ব্যাহত হয়।
তাই পরিশেষে বলা যায়, শিক্ষক, অভিভাবক ও সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার যৌথ দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভয়মুক্ত, আনন্দদায়ক ও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে তাদের অভ্যন্তরীণ প্রেষণা ও কৌতূহল সদা জাগ্রত থাকে। তবেই প্রকৃত শিক্ষা ও একটি সুস্থ, গতিশীল সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
![]()