ভূমিকা:
বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা রক্ষার দীর্ঘ ইতিহাসে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ হলো মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংস্থা। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে দুটি বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলা দেখার পর বিশ্বনেতারা অনুধাবন করেছিলেন যে, আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে যুদ্ধ কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। এই চিন্তাধারা থেকেই বিশ্বজুড়ে স্থায়ী শান্তি, পারস্পরিক সহযোগিতা ও মানবাধিকার সুরক্ষার মূল ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এই সংস্থাটি।
উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার (যেমন: WBCS, SSC) রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর ঐতিহাসিক পটভূমি, উদ্দেশ্য, বিভিন্ন প্রধান অঙ্গ এবং বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে এর সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখা প্রয়োজন। আজকের নিবন্ধে আমরা এই আন্তর্জাতিক সংস্থার খুঁটিনাটি সমস্ত দিক সহজ ভাষায় আলোচনা করব।
সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ কী এবং এটি কেন গঠিত হয়েছিল?
সহজ ভাষায়, সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ (United Nations বা UN) হলো বিশ্বের সার্বভৌম রাষ্ট্রসমূহের একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা, যা বিশ্বশান্তি রক্ষা, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক সমস্যার সমাধানে কাজ করে।
প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক পটভূমি:
- লীগ অব নেশনস-এর ব্যর্থতা: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর গঠিত ‘লীগ অব নেশনস’ (League of Nations) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হয়।
- আটলান্টিক সনদের গুরুত্ব: ১৯৪১ সালে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল আটলান্টিক সনদে স্বাক্ষর করেন। ‘United Nations’ নামটি প্রথম ব্যবহার করেন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট।
- সান ফ্রান্সিসকো সম্মেলন: ১৯৪৫ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সান ফ্রান্সিসকো সম্মেলনে ৫১টি দেশের প্রতিনিধি একত্রিত হয়ে জাতিসংঘ সনদ (UN Charter) প্রস্তুত করেন।
- আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা: ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠিত হয়। এজন্য প্রতি বছর ২৪ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে ‘জাতিসংঘ দিবস’ উদযাপিত হয়।
সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ-এর প্রধান উদ্দেশ্য ও মূল নীতিসমূহ
সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ-এর প্রধান উদ্দেশ্যসমূহ
সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ সনদের (UN Charter) ১ম ধারায় এই বিশ্ব সংস্থার ৪টি মূল উদ্দেশ্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে:
- আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা: বিশ্বজুড়ে যে কোনো ধরনের যুদ্ধ বা আগ্রাসন প্রতিরোধ করা এবং আন্তর্জাতিক বিরোধগুলো শান্তিপূর্ণ উপায়ে নিষ্পত্তি করে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখা।
- রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা: জাতি, ধর্ম বা সংস্কৃতির ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রের সমান অধিকার এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের ভিত্তিতে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করা।
- আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা: অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পরিবেশগত এবং মানবিক সমস্যার সমাধানে বিশ্বের সমস্ত দেশকে একত্র করে যৌথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
- মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা রক্ষা: কোনো প্রকার জাতি, লিঙ্গ, ভাষা বা ধর্মের বৈষম্য না করে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকার নিশ্চিত করা।
সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ-এর মূল নীতিসমূহ
সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ সনদের ২ নম্বর ধারায় সংস্থাসমূহ ও এর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মেনে চলার জন্য ৭টি প্রধান নীতির কথা বলা হয়েছে:
| ক্রম | মৌলিক নীতি | ব্যাখ্যা / বিবরণ |
| ১ | সার্বভৌম সমতা | ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকল সদস্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদা সমান বলে গণ্য হবে। |
| ২ | সনদের বাধ্যবাধকতা পালন | প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্র জাতিপুঞ্জের সনদে উল্লিখিত দায়িত্ব ও বাধ্যবাধকতাগুলো সততা ও নিষ্ঠার সাথে মেনে চলবে। |
| ৩ | বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি | আন্তর্জাতিক যে কোনো তর্ক, বিবাদ বা সংঘাতকে যুদ্ধ বা বলপ্রয়োগ না করে কূটনীতি ও আলোচনার মাধ্যমে মেটাতে হবে। |
| ৪ | আক্রমণ না করার নীতি | অন্য কোনো রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতা, স্বাধীনতা বা রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে হুমকি দেওয়া বা বলপ্রয়োগ করা যাবে না। |
| ৫ | জাতিপুঞ্জকে সাহায্য দান | সনদানুযায়ী পরিচালিত যে কোনো আন্তর্জাতিক কাজে বা শান্তিরক্ষা অভিযানে সদস্য রাষ্ট্রগুলো পূর্ণ সহযোগিতা করবে। |
| ৬ | অ-সদস্যদের ক্ষেত্রে নীতি | যারা জাতিপুঞ্জের সদস্য নয়, তারাও যেন বিশ্বশান্তি রক্ষার্থে এই নীতিগুলো মেনে চলে—সংস্থাটি সে বিষয়ে নজর রাখবে। |
| ৭ | অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনহস্তক্ষেপ | কোনো সদস্য দেশের নিজস্ব বা অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে না। |
সংক্ষেপে: এক বাক্যে বলতে গেলে, বিশ্ব যুদ্ধ রোধ করা, সাম্য বজায় রাখা এবং সমগ্র মানবজাতির উন্নতির জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটি সেতু হিসেবে কাজ করাই সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ-এর মূল লক্ষ্য ও নীতি।
সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ (United Nations) ৬টি প্রধান অঙ্গ (Principal Organs):

সাধারণ সভা (General Assembly)
এটি সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের প্রধান নীতি-নির্ধারক ও আলোচনাকারী অঙ্গ। বিশ্বজুড়ে এটি “বিশ্বসংসদ” বা “বিশ্বের বিতর্কসভা” নামে পরিচিত।
- সদস্য: বিশ্বের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা এই সভায় উপস্থিত থাকেন। প্রতিটি দেশের একটি করে ভোট দেওয়ার অধিকার রয়েছে।
- প্রধান কাজ: আন্তর্জাতিক শান্তি, নতুন সদস্য গ্রহণ, আন্তর্জাতিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা এবং বার্ষিক বাজেট অনুমোদন করা।
নিরাপত্তা পরিষদ (Security Council)
বিশ্বশান্তি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা রক্ষার মূল দায়িত্ব পালন করে এই পরিষদ।
- সদস্য: এর মোট সদস্য সংখ্যা ১৫টি।
- স্থায়ী সদস্য (৫টি): আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, চীন ও ফ্রান্স। এদের বিশেষ ভিটো (Veto) ক্ষমতা রয়েছে।
- অস্থায়ী সদস্য (১০টি): সাধারণ সভা কর্তৃক ২ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়।
- প্রধান কাজ: যুদ্ধ বা সংঘাত থামানো, শান্তিরক্ষা বাহিনী (Peacekeeping Force) পাঠানো এবং কোনো দেশের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ECOSOC)
বিশ্বের সামাজিক অগ্রগতি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানবাধিকার সুরক্ষায় কাজ করে এই পরিষদ।
- সদস্য: সাধারণ সভা কর্তৃক নির্বাচিত ৫৪টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত।
- প্রধান কাজ: দারিদ্র্য দূরীকরণ, শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং পরিবেশ সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা। (WHO, UNESCO, UNICEF ইত্যাদির কাজ তদারকি করে)।
অছি পরিষদ (Trusteeship Council)
পরাধীন, অ-স্বায়ত্ত্বশাসিত বা বিশেষ অঞ্চলের অধিবাসীদের স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত করার উদ্দেশ্যে এটি গঠিত হয়েছিল।
- বর্তমান অবস্থা: ১৯৯৪ সালে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ ‘পালাউ’ স্বাধীনতা লাভ করার পর এই পরিষদের প্রাথমিক লক্ষ্য পূরণ হয়। ফলে ১৯৯৪ সালের ১ নভেম্বর থেকে এর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিচারালয় (International Court of Justice – ICJ)
এটি সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের প্রধান বিচারবিভাগীয় অঙ্গ।
- সদর দপ্তর: নেদারল্যান্ডসের হেগ (The Hague) শহরে অবস্থিত (বাকি ৫টি অঙ্গের সদর দপ্তর নিউ ইয়র্কে)।
- গঠন: সাধারণ সভা ও নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক নির্বাচিত ১৫ জন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত (মেয়াদ ৯ বছর)।
- প্রধান কাজ: সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিদ্যমান আইনি সীমানা বা আন্তর্জাতিক বিরোধের নিষ্পত্তিমূলক রায় দেওয়া।
সচিবালয় (Secretariat)
সংস্থার দৈনন্দিন প্রশাসনিক ও সার্বিক কার্যপদ্ধতি পরিচালনা করে এই বিভাগ।
- প্রধান কর্মকর্তা: সচিবালয়ের সর্বপ্রধান কর্মকর্তা হলেন মহাসচিব (Secretary-General)।
- প্রধান কাজ: সাধারণ সভা বা নিরাপত্তা পরিষদের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করা, আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করা এবং শান্তিরক্ষা মিশনের হিসাব রাখা।
এক নজরে ৬টি অঙ্গের সারসংক্ষেপ (Table)
| অঙ্গের নাম | প্রধান ভূমিকা / পরিচয় | অবস্থান / সদর দপ্তর |
| সাধারণ সভা | বিশ্বসংসদ ও নীতি প্রণয়ন | নিউ ইয়র্ক, আমেরিকা |
| নিরাপত্তা পরিষদ | বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা | নিউ ইয়র্ক, আমেরিকা |
| অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ | উন্নয়ন ও মানবিক সেবা | নিউ ইয়র্ক, আমেরিকা |
| ওছি পরিষদ | অ-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের দেখাশোনা (স্থগিত) | নিউ ইয়র্ক, আমেরিকা |
| আন্তর্জাতিক বিচারালয় | সদস্য দেশের মধ্যে আইনি বিচার | হেগ, নেদারল্যান্ডস |
| সচিবালয় | দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা | নিউ ইয়র্ক, আমেরিকা |
আরো পড়ুন: গণতন্ত্র (Democracy) গণতন্ত্রের বিভিন্ন রূপ ও বৈশিষ্ট্য:
বিশেষায়িত সংস্থাসমূহ (Specialized Agencies)
সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ (United Nations)-এর অধীনে বিশ্বের সামাজিক, অর্থনৈতিক, স্বাস্থ্য, শিক্ষাগত ও পরিবেশগত উন্নয়নের জন্য একাধিক বিশেষায়িত সংস্থা (Specialized Agencies) ও আন্তর্জাতিক এজেন্সি কাজ করে।
পরীক্ষা ও ওয়েবসাইট ব্লগের পাঠকদের সুবিধার জন্য নিচে প্রধান সংস্থাগুলোর সহজ বিবরণ তুলে ধরা হলো:
প্রধান বিশেষায়িত সংস্থাসমূহ (Specialized Agencies)
| সংস্থার নাম (ইংরেজি ও সংক্ষিপ্ত রূপ) | কাজ ও দায়িত্ব | প্রধান কার্যালয় (সদর দপ্তর) |
| ইউনেস্কো (UNESCO) (Educational, Scientific and Cultural Organization) | বিশ্বজুড়ে শিক্ষা, বিজ্ঞান, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বিকাশ এবং ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট সংরক্ষণ করা। | প্যারিস, ফ্রান্স |
| বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) (World Health Organization) | বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, মহামারী প্রতিরোধ ও রোগ নিরাময়ে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা নির্দেশিকা জারি করা। | জেনেভা, সুইজারল্যান্ড |
| আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) (International Labour Organization) | বিশ্বজুড়ে শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা, কাজের পরিবেশের উন্নয়ন এবং ন্যায়সঙ্গত মজুরি নিশ্চিত করা। | জেনেভা, সুইজারল্যান্ড |
| খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) (Food and Agriculture Organization) | বিশ্বব্যাপী ক্ষুধা ও অপুষ্টি দূর করা, কৃষি ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। | রোম, ইতালি |
| বিশ্ব ব্যাংক (World Bank Group) | উন্নয়নশীল দেশগুলোর পরিকাঠামো উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক প্রকল্পের জন্য ঋণ ও অনুদান দেওয়া। | ওয়াশিংটন ডি.সি., আমেরিকা |
| আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার (IMF) (International Monetary Fund) | আন্তর্জাতিক আর্থিক স্থায়িত্ব বজায় রাখা, বৈদেশিক মুদ্রার ভারসাম্য রক্ষা এবং অর্থনৈতিক সংকটে পড়া দেশকে ঋণ দেওয়া। | ওয়াশিংটন ডি.সি., আমেরিকা |
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ইউএন তহবিল ও তহবিল সংস্থা (Funds & Programmes)
- ইউনিসেফ (UNICEF – United Nations Children’s Fund): শিশু অধিকার সুরক্ষা, শিশুদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি, প্রাথমিক শিক্ষা ও জরুরি ত্রাণ সহায়তায় কাজ করে। (সদর দপ্তর: নিউ ইয়র্ক, আমেরিকা)
- ইউএনডিপি (UNDP – United Nations Development Programme): বিশ্বজুড়ে টেকসই উন্নয়ন (SDGs), দারিদ্র্য দূরীকরণ ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা সুসংগঠিত করতে কাজ করে। (সদর দপ্তর: নিউ ইয়র্ক, আমেরিকা)
- ইউএনএইচসিআর (UNHCR – UN High Commissioner for Refugees): বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক, যুদ্ধ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাস্তুচ্যুত শরণার্থীদের অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষা করে। (সদর দপ্তর: জেনেভা, সুইজারল্যান্ড)
- ইউএনইপি (UNEP – United Nations Environment Programme): বিশ্বব্যাপী পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তন রোধ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নীতি নির্ধারণ করে। (সদর দপ্তর: নাইরোবি, কেনিয়া)
সংক্ষেপে মনে রাখার সহজ কৌশল:
- স্বাস্থ্য ও শ্রম সংক্রান্ত সংস্থার সদর দপ্তর বেশিভাগ জেনেভায় (WHO, ILO)।
- অর্থ ও ব্যাংক সংক্রান্ত সংস্থাগুলোর সদর দপ্তর ওয়াশিংটন ডি.সি.-তে (World Bank, IMF)।
- খাদ্য ও কৃষি সংক্রান্ত সংস্থার সদর দপ্তর রোমে (FAO)।
গঠন ও কাঠামোগত সংক্ষিপ্ত তথ্যসারণী (Table)
| অঙ্গ / বিষয়ের নাম | প্রধান কাজ / ভূমিকা | সদস্য সংখ্যা / বিবরণ |
| সাধারণ সভা | বিতর্ক, বাজেট অনুমোদন ও নীতি প্রণয়ন | ১৯৩টি দেশ (সকল সদস্য) |
| নিরাপত্তা পরিষদ | আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা | ১৫টি দেশ (৫ স্থায়ী, ১০ অস্থায়ী) |
| অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ | সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন | ৫৪টি দেশ |
| আন্তর্জাতিক বিচারালয় | সদস্য রাষ্ট্রের আইনি বিরোধ নিষ্পত্তি | ১৫ জন বিচারপতি (মেয়াদ ৯ বছর) |
| সচিবালয় | প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা | প্রধান: মহাসচিব |
আরো পড়ুন: মানবাধিকার কমিশন: (Human Rights Commission – NHRC)
সাফল্য ও বর্তমান চ্যালেঞ্জসমূহ
প্রধান সাফল্যসমূহ:
- শান্তিরক্ষা বাহিনী (Peacekeeping Force): বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতময় এলাকায় শান্তিরক্ষা বাহিনী পাঠিয়ে রক্তপাত বন্ধ করেছে।
- তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রতিরোধ: প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘটতে দেয়নি।
- ঔপনিবেশিকতার অবসান: এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশের স্বাধীনতায় সহায়াত করেছে।
- মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণা (১৯৪৮): মানুষের মৌলিক অধিকার সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড তৈরি করেছে।
বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে চ্যালেঞ্জ:
- ভিটো ক্ষমতার অপব্যবহার: নিরাপত্তা পরিষদের ৫টি স্থায়ী দেশের ভিটো ক্ষমতার কারণে অনেক সময় জরুরি সিদ্ধান্ত আটকে যায়।
- আর্থিক নির্ভরতা: বড় বড় দেশগুলোর আর্থিক অনুদানের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা।
- স সংস্কারের দাবি: নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোগত পরিবর্তন এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির দাবি উঠছে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ হলো বর্তমান আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে শান্তি, সমতা ও বৈশ্বিক সহযোগিতার এক অবিচ্ছেদ্য প্রতীক। বিভিন্ন সময়ে ভেটো ক্ষমতার রাজনৈতিক অপব্যবহার বা বড় শক্তিগুলোর মতপার্থক্য নিয়ে সমালোচনা হলেও, যুদ্ধ প্রতিরোধ, বিশ্বব্যাপী মহামারী নিয়ন্ত্রণ, শরণার্থী সংকট মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এই বিশ্ব সংস্থার ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান শিক্ষার ক্ষেত্রে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ-এর গঠন ও কার্যপ্রণালী বোঝা অত্যন্ত জরুরি। একটি সংঘাতমুক্ত, নিরাপদ ও সাম্যবাদী পৃথিবী গড়ে তুলতে আজও এই আন্তর্জাতিক মঞ্চের প্রয়োজনীয়তা সর্বাগ্রে প্রাসঙ্গিক।
সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ (United Nations বা UNO) সম্পর্কে সর্বাধিক জিজ্ঞাসিত এবং গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ ১০টি প্রশ্ন ও উত্তর:
১. সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ কবে এবং কেন প্রতিষ্ঠিত হয়?
উত্তর: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার পর পৃথিবীতে স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে ১৯৪৫ সালের ২৪শে অক্টোবর সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠিত হয়।
২. সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সদর দপ্তর কোথায় অবস্থিত?
উত্তর: এর প্রধান কার্যালয় বা সদর দপ্তর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে অবস্থিত।
৩. বর্তমানে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সদস্য সংখ্যা কত?
উত্তর: বর্তমানে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের মোট সদস্য রাষ্ট্র ১৯৩টি।এর সর্বশেষ বা ১৯৩তম সদস্য রাষ্ট্র হলো দক্ষিণ সুদান (২০১১ সালে যোগদান করে)।
৪. সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের প্রধান অঙ্গ কয়টি ও কী কী?
উত্তর: জাতিপুঞ্জের প্রধান অঙ্গ হলো ৬টি: যথা—
- সাধারণ সভা (General Assembly)
- নিরাপত্তা পরিষদ (Security Council)
- অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (Economic and Social Council)
- অছি পরিষদ (Trusteeship Council)
- আন্তর্জাতিক বিচারালয় (International Court of Justice)
- সচিবালয় (Secretariat)
৫. নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য দেশ কোনগুলি?
উত্তর: নিরাপত্তা পরিষদের মোট সদস্য ১৫টি, যার মধ্যে ৫টি স্থায়ী এবং ১০টি অস্থায়ী।স্থায়ী ৫টি দেশ হলো— মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, গ্রেট ব্রিটেন (যুক্তরাজ্য), ফ্রান্স এবং চীন।
৬. ‘ভেটো’ (Veto) ক্ষমতা বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য দেশগুলির যেকোনো একটি দেশ যদি কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সরাসরি মতামত বা অসম্মতি জানায়, তবে সেই প্রস্তাব পাস হয় না। স্থায়ী দেশগুলির এই বিশেষ সিদ্ধান্ত বাতিল করার ক্ষমতাকেই ভেটো ক্ষমতা বলে।
৭. আন্তর্জাতিক বিচারালয় (International Court of Justice) কোথায় অবস্থিত?
উত্তর: আন্তর্জাতিক বিচারালয় নেদারল্যান্ডের হেগ (The Hague) শহরে অবস্থিত।এখানে মোট ১৫ জন বিচারক থাকেন এবং তাঁদের কার্যকালের মেয়াদ ৯ বছর।
৮. সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তার পদ কী এবং তাঁর মেয়াদ কতদিন?
উত্তর: জাতিপুঞ্জের প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা হলেন মহাসচিব (Secretary-General)। তাঁর কার্যকালের মেয়াদ ৫ বছর।জাতিপুঞ্জের প্রথম মহাসচিব ছিলেন নরওয়ের ট্রগভি লি।
৯. সাধারণ সভাকে কী বলা হয়?
উত্তর: সাধারণ সভাকে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ‘নাগরিক সভা’ (Town meeting of the world) বা ‘বিশ্ব-বিবেকের প্রতিনিধি সভা’ বলা হয়।এখানে প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের একটি করে ভোট দেওয়ার অধিকার রয়েছে।
১০. সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের পূর্বসূরি বা আগের সংস্থাটির নাম কী ছিল?
উত্তর: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯২০ সালে গঠিত ‘জাতিসংঘ’ বা ‘লিগ অফ নেশনস’ (League of Nations) হলো সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের পূর্বসূরি সংস্থা।
