ভূমিকা:
মানব জীবনের সূচনা থেকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যে প্রক্রিয়াটি আমাদের প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ, অভিজ্ঞ ও পরিপক্ব করে তোলে, তা হলো শিখন। জন্মের সময় একটি শিশু সম্পূর্ণ অসহায়, পরনির্ভরশীল এবং প্রবৃত্তিভিত্তিক আচরণ নিয়ে পৃথিবীতে আসে। কিন্তু বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে পরিবেশের সাথে মিথস্ক্রিয়া, অনুশীলন এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সে নতুন নতুন জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও আচরণ আয়ত্ত করতে শেখে। মনোবিজ্ঞান ও শিক্ষাবিজ্ঞানের আলোচনায় আচরণের এই ইতিবাচক ও অপেক্ষাকৃত স্থায়ী পরিবর্তনকেই বলা হয় শিখন।
শিক্ষা প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্যই হলো শিক্ষার্থীর সম্ভাবনাময় প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটানো এবং সমাজ উপযোগী আচরণের রূপদান করা। আর এই লক্ষ্য অর্জনের প্রধান হাতিয়ার হলো শিখন। শ্রেণিকক্ষের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ থেকে শুরু করে বাইরের বাস্তব জীবনের উন্মুক্ত পরিবেশ—সর্বত্রই শিখন ঘটে চলেছে। শিক্ষার্থী কীভাবে শেখে, শিখনের স্বরূপ বা প্রকৃতি কেমন, এর বিভিন্ন স্তর এবং প্রকারভেদগুলি কী কী—তা জানা প্রতিজন শিক্ষক, শিক্ষাবিদ ও শিক্ষার্থীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিচে শিখন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

শিখন কি? (What is Learning?)
সহজ কথায়, অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ এবং অনুশীলনের মাধ্যমে আচরণের অপেক্ষাকৃত স্থায়ী পরিবর্তন সাধন করার প্রক্রিয়াই হলো শিখন।
মানুষের আচরণের মধ্যে কিছু থাকে জন্মগত বা প্রবৃত্তিগত (যেমন—ক্ষুধা পেলে কাঁদা বা আলো দেখলে চোখের পাতা বন্ধ করা)। এগুলি শিখন নয়। কিন্তু যখন একজন শিশু সাইকেল চালানো শেখে, কোনো ভাষা শেখে কিংবা অংকের সমাধান করতে পারে—তখন তা শিখনের আওতায় আসে।
মনে রাখা দরকার, অসুস্থতা, ক্লান্তি, বয়স বৃদ্ধি বা কোনো ওষুধের প্রভাবে আচরণের যে সাময়িক পরিবর্তন ঘটে, তাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় শিখন বলা যায় না। শিখন হতে গেলে আচরণের পরিবর্তনকে অবশ্যই অভিজ্ঞতাভিত্তিক ও স্থায়ী হতে হবে।
আরো পড়ুন: রাষ্ট্রবিজ্ঞান : প্রকৃতি ও পরিধি
শিখনের সংজ্ঞা (Definitions of Learning)
বিভিন্ন শিক্ষা মনোবিজ্ঞানী ও গবেষক শিখন-কে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। নিচে প্রধান ও সর্বজনগ্রাহ্য কয়েকটি সংজ্ঞা উল্লেখ করা হলো:
- গেটস ও অন্যান্যদের মতে (Gates & Others):
“অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণের ফলে আচরণের পরিমার্জন বা পরিবর্তন আনয়নই হলো শিখন।”(“Learning is the modification of behavior through experience and training.”) - উডওয়ার্থের মতে (R.S. Woodworth):
“নতুন জ্ঞান, নতুন প্রতিক্রিয়া এবং নতুন অভ্যাস অর্জনের প্রক্রিয়াই হলো শিখন।”(“Learning is the acquisition of new knowledge, new responses, and new habits.”) - ক্রো ও ক্রো-র মতে (Crow & Crow):
“জ্ঞান, অভ্যাস এবং দৃষ্টিভঙ্গি বা মনোভাব অর্জন করাই হলো শিখন।”(“Learning is the acquisition of habits, knowledge, and attitudes.”) - বি. এফ. স্কিনারের মতে (B.F. Skinner):
“শিখন হলো আচরণের প্রগতিশীল অভিযোজন বা পুনঃসংগঠন প্রক্রিয়া।”(“Learning is a process of progressive behavior adaptation.”)
অতএব বলা যায়, অতীত অভিজ্ঞতা, নিয়মিত অনুশীলন এবং সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ব্যক্তির জ্ঞান, দক্ষতা, মনোভাব এবং আচরণের যে অপেক্ষাকৃত স্থায়ী ও ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে, তাকেই শিখন বলে।
শিখনের বৈশিষ্ট্য (Characteristics of Learning)
শিক্ষাবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞান বিশ্লেষণ করলে শিখন (Learning) প্রক্রিয়ার প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি নিচে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে:
আচরণের পরিমার্জন ও পরিবর্তন
শিখনের মূল লক্ষণ হলো আচরণের পরিবর্তন। অর্জিত অভিজ্ঞতা ও অনুশীলনের মাধ্যমে পুরনো বা ত্রুটিপূর্ণ আচরণ পরিমার্জিত হয়ে নতুন ও উপযোগী আচরণ গঠিত হয়।
অভিজ্ঞতা ও অনুশীলনের ওপর নির্ভরশীল
শিখন কোনো আকস্মিক বা স্বতঃস্ফূর্ত শারীরিক ঘটনা নয়। এটি অতীত অভিজ্ঞতা, ধারাবাহিক অনুশীলন এবং সুনির্দিষ্ট অনুশীলনের ওপর ভিত্তি করে অর্জিত হয়।
জীবনব্যাপী ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া
শিখন কোনো নির্দিষ্ট বয়স বা সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকে না। শিশুর জন্ম মুহূর্ত থেকে শুরু করে মানুষের জীবনাবসান পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকে।
সার্বজনীনতা
শিখন কেবল মানবজাতির মধ্যেই সীমিত নয়; পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীই তার জীবনধারণ ও বেঁচে থাকার তাগিতে পরিবেশের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে শিখন সম্পন্ন করে।
উদ্দেশ্যমুখীনতা ও প্রেষণাভিত্তিক
শিখন সর্বদা লক্ষ্যভিত্তিক। কোনো নির্দিষ্ট অভাববোধ, চাহিদা বা প্রেষণা (Motivation) না থাকলে শিখন প্রক্রিয়া সক্রিয় হয় না। উদ্দেশ্য পূরণের তাগিদই শিখনকে চালিত করে।
সক্রিয়তা
শিখন পরোক্ষ বা নিষ্ক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হতে পারে না। এর জন্য শিক্ষার্থীর সক্রিয় শারীরিক, মানসিক ও আবেগীয় অংশগ্রহণ আবশ্যক।
অভিযোজনমূলক বা সমন্বয়সাধন
পরিবর্তনশীল পরিবেশের সাথে সফলভাবে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা জোগায় শিখন। পরিবেশের নানা প্রতিকূলতার সাথে খাপ খাইয়ে চলার কৌশল শিখনের মাধ্যমেই অর্জিত হয়।
অর্জিত গুণাবলী (Non-hereditary)
শিখন কোনো বংশগত বা জৈবিক সূত্রে পাওয়া ক্ষমতা নয়; এটি পরিবেশ ও পরিস্থিতির সংস্পর্শে এসে অর্জিত একটি সামর্থ্য।
স্থায়িত্ব
রোগ, ক্লান্তি, নেশা বা সাময়িক উত্তেজনার প্রভাবে আচরণের যে পরিবর্তন ঘটে, তা শিখন নয়। শিখনের ফলে প্রাপ্ত আচরণের পরিবর্তন অপেক্ষাকৃত দীর্ঘস্থায়ী হয়।
সংক্ষেপে: শিখন হলো একটি প্রেষণানির্ভর, লক্ষ্যমুখী, জীবনব্যাপী ও সক্রিয় প্রক্রিয়া, যা অনুশীলনের মাধ্যমে ব্যক্তির আচরণে দীর্ঘস্থায়ী ইতিবাচক পরিবর্তন আনে।
শিখনের স্বরূপ বা প্রকৃতি (Nature of Learning)
শিক্ষাবিজ্ঞান ও শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের বিচারে শিখনের স্বরূপ বা প্রকৃতি (Nature of Learning) অত্যন্ত জটিল, সুদূরপ্রসারী ও গতিশীল। নিচে শিখনের মূল প্রকৃতি ও স্বরূপ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
প্রক্রিয়া, পরিণাম বা ফলাফল নয় (A Process, Not a Product)
শিখন কোনো নির্দিষ্ট বস্তু, সমাপ্ত কাজ বা স্থির ফল নয়; এটি হলো একটি নিরন্তর মানসিক ও আচরণগত প্রক্রিয়া। একজন ব্যক্তি সারা জীবন ধরে নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়।
আচরণের ইতিবাচক ও দীর্ঘস্থায়ী পুনর্গঠন
শিখনের প্রকৃতি হলো মানুষের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা। এটি পুরনো বা অপ্রয়োজনীয় আচরণ বাতিল করে নতুন অভিজ্ঞতার আলোকেও আচরণকে পরিমার্জিত ও সুসংহত করে তোলে। এটি ক্লান্তি বা অসুস্থতাজনিত সাময়িক পরিবর্তন নয়, বরং অপেক্ষাকৃত দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন।
সর্বব্যাপী ও জীবনব্যাপী বিস্তার
শিখনের পরিধি কেবল শ্রেণিকক্ষ বা বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। জীবনের প্রতিটি স্তরে—পারিবারিক, সামাজিক, পেশাগত ও মানসিক অভিজ্ঞতায় শিখনের উপস্থিতি বিদ্যমান। এটি শিশুর জন্ম থেকে শুরু হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত অবিরাম চলতে থাকে।
অভিযোজনমূলক বা পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানো
পরিবর্তনশীল ও জটিল পরিবেশের সাথে নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতাই হলো শিখনের প্রকৃত স্বরূপ। পরিবেশের বৈরী পরিস্থিতি মোকাবেলা করে টিকিয়া থাকার জন্য মানুষ শিখন প্রক্রিয়ার আশ্রয় নেয়।
অভিজ্ঞতার সংগঠন ও পুনঃসংগঠন (Organization of Experience)
শিখন কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু তথ্য বা অভিজ্ঞতার স্তূপ নয়। এটি হলো পূর্বার্জিত জ্ঞান ও নতুন অর্জিত অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে নতুন অর্থ তৈরি করার একটি মানসিকভাবে সংগঠিত প্রক্রিয়া।
ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যভিত্তিক (Individual Differences)
প্রতিটি মানুষের গ্রহণক্ষমতা, বুদ্ধিমত্তা, মনোযোগ, প্রেষণা ও আগ্রহ আলাদা। তাই একই পরিবেশ বা শিক্ষকের কাছ থেকেও দুজন ব্যক্তির শিখনের মাত্রা ও গতি ভিন্ন হতে পারে।
মানসিক ও উদ্দীপক-প্রতিক্রিয়াভিত্তিক সংবেদন
শিখনের পেছনে কাজ করে মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ স্নায়বিক প্রক্রিয়া। পরিবেশ থেকে আসা কোনো উদ্দীপক (Stimulus) এবং তার প্রতি ব্যক্তির প্রতিক্রিয়া (Response)-র পারস্পরিক সংযোগের ফলেই শিখনের স্নায়বিক ভিত্তি মজবুত হয়।
সংক্ষেপে: শিখনের মূল প্রকৃতি হলো—এটি অভিজ্ঞতা, প্রেষণা ও অনুশীলনের সমন্বয়ে গঠিত একটি গতিশীল ও জীবনব্যাপী মানসিক প্রক্রিয়া, যা মানুষকে পরিবেশের সাথে কার্যকরভাবে অভিযোজন করতে সাহায্য করে।
আরো পড়ুন: জাতীয় শিক্ষানীতি 2020:
শিখনের স্তর (Levels of Learning)
শিখনের স্তর (Levels of Learning) হলো এমন এক ধারাবাহিক মানসিক ধাপ বা পর্যায়, যার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী সাধারণ সংকেত বা সংবেদন থেকে শুরু করে জটিল মানসিক ও সমস্যা সমাধানের স্তরে পৌঁছায়।
শিক্ষাবিজ্ঞান ও শিক্ষা মনোবিজ্ঞানে প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী রবার্ট গ্যাগনে (Robert Gagné) তাঁর ‘The Conditions of Learning’ গ্রন্থে শিখনের স্তরকে জটিলতার তারতম্য অনুযায়ী সর্বনিম্ন থেকে সর্বোচ্চ—এইভাবে ৮টি স্তরে শ্রেণীবদ্ধ করেছেন।
সংকেত শিখন (Signal Learning)
এটি শিখনের সবচেয়ে প্রাথমিক ও নিম্নতম স্তর। এই স্তরে কোনো নির্দিষ্ট সংকেত বা উদ্দীপকের (Signal) উপস্থিতি দেখে প্রাণী বা মানুষ প্রতিক্রিয়া জানাতে শেখে। এটি মূলত প্যাভলভের ‘প্রাচীন অনুবর্তন’ (Classical Conditioning) নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত।
- উদাহরণ: স্কুলের ঘণ্টা বাজলে ছুটির কথা ভেবে আনন্দিত হওয়া বা রাস্তায় লাল বাতি দেখলে গাড়ি থামানো।
উদ্দীপক-প্রতিক্রিয়া শিখন (Stimulus-Response Learning)
এই স্তরে নির্দিষ্ট কোনো উদ্দীপকের (Stimulus) প্রভাবে সুনির্দিষ্ট প্রতিক্রিয়া (Response) তৈরি হয়। এটি স্কিনারের ‘সক্রিয় অনুবর্তন’ (Operant Conditioning) বা থর্নডাইকের সংযোজনবাদের সাথে সম্পর্কিত, যেখানে সঠিক প্রতিক্রিয়ার জন্য শক্তিশালীকরণ (Reinforcement) দেওয়া হয়।
- উদাহরণ: কোনো বস্তুর নাম শুনে সেটি চিহ্নিত করতে পারা বা শিক্ষক প্রশ্ন করলে সঠিক উত্তর দেওয়া।
শৃঙ্খল শিখন (Chaining)
দুই বা ততধিক উদ্দীপক-প্রতিক্রিয়া শিখনকে পরপর বা পর্যায়ক্রমে যুক্ত করে একটি ধারাবাহিক শৃঙ্খল গঠন করাই হলো শৃঙ্খল শিখন। এটি অ-ভাষাগত ও দৈহিক দক্ষতার ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়।
- উদাহরণ: চাবি দিয়ে তালা খোলা, জুতো পরা, হাত ধোয়ার সঠিক নিয়ম অনুসরণ করা ইত্যাদি।
বাচিক সংযোগ শিখন (Verbal Association)
ভাষাগত উদ্দীপক ও প্রতিক্রিয়ার সমন্বয়ে এই শিখন ঘটে। শব্দের সাথে শব্দ, নাম বা বাক্যের পারস্পরিক সংযোগ ঘটিয়ে শিক্ষার্থী নতুন ভাষা বা ধারণা প্রকাশ করতে শেখে।
- উদাহরণ: কোনো কবিতার পংক্তি পর পর মুখস্থ বলা, কোনো বস্তু দেখে তার সঠিক নাম উচ্চারণ করা বা অনুবাদ করা।
বহুবিপ্রতীপ বা বৈষম্যমূলক শিখন (Multiple Discrimination)
এই স্তরে শিক্ষার্থী বাহ্যিকভাবে দেখতে একই রকম বা কাছাকাছি বৈশিষ্ট্যের একাধিক উদ্দীপকের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য চিহ্নিত করতে পারে এবং প্রতিটি উদ্দীপকের জন্য আলাদা আলাদা প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করে।
- উদাহরণ: জ্যামিতিক চিত্রগুলির (যেমন—বর্গক্ষেত্র, আয়তক্ষেত্র, রম্বস) মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারা বা সমার্থক শব্দগুলির সূক্ষ্ম ফারাক চিহ্নিত করা।
ধারণা শিখন (Concept Learning)
কোনো বস্তু, ঘটনা বা বিষয়ের বস্তুগত বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে সাধারণ একটি মানসিক রূপ বা ক্যাটাগরি তৈরি করার প্রক্রিয়া হলো ধারণা শিখন। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থী মূর্ত ও বিমূর্ত ধারণার শ্রেণীকরণ করতে পারে।
- উদাহরণ: ‘উদ্ভিদ’, ‘প্রাণী’, ‘ত্রিভুজ’, ‘গণতন্ত্র’ ইত্যাদি সম্পর্কে সাধারণ ধারণা লাভ করা।
নীতি বা সূত্র শিখন (Rule Learning)
একাধিক ধারণার (Concepts) মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপন করে যখন কোনো সাধারণ নিয়ম, সূত্র বা নীতি শেখা হয়, তাকে নীতি শিখন বলে। এতে “যদি… তবে…” (If-Then) সম্পর্ক প্রকাশ পায়।
- উদাহরণ: “তাপ দিলে ধাতু প্রসারিত হয়” বা “সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে” — এই বিজ্ঞানসম্মত নিয়মগুলি বুঝতে পারা ও প্রয়োগ করা।
সমস্যা সমাধান শিখন (Problem Solving Learning)
এটি শিখনের সর্বোচ্চ ও জটিলতম স্তর। পূর্বে অর্জিত নীতি, সূত্র ও ধারণাবলিকে কাজে লাগিয়ে যখন শিক্ষার্থী নতুন ও জটিল কোনো বাস্তবিক সমস্যার সমাধান করে, তখন তাকে সমস্যা সমাধান শিখন বলে। এতে উচ্চতর চিন্তন ও বিশ্লেষণ ক্ষমতার প্রয়োজন হয়।
- উদাহরণ: গণিতের জটিল সমস্যার সমাধান করা, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া ইত্যাদি।
সংক্ষেপে শিখনের ৮টি স্তরের সারণি:
| ক্রমিক নং | শিখনের স্তর | প্রকৃতির স্তর |
| ১ | সংকেত শিখন | নিম্নতম স্তর |
| ২ | উদ্দীপক-প্রতিক্রিয়া শিখন | নিম্ন স্তর |
| ৩ | শৃঙ্খল শিখন | নিম্ন-মধ্যম স্তর |
| ৪ | বাচিক সংযোগ শিখন | মধ্যম স্তর |
| ৫ | বহুবিপ্রতীপ (বৈষম্যমূলক) শিখন | মধ্যম স্তর |
| ৬ | ধারণা শিখন | উচ্চ-মধ্যম স্তর |
| ৭ | নীতি বা সূত্র শিখন | উচ্চ স্তর |
| ৮ | সমস্যা সমাধান শিখন | সর্বোচ্চ জটিল স্তর |
সারসংক্ষেপ: শিখনের এই স্তরগুলি একের পর এক সাজানো (Hierarchical)। অর্থাৎ, প্রাথমিক স্তরগুলির সঠিক শিখন না ঘটলে পরবর্তী জটিল ও উচ্চতর স্তরের শিখন সঠিকভাবে সম্পন্ন হতে পারে না।
শিক্ষামনোবিদ গ্যাগনের মতে শিখনের প্রকারভেদ (Gagne’s Types of Learning Outcomes)
শিক্ষা মনোবিজ্ঞানী রবার্ট গ্যাগনে (Robert Gagné) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘The Conditions of Learning’ (১৯৬৫)-এ শিখনের অর্জিত ফলাফল বা লব্ধ জ্ঞানকে (Learning Outcomes) কেন্দ্র করে শিখনকে ৫টি প্রধান শ্রেণীতে ভাগ করেছেন।
গ্যাগনের মতে, মানুষ যা কিছু শেখে বা অর্জন করে, তা এই ৫টি প্রধান প্রকারের যেকোনো একটির মধ্যে পড়ে:
বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা (Intellectual Skills)
এটি হলো কোনো তথ্য বা সংকেতকে কাজে লাগিয়ে পরিবেশের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা এবং নানা কৌশল প্রয়োগ করার ক্ষমতা। সহজ কথায়, এটি শিক্ষার্থীকে বোঝায় “কীভাবে একটি কাজ করতে হয়” (Procedural Knowledge)।
গ্যাগনে এই বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতাকে আবার সহজ থেকে জটিল অনুযায়ী কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছেন:
- বৈষম্যকরণ (Discrimination): দুটি বস্তুর মধ্যে পার্থক্য বোঝা।
- মূর্ত ধারণা (Concrete Concepts): কোনো বস্তু দেখে তা চিহ্নিত করা (যেমন—রং, আকার)।
- বিমূর্ত ধারণা (Defined Concepts): সংজ্ঞার মাধ্যমে কোনো বিষয় বোঝা (যেমন—’স্বৈরাচার’ বা ‘প্রতিনিধিত্ব’)।
- নিয়ম বা সূত্র (Rules): একাধিক ধারণার সম্পর্ক বজায় রেখে কাজ করা (যেমন—গণিতের নিয়ম)।
- উচ্চতর নিয়ম বা সমস্যা সমাধান (Higher-order Rules): একাধিক নিয়ম বা সূত্র প্রয়োগ করে নতুন সমস্যার সমাধান করা।
সংজ্ঞানাত্মক কৌশল (Cognitive Strategies)
এটি হলো শিক্ষার্থীর নিজস্ব অভ্যন্তরীণ মানসিকভাবে চিন্তাভাবনা করা, মনে রাখা, শেখা এবং মনোযোগ দেওয়ার কৌশল। অর্থাৎ, শিক্ষার্থী কীভাবে নিজে শেখে—তা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা।
- উদাহরণ: কোনো পড়া মনে রাখার জন্য সংক্ষিপ্ত সংকেত (Shortcuts/Mnemonics) তৈরি করা, পড়া চলাকালীন নিজের মতো করে নোট নেওয়া, বা পরীক্ষার হলে সময় ব্যবস্থাপনা বা স্ট্র্যাটেজি ঠিক করা।
বাচিক তথ্য (Verbal Information)
কোনো নির্দিষ্ট তথ্য, ঘটনা, নাম, তারিখ বা তত্ত্ব মনে রাখা এবং তা ভাষায় (মুখে বা লেখায়) প্রকাশ করার ক্ষমতা। এটিকে ঘোষণামূলক জ্ঞান (Declarative Knowledge)-ও বলা হয়।
- উদাহরণ: ভারতের স্বাধীনতা দিবস ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট—এই তথ্যটি মনে রাখা ও বলা, অথবা সৌরজগতের গ্রহগুলির নাম মুখে প্রকাশ করা।
মনোভাব (Attitudes)
মনোভাব হলো কোনো ব্যক্তি, বস্তু, প্রতিষ্ঠান, ঘটনা বা পরিস্থিতির প্রতি ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ মানসিক অবস্থা বা দৃষ্টিভঙ্গি। এটি ব্যক্তির আচরণ এবং পছন্দকে সরাসরি প্রভাবিত করে।
- উদাহরণ: পরিবেশ সুরক্ষার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হওয়া (যার ফলে ব্যক্তি প্লাস্টিক ব্যবহার বন্ধ করে), পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ বা খেলাধুলার প্রতি ভালোবাসা।
শারীরিক বা চালকমূলক দক্ষতা (Motor Skills)
স্নায়ু ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের পেশির সুষম সমন্বয়ের (Neuromuscular Coordination) মাধ্যমে কোনো শারীরিক কাজ সুনিপুণ ও সাবলীলভাবে সম্পন্ন করার ক্ষমতাই হলো চালকমূলক দক্ষতা।
- উদাহরণ: সাইকেল বা গাড়ি চালানো, সুন্দর করে ছবি আঁকা, কিবোর্ডে দ্রুত টাইপ করা, সাঁতার কাটা বা বাদ্যযন্ত্র বাজানো।
গ্যাগনের ৫টি প্রকারভেদের সংক্ষেপ সারণি:
| প্রকারভেদ (Learning Outcome) | মূল বিষয়বস্তু | সহজ উদাহরণ |
| ১. বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা | কীভাবে কাজ করতে হয় (Procedural) | ব্যাকরণের নিয়ম মেনে বাক্য তৈরি করা বা গণিত কষা। |
| ২. সংজ্ঞানাত্মক কৌশল | নিজের চিন্তন ও পড়ার কৌশল নিয়ন্ত্রণ | পড়া মনে রাখার জন্য মাইন্ড-ম্যাপ বা শর্টকাট বানানো। |
| ৩. বাচিক তথ্য | তথ্য বা নাম মনে রাখা ও বলা | ইতিহাসের সাল-তারিখ বা ভৌগোলিক স্থানের নাম বলা। |
| ৪. মনোভাব | দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিক পছন্দ | বিজ্ঞান বা সমাজসেবার প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। |
| ৫. চালকমূলক দক্ষতা | পেশি ও স্নায়ুর সমন্বয়ে কাজ | ছবি আঁকা, সাঁতার কাটা বা গান গাওয়ার সময় বাদ্যযন্ত্র বাজানো। |
সারসংক্ষেপ: গ্যাগনের এই প্রকারভেদগুলি শিক্ষাবিজ্ঞানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শিক্ষণ পদ্ধতি বা পাঠ পরিকল্পনা (Lesson Plan) তৈরির সময় শিক্ষককে আগে নির্ধারণ করতে হয় তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঠিক কোন ধরণের ‘শিখন ফলাফল’ (Learning Outcome) তৈরি করতে চান।
শিখনের আধুনিক প্রকারভেদ:
আধুনিক শিক্ষা প্রযুক্তি, নিউরোসায়েন্স এবং নতুন পেডাগজি (Pedagogy)-র অগ্রগতির সাথে সাথে শিখন (Learning) প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু নতুন ও আধুনিক প্রকারভেদ যুক্ত হয়েছে। ২১ শতকের শ্রেণিকক্ষ এবং অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থায় নিচের আধুনিক প্রকারভেদগুলি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ:
মিশ্রিত বা ব্লেন্ডেড শিখন (Blended Learning)
এটি ঐতিহ্যবাহী শ্রেণিকক্ষ-ভিত্তিক সরাসরি পাঠদান (Face-to-Face Classroom) এবং আধুনিক ডিজিটাল বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের সুবিধাজনক সমন্বয়।
- বিশেষত্ব: শিক্ষার্থী ক্লাসরুমে শিক্ষকের কাছ থেকে সরাসরি শেখার পাশাপাশি ইন্টারনেটে ভিডিও লেকচার, অনলাইন কুইজ বা ই-বুক ব্যবহারের মাধ্যমে পড়ার সুযোগ পায়।
অভিজ্ঞতামূলক বা পরীক্ষামূলক শিখন (Experiential Learning)
শুধুমাত্র তত্ত্ব পড়ার পরিবর্তে বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এবং হাতে-কলমে কাজ করে শেখার প্রক্রিয়াকে অভিজ্ঞতামূলক শিখন বলে। শিক্ষাবিদ জন ডিউই (John Dewey)-র “Learning by Doing” ধারণার ওপর এটি প্রতিষ্ঠিত।
- বিশেষত্ব: প্রজেক্ট প্রস্তুত করা, ফিল্ড ট্রিপ, সায়েন্স ল্যাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে এই শিখন সম্পন্ন হয়।
প্রাতিষ্ঠানিক, অপ্রাতিষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক শিখন (Formal, Informal & Non-formal Learning)
- প্রাতিষ্ঠানিক (Formal): স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট পাঠ্যক্রম, সিলেবাস ও ডিগ্রিভিত্তিক শিখন।
- অপ্রাতিষ্ঠানিক (Informal): কোনো নির্দিষ্ট সিলেবাস ছাড়া পরিবার, সমাজ, বন্ধু বা দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অভিজ্ঞতা থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অর্জিত পাঠ।
- অনানুষ্ঠানিক (Non-formal): প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে কোনো নির্দিষ্ট দক্ষতা অর্জনের জন্য কোর্স করা (যেমন—কম্পিউটার ট্রেইনিং বা ড্রাইভিং শেখা)।
সহযোগিতামূলক বা যৌথ শিখন (Collaborative / Cooperative Learning)
এককভাবে না পড়ে যখন ক্ষুদ্র দলে ভাগ হয়ে সহপাঠী বা অন্য শিক্ষার্থীদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে যৌথভাবে কোনো সমস্যার সমাধান বা প্রজেক্ট তৈরি করা হয়, তাকে সহযোগিতামূলক শিখন বলে।
- বিশেষত্ব: এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ, দলগত নেতৃত্ব এবং পারস্পরিক বিচার-বিবেচনা করার মানসিকতা গড়ে ওঠে।
স্ব-পরিচালিত বা স্ব-নিয়ন্ত্রিত শিখন (Self-Directed / Self-Regulated Learning)
ডিজিটাল যুগে এই ধরণের শিখনের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এতে শিক্ষার্থী নিজেই তার কী শেখা প্রয়োজন তা নির্ধারণ করে, নিজস্ব গতিতে রিসোর্স (যেমন—ওয়েবসাইট, ভিডিও, ব্লগ বা ই-বুক) খুঁজে নিয়ে শেখার প্রক্রিয়া পরিচালনা করে।
- বিশেষত্ব: এখানে শিক্ষকের ভূমিকা সরাসরি নিয়ন্ত্রকের না হয়ে দিক-নির্দেশকের (Facilitator) মতো হয়।
অনুকরণমূলক ও পর্যবেক্ষণমূলক শিখন (Observational / Social Learning)
মনোবিজ্ঞানী আলবার্ট বান্দুরা (Albert Bandura)-র সামাজিক শিখন তত্ত্ব অনুযায়ী, পরিবেশের কোনো আদর্শ ব্যক্তি বা মডেলের আচরণ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং তা অনুকরণ করার মাধ্যমে মানুষ নতুন কিছু শেখে।
- বিশেষত্ব: ভাষা শিক্ষা, সামাজিক রীতিনীতি এবং খেলাধুলার কৌশল অর্জনে এটি অত্যন্ত কার্যকরী।
মোবাইল ও অনলাইন শিখন (M-Learning & E-Learning)
স্মার্টফোন, ট্যাবলেট ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার ফলে যেকোনো স্থানে ও যেকোনো সময়ে (Anytime, Anywhere) শেখার আধুনিক রূপ হলো এম-লার্নিং ও ই-লার্নিং।
- বিশেষত্ব: শিক্ষামূলক অ্যাপ, অনলাইন ক্লাসরুম এবং ব্লগ পোস্টের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন এর অন্তর্ভুক্ত।
সংক্ষেপ সারণি:
| প্রকারভেদ | মূল কেন্দ্রবিন্দু | প্রধান মাধ্যম |
| ব্লেন্ডেড লার্নিং | ঐতিহ্যবাহী ও অনলাইন শিক্ষার মিশ্রণ | ক্লাসরুম + ডিজিটাল ডিভাইস |
| অভিজ্ঞতামূলক শিখন | হাতে-কলমে কাজ করা (Learning by Doing) | ল্যাব, প্রজেক্ট, ফিল্ড ওয়ার্ক |
| সহযোগিতামূলক শিখন | দলগত মিথস্ক্রিয়া ও আলোচনা | গ্রুপ ডিসকাশন, টিম প্রজেক্ট |
| স্ব-পরিচালিত শিখন | নিজের গতিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেখা | ইন্টারনেট, ব্লগ, অনলাইন কোর্স |
| পর্যবেক্ষণমূলক শিখন | অন্যদের কাজ দেখে অনুকরণ করা | সমাজ, শিক্ষক, ভার্চুয়াল মডেল |
শিক্ষা ক্ষেত্রে শিখনের গুরুত্ব ও ভূমিকা:
শিক্ষাবিজ্ঞান ও শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো শিখন (Learning)। শিক্ষার সামগ্রিক লক্ষ্য অর্জন এবং একজন শিক্ষার্থীর সার্বিক বিকাশ সাধনে শিখনের ভূমিকা অত্যন্ত ব্যাপক। নিচে শিক্ষা ক্ষেত্রে শিখনের প্রধান গুরুত্ব ও ভূমিকা আলোচনা করা হলো:
আচরণের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন ও পরিমার্জন
শিক্ষার প্রাথমিক ও প্রধান উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীর আচরণের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটানো। জন্মগত অপ্রসংগিক বা ত্রুটিপূর্ণ আচরণকে সংশোধন করে সমাজ উপযোগী ও সুসংহত আচরণ গঠনে শিখন সরাসরি কাজ করে।
পরিবেশের সাথে সফল অভিযোজন (Adjustment)
পরিবর্তনশীল ও নতুন পরিবেশের সাথে কীভাবে খাপ খাইয়ে চলতে হয়, শিখন শিক্ষার্থীকে তা শেখায়। বৈরী বা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে টিকে থাকার দক্ষতা শিখন প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই অর্জিত হয়।
জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন
পাঠ্যক্রমের বিভিন্ন বিষয়বস্তু (যেমন—গণিত, বিজ্ঞান, সাহিত্য) সম্পর্কে ধারণা লাভ করা এবং বাস্তব জীবনে প্রযুক্তি, লেখালেখি, খেলাধুলা বা বিভিন্ন বৃত্তিমূলক দক্ষতা অর্জন করা সম্পূর্ণভাবে শিখনের ওপর নির্ভরশীল।
সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বৃদ্ধি
শিক্ষার্থী যখন বিভিন্ন স্তরের শিখনের মাধ্যমে সূত্র, নীতি ও ধারণা আয়ত্ত করে, তখন সে নতুন ও জটিল বাস্তবিক সমস্যার মুখোমুখি হলে তা বিশ্লেষণ করে সমাধান করতে সক্ষম হয়।
প্রেষণা ও আগ্রহ সৃষ্টি
সঠিক ও ফলপ্রসূ শিখন শিক্ষার্থীর মনে জানার আগ্রহ ও কৌতূহল বাড়িয়ে তোলে। এটি শিক্ষার্থীকে স্বাভ্যাস গঠনে এবং নিজে থেকে নতুন বিষয় শিখতে (Self-learning) উৎসাহিত করে।
সামাজিকীকরণ ও মূল্যবোধ গঠন
সহযোগিতামূলক বা দলগত শিখনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহানুভূতি, একতা, পরমতসহিষ্ণুতা ও নিয়মশৃঙ্খলার মতো সামাজিক মূল্যবোধ গড়ে ওঠে, যা তাকে একজন আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে।
ব্যক্তিত্ব ও চরিত্র গঠন
শিক্ষার্থীর চিন্তা, আবেগ, মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিপক্বতা আনে শিখন। এটি তার আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং সুষম ব্যক্তিত্ব গঠনে সহায়তা করে।
সারকথা: শিক্ষক যখন শিক্ষার্থীর শিখনের সঠিক প্রকৃতি ও নিয়ম অনুধাবন করে পাঠদান পরিচালনা করেন, তখন শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়া (Teaching-Learning Process) সর্বোচ্চ সফল ও অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে।
শিখনকে প্রভাবিত করার উপাদানসমূহ:
যেহেতু শিখন (Learning) একটি জটিল মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া, তাই সব সময় একই গতিতে বা সমানভাবে শিখন সম্পন্ন হয় না। শিক্ষার্থীর পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং তার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ নানা বিষয়ের ওপর শিখনের সাফল্য ও গতি নির্ভর করে। শিখনকে প্রভাবিত করার উপাদানগুলিকে মূলত দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়: অভ্যন্তরীণ উপাদান এবং বাহ্যিক উপাদান।
নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
অভ্যন্তরীণ উপাদানসমূহ (Internal Factors)
এই উপাদানগুলি সরাসরি শিক্ষার্থীর নিজের সাথে বা তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার সাথে যুক্ত:
- শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য: শিক্ষার্থীর শারীরিক সুস্থতা এবং ক্লান্তিহীন বা রোগমুক্ত শরীর সফল শিখনের প্রাথমিক শর্ত। এর পাশাপাশি ভালো মানসিক স্বাস্থ্য বা দুশ্চিন্তামুক্ত মন দ্রুত শিখতে সাহায্য করে।
- বুদ্ধিমত্তা (Intelligence): শিক্ষার্থীর জন্মগত ও অর্জিত বুদ্ধিমত্তা তার শিখন ক্ষমতাকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে। বুদ্ধিমান শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক কম সময়ে জটিল বিষয় বুঝতে ও মনে রাখতে পারে।
- প্রেষণা বা মোটিভেশন (Motivation): শেখার ইচ্ছা বা ভেতরের তাগিদ হলো শিখনের মূল চালিকাশক্তি। শিক্ষার্থীর ভেতর যদি সঠিক প্রেষণা থাকে, তবে তার মনোযোগ ও শেখার আগ্রহ বহুগুণ বেড়ে যায়।
- মনোযোগ ও আগ্রহ (Attention & Interest): যে বিষয়ের প্রতি শিক্ষার্থীর আগ্রহ বেশি এবং সেটিতে সে যদি পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারে, তবে সেই শিখন দীর্ঘস্থায়ী হয়।
- বয়স ও পরিণমন (Age and Maturation): শারীরিক ও মানসিক পরিণমন না ঘটলে নির্দিষ্ট কোনো বিষয় শেখা সম্ভব নয়। বয়সের সাথে সাথে মানুষের ধারণ ক্ষমতা ও শেখার কৌশলও পরিবর্তিত হয়।
- অতীত অভিজ্ঞতা: পূর্বে অর্জিত জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা নতুন কিছু শিখতে সাহায্য করে। আগের শিক্ষার ভিত্তি যত মজবুত হয়, নতুন শিখন তত সহজ হয়।
বাহ্যিক উপাদানসমূহ (External Factors)
এই উপাদানগুলি শিক্ষার্থীর বাইরের পরিবেশ, শিক্ষক ও শিক্ষণ পদ্ধতির সাথে সম্পর্কিত:
- শিক্ষণ পদ্ধতি (Teaching Methods): শিক্ষক ক্লাসরুমে কী ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করছেন (যেমন—লেকচার মেথড নাকি হাতে-কলমে বা প্রজেক্ট পদ্ধতি) তার ওপর শিখনের মান নির্ভর করে। সহজ ও আকর্ষণীয় পদ্ধতি শিখনকে দীর্ঘস্থায়ী করে।
- পরিবেশগত অনুকূল অবস্থা: ক্লাসরুমের শান্ত পরিবেশ, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, আরামদায়ক বসার ব্যবস্থা এবং আরামদায়ক তাপমাত্রা শিখন প্রক্রিয়াকে অনেক সহজ করে তোলে।
- শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক: শিক্ষকের সাথে শিক্ষার্থীর সুসম্পর্ক, স্নেহের আচরণ এবং উৎসাহদান শিক্ষার্থীর শেখার স্পৃহা বাড়িয়ে দেয়। ভীতিপূর্ণ পরিবেশ শিখনকে বাধাগ্রস্ত করে।
- শিক্ষোপকরণ (Teaching Aids): পাঠদানকে আকর্ষণীয় করার জন্য চার্ট, মডেল, অডিও-ভিজুয়াল বা ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করলে শিক্ষার্থী সহজেই বিষয়বস্তু আত্মস্থ করতে পারে।
- অনুশীলনের সুযোগ ও পুনরাবৃত্তি: পর্যাপ্ত অনুশীলন বা রিভিশনের সুযোগ না থাকলে শেখা বিষয়গুলি স্মৃতি থেকে মুছে যেতে পারে। নিয়মিত চর্চা শিখনকে পাকা করে তোলে।
- সামাজিক ও পারিবারিক পরিবেশ: শিক্ষার্থীর পরিবার এবং সমাজের সুস্থ সংস্কৃতি, উৎসাহ এবং পড়াশোনার উপযোগী পরিবেশ তার মানসিক বিকাশ ও শিখনে গভীর প্রভাব ফেলে।
সারসংক্ষেপ: শিখনকে ফলপ্রসূ ও সফল করতে হলে অভ্যন্তরীণ উপাদান যেমন—আগ্রহ ও প্রেষণা প্রয়োজন, তেমনই বাহ্যিক উপাদান যেমন—উপযুক্ত পরিবেশ ও সঠিক শিক্ষণ পদ্ধতির সুষম সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, মানবজীবনের আত্মপ্রকাশ, বিকাশ এবং উন্নতির মূল চাবিকাঠি হলো শিখন। জন্মলগ্নে মানুষ অত্যন্ত সীমিত সম্ভাবনা নিয়ে পৃথিবীতে আসে, কিন্তু পরিবেশের সাথে মিথস্ক্রিয়া, ধারাবাহিক অনুশীলন, অভিজ্ঞতা এবং প্রেষণার মাধ্যমে সে তার আচরণকে পরিমার্জিত ও সমৃদ্ধ করে তোলে। শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের আলোকেই আমরা বুঝতে পারি যে শিখন কেবল কতগুলি তথ্য মুখস্থ করা বা যান্ত্রিক উপায়ে জ্ঞান অর্জন করা নয়; এটি হলো ব্যক্তিজীবনের বহুমুখী সমস্যার সফল মোকাবিলা এবং পরিবর্তনশীল পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্য বিধান করার এক সুদীর্ঘ প্রক্রিয়া।
শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের প্রধান দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীর অভ্যন্তরীণ সামর্থ্য এবং পরিণমনের স্তরকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে উপযুক্ত পরিবেশ, সঠিক শিক্ষণ পদ্ধতি ও আধুনিক কৌশল নিশ্চিত করা। একটি সুপরিকল্পিত এবং বিজ্ঞানসম্মত শিখন প্রক্রিয়াই পারে শিক্ষার্থীর ভেতরের সুপ্ত প্রতিভাকে সম্পূর্ণ বিকশিত করে তাকে একজন দক্ষ, সচেতন ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে।
শিখন (Learning) বিষয়ক বহুল জিজ্ঞাসিত ১০টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর:
১. শিখন কাকে বলে?
উত্তর: অভিজ্ঞতা, অনুশীলন এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানুষের আচরণ ও চিন্তাভাবনার দীর্ঘস্থায়ী ইতিবাচক পরিবর্তনকেই মনোবিজ্ঞানের ভাষায় শিখন বলে।
২. শিখন ও পরিণমনের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কি?
উত্তর:
- পরিণমন: এটি একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া যা বয়স বাড়ার সাথে সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটে (যেমন—শিশুর হাঁটা বা পেশির বৃদ্ধি)। এর জন্য অনুশীলনের প্রয়োজন হয় না।
- শিখন: এটি অভিজ্ঞতা, অনুশীলন ও চেষ্টার মাধ্যমে অর্জিত একটি অর্জিত প্রক্রিয়া।
৩. রবার্ট গ্যাগনের মতে শিখনের সর্বোচ্চ স্তর কোনটি?
উত্তর: রবার্ট গ্যাগনের (Robert Gagné) শ্রেণীবিন্যাস অনুযায়ী শিখনের সর্বোচ্চ স্তর হলো সমস্যা সমাধান শিখন (Problem Solving Learning)।
৪. গেটস (Gates)-এর মতে শিখনের সংজ্ঞা কি?
উত্তর: মনোবিদ গেটসের মতে— “অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণের ফলে আচরণের পরিবর্তন আনয়নই হলো শিখন।”
৫. শিখনের প্রধান ৩টি বৈশিষ্ট্য কি কি?
উত্তর:
১. এটি আচরণের পরিবর্তন ঘটায়।
২. এটি একটি জীবনব্যাপী ও সার্বজনীন প্রক্রিয়া।
৩. এর জন্য সক্রিয়তা, অভিজ্ঞতা ও অনুশীলনের প্রয়োজন হয়।
৬. ব্লেন্ডেড লার্নিং বা মিশ্রিত শিখন (Blended Learning) বলতে কি বোঝায়?
উত্তর: ঐতিহ্যবাহী শ্রেণিকক্ষ-ভিত্তিক পাঠদান (Classroom Teaching) এবং আধুনিক ডিজিটাল/অনলাইন প্রযুক্তির সমন্বয়ে যে পাঠদান প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়, তাকে মিশ্রিত শিখন বলে।
৭. প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক শিখনের পার্থক্য কি?
উত্তর:
- প্রাতিষ্ঠানিক শিখন (Formal Learning): স্কুল, কলেজ বা নির্দিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মকানুন ও সুনির্দিষ্ট পাঠ্যক্রম মেনে যা শেখা হয়।
- অপ্রাতিষ্ঠানিক শিখন (Informal Learning): পরিবার, সমাজ বা দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অভিজ্ঞতা থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যা শেখা হয়।
৮. আলবার্ট বান্দুরার অনুকরণমূলক শিখন (Observational Learning) কি?
উত্তর: সমাজবিজ্ঞানী আলবার্ট বান্দুরা (Albert Bandura)-র মতে, মানুষ যখন অন্য কোনো ব্যক্তির (মডেল) আচরণ পর্যবেক্ষণ করে এবং তা অনুকরণ করার মাধ্যমে নতুন কিছু শেখে, তাকে অনুকরণমূলক বা পর্যবেক্ষণমূলক শিখন বলে।
৯. প্রেষণা (Motivation) কীভাবে শিখনকে প্রভাবিত করে?
উত্তর: প্রেষণা হলো শেখার ভেতরের তাগিদ বা ইচ্ছা। শিক্ষার্থী যদি মানসিকভাবে প্রেষিত থাকে, তবে তার মনোযোগ বৃদ্ধি পায় এবং শিখন প্রক্রিয়া অনেক দ্রুত ও স্থায়ী হয়।
১০. অভিজ্ঞতামূলক শিখন (Experiential Learning) কাকে বলে?
উত্তর: শুধুমাত্র তত্ত্ব পড়ার পরিবর্তে হাতে-কলমে কাজ করে বা বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শেখার প্রক্রিয়াকে (“Learning by doing”) অভিজ্ঞতামূলক শিখন বলে।
