শেরশাহ: 7 Ultimate Reforms of His Legendary Administrative System.
URL Slug:/shershah-shason-babastha-o-songskar-detailed-guide
Focus Keyword: শেরশাহ
SEO Title: শেরশাহ: ৭টি সেরা শাসন ব্যবস্থা ও বৈপ্লবিক সংস্কারের ইতিহাস
SEO Meta Description: শেরশাহ এর শাসন ব্যবস্থা ও বৈপ্লবিক সংস্কার সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন। ইতিহাস ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য শেরশাহ এর সেরা ৭টি সংস্কার নীতি এবং অনন্য অবদান।
ভূমিকা
মধ্যযুগের ভারতের ইতিহাসে যে কজন শাসক স্বল্প সময়ের মধ্যে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পেরেছিলেন, তাঁদের মধ্যে শেরশাহ সূরি সর্বাগ্রে স্মরণীয়। ১৫৪০ থেকে ১৫৪৫ খ্রিষ্টাব্দ—মাত্র পাঁচ বছরের সংক্ষিপ্ত শাসনকালে শেরশাহ যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, দক্ষ প্রশাসন এবং রাজস্ব সংস্কারের সূচনা করেছিলেন, তা পরবর্তীকালে মোগল সাম্রাজ্যের ভিত্তি সুদৃঢ় করতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল। সাধারণ একজন সর্দার থেকে দিল্লি এবং আগ্রার সিংহাসনে আরোহণ করার জার্নি কেবল সামরিক পরাক্রমের পরিচয় দেয় না, বরং তাঁর সুদূরপ্রসারী দূরদর্শিতাকেও তুলে ধরে।
শেরশাহ প্রথম শাসক যিনি প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থার গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি কৃষক, সাধারণ নাগরিক ও ব্যবসায়ীদের সুরক্ষা প্রদান করে রাষ্ট্রকে একটি কল্যাণমুখী রূপ দিতে সক্ষম হন। তৎকালীন ভারতে প্রচলিত দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে এক স্বচ্ছ শাসনকৌশল বাস্তবায়ন করাই ছিল তাঁর প্রধান সাফল্য। মধ্যযুগের শাসনব্যবস্থায় তিনি যেভাবে জমি পরিমাপ, মুদ্রা চালু এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করেন, তা আজও ঐতিহাসিকদের কাছে বিস্ময়কর। এই নিবন্ধে শেরশাহ এর অনন্য শাসন ব্যবস্থা, রাজস্ব নীতি, সামরিক ও অবকাঠামোগত সংস্কারের প্রতিটি দিক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আলোচনা করা হলো।
শেরশাহ এর প্রাথমিক জীবন ও ঐতিহাসিক পটভূমি
শেরশাহ এর মূল নাম ছিল ফরিদ খান। আনুমানিক ১৪৭২ বা ১৪৮৬ খ্রিষ্টাব্দে হরিয়ানার নারনৌলে (মতান্তরে পাঞ্জাবের বাজওয়াদায়) তাঁর জন্ম হয়। তাঁর পিতা হাসান খান সূরি ছিলেন বিহারের সসারামের একজন ছোট আফগান জায়গিরদার। ফরিদের শৈশব খুব একটা সুখকর ছিল না; বিমাতার বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে তিনি অল্প বয়সেই নিজের বাসস্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং জৌনপুরে চলে যান। জৌনপুর তখন ছিল মধ্যযুগীয় ভারতের অন্যতম প্রধান শিক্ষা ও সংস্কৃতি কেন্দ্র, যাকে “ভারতের শিরাজ” বলা হতো। সেখানে ফরিদ আরবি, ফারসি, ইতিহাস ও সাহিত্য গভীর মনোযোগের সঙ্গে অধ্যয়ন করেন। এই শিক্ষা ও অধ্যয়নই পরবর্তীতে তাঁর প্রশাসনিক প্রজ্ঞার ভিত্তি গড়ে তুলেছিল।
[ফরিদ খানের প্রাথমিক জীবন]
│
▼
[জৌনপুরে শিক্ষা ও জ্ঞানার্জন]
│
▼
[সসারামের জায়গির ব্যবস্থাপনা]
│
▼
[বিহারের বাহাল খান লোহানির অধীনে সেবা]
│
▼
['শের খান' উপাধি অর্জন ও উত্থান]
জৌনপুর থেকে ফিরে এসে তরুণ ফরিদ তাঁর পিতা হাসান খানের সসারাম ও খাসপুরের জায়গির তদারকির দায়িত্ব নেন। ১৫১৮ থেকে ১৫৩২ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে জায়গিরদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময়ই তিনি প্রথমবারের মতো তাঁর প্রশাসনিক ও ভূমি রাজস্ব ধারণার প্রয়োগ ঘটান। তিনি প্রত্যক্ষ করেন কীভাবে মধ্যস্বত্বভোগী ও স্থানীয় আমলারা দরিদ্র কৃষকদের শোষণ করে। ফলে তিনি সরাসরি কৃষকদের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক স্থাপনের উদ্যোগ নেন এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের কঠোর হস্তে দমন করেন। এই অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে সমগ্র ভারতে শেরশাহ এর ভূমি রাজস্ব নীতির ভিত্তি গঠনে সহায়তা করেছিল।
অভিভাবকদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে তিনি সসারাম ত্যাগ করেন এবং বিহারের আফগান সুবাদার বাহার খান লোহানির অধীনে চাকরি গ্রহণ করেন। একদিন শিকার অভিযানে গিয়ে ফরিদ কোনো অস্ত্রের সাহায্যে একটি পূর্ণবয়স্ক ব্যাংগল টাইগার হত্যা করেন। তাঁর এই অসাধারণ বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে বাহার খান লোহানি তাঁকে ‘শের খান’ উপাধিতে ভূষিত করেন এবং নিজের নাবালক পুত্র জালাল খানের অভিভাবক ও শিক্ষক নিযুক্ত করেন।
মোগল শক্তির সঙ্গে সংঘাত ও দিল্লির সিংহাসন লাভ
১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে জহিরউদ্দিন মুহম্মদ বাবর ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করেন এবং ইব্রাহিম লোদী পরাজিত হন। এর ফলে ভারতে আফগান শাসনের সাময়িক অবসান ঘটে। কিন্তু শেরখান ভারতীয় উপমহাদেশে আফগান সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নিজের রাজনৈতিক চাল চালতে থাকেন। তিনি কিছুদিন মোগল সম্রাট বাবরের সেনাবাহিনীতে কাজ করেন এবং মোগলদের সামরিক কৌশল ও প্রশাসনিক দুর্বলতা খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পান।
[চৌসার যুদ্ধ (১৫৩৯)]
(শেরখান বনাম সম্রাট হুমায়ুন)
│
▼
[শেরখান কর্তৃক মোগল বাহিনী পরাস্ত]
│
▼
[কনৌজের যুদ্ধ (১৫৪০)]
(চূড়ান্ত আফগান বিজয়)
│
▼
[দ্বিতীয় আফগান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা]
বাবরের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র হুমায়ুন যখন দিল্লির সিংহাসনে বসেন, তখন শেরখান তাঁর শক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছিলেন। চুনার দুর্গ অধিকার, বিহারে নিজের অবস্থান সুসংহত করা এবং পরবর্তীতে বাংলা আক্রমণ করে গৌড় দখল করার মাধ্যমে তিনি অপরিসীম অর্থ ও সম্পদের মালিক হন।
মোগল সম্রাট হুমায়ুন শেরখানের এই উত্থান বন্ধ করতে এগিয়ে আসেন। কিন্তু শেরখানের সমরকৌশল ও বিচক্ষণতার কাছে হুমায়ুন বারবার পরাস্ত হন:
- চৌসার যুদ্ধ (১৫৩৯ খ্রিষ্টাব্দ): গঙ্গ নদীর তীরে চৌসার প্রান্তরে শেরখান অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে বৃষ্টির রাতে মোগল শিবিরে আকস্মিক আক্রমণ চালান। হুমায়ুনের বাহিনী সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয় এবং হুমায়ুন কোনোমতে গঙ্গ নদী সাঁতরে প্রাণ বাঁচান। এই বিজয়ের পর শেরখান আত্মঘোষিত শাসক হিসেবে ‘শেরশাহ’ উপাধি গ্রহণ করেন এবং নিজের নামে খুতবা পাঠ ও মুদ্রা জারি করেন।
- কনৌজ বা বিলগ্রামের যুদ্ধ (১৫৪০ খ্রিষ্টাব্দ): ১৫৪০ খ্রিষ্টাব্দে কনৌজের যুদ্ধে শেরশাহ মোগল বাহিনীকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেন। সম্রাট হুমায়ুন ভারত ছেড়ে পারস্যে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
এই বিজয়ের মাধ্যমে উত্তর ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের সাময়িক অবসান ঘটে এবং প্রতিষ্ঠিত হয় সুসংগঠিত দ্বিতীয় আফগান সাম্রাজ্য (সুর সাম্রাজ্য)। শেরশাহ দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং আফগান শক্তির প্রাধান্য পুনরায় প্রতিষ্ঠা করেন।
শেরশাহ এর কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা
শেরশাহ স্বৈরাচারী ক্ষমতার অধিকারী সম্রাট হলেও তিনি কখনোই নিজেকে অনিয়ন্ত্রিত শাসক মনে করেননি। তিনি ছিলেন একাধারে সুপ্রশাসক ও প্রজাহিতৈষী রাজা। কেন্দ্রীয় প্রশাসন পরিচালনায় তিনি নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা ও ফারসি শাসনকৌশলের সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন। কেন্দ্রীয় সরকারকে সচল রাখতে শেরশাহ প্রধান চারটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেন:
┌───────────────────────────────┐
│ সম্রাট (শেরশাহ) │
└──────────────┬────────────────┘
│
┌──────────────────┬────────┴─────────┬──────────────────┐
▼ ▼ ▼ ▼
দেওয়ান-ই-উজারত দেওয়ান-ই-আরিজ দেওয়ান-ই-রিসালত দেওয়ান-ই-ইনশা
(অর্থ ও রাজস্ব) (সামরিক বিভাগ) (পররাষ্ট্র ও ধর্ম) (রাজকীয় আদেশ)
১. দেওয়ান-ই-উজারত (অর্থ ও রাজস্ব বিভাগ)
এই দপ্তরের প্রধান ছিলেন উজির বা অর্থমন্ত্রী। সাম্রাজ্যের যাবতীয় আয়-ব্যয় হিসাব রাখা, করের হার নির্ধারণ, জমি পরিমাপের পরিসংখ্যান পরীক্ষা করা এবং সরকারি কোষাগারের তদারকি করাই ছিল এই বিভাগের কাজ। শেরশাহ নিজে প্রতিনিয়ত এই দপ্তরের কাজের খোঁজখবর নিতেন।
২. দেওয়ান-ই-আরিজ (সামরিক বিভাগ)
সেনাবাহিনীর গঠন, নতুন সৈন্য নিয়োগ, অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ এবং সৈন্যদের বেতন পরিশোধের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তর ছিল দেওয়ান-ই-আরিজ। এর প্রধান কর্মকর্তা ছিলেন ‘আরিজ-ই-মুমালিক’। তবে সৈন্যদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ শেরশাহ নিজের হাতেই রেখেছিলেন।
৩. দেওয়ান-ই-রিসালত (পররাষ্ট্র ও ধর্মীয় বিভাগ)
এই দপ্তরটি বৈদেশি রাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা, দূত প্রেরণ এবং রাজ্যসীমার বাইরের গুরুত্বপূর্ণ খবরাখবর আদান-প্রদান করত। এছাড়া ধর্মীয় অনুদান, পীর-দরবেশদের ভাতা এবং বিভিন্ন দান-ধ্যানের বিষয়টিও এই দপ্তর তদারকি করত।
৪. দেওয়ান-ই-ইনশা (রাজকীয় চিঠিপত্র ও নথি বিভাগ)
রাজকীয় ফরমান বা আদেশনামা তৈরি, বিভিন্ন প্রদেশের গভর্নর ও জেলা কর্মকর্তাদের কাছে সম্রাটের নির্দেশ পৌঁছে দেওয়া এবং সরকারি নথি সংরক্ষণ করার কাজ পরিচালনা করত দেওয়ান-ই-ইনশা। এর প্রধানকে বলা হতো ‘দবীর-ই-খাস’।
এছাড়া বিচার ব্যবস্থার জন্য দেওয়ান-ই-কাজী এবং তথ্য সংগ্রহের জন্য দেওয়ান-ই-বারিদ (গোয়েন্দা বিভাগ) নামে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর সক্রিয়ভাবে কাজ করত।
প্রাদেশিক ও স্থানীয় শাসন কাঠামো
শেরশাহ পুরো সাম্রাজ্যকে কয়েকটি প্রশাসনিক স্তরে ভাগ করেছিলেন যাতে শেষ প্রান্তের কৃষকও যেন সরাসরি রাজকীয় শাসনের সুবিধা পায়। কেন্দ্র থেকে গ্রাম পর্যন্ত একটি সমন্বিত প্রশাসনিক শৃঙ্খলা তৈরি করা হয়েছিল।
[সাম্রাজ্য] ➔ [৪৭টি সরকার (জেলা)] ➔ [পরগণা (উপজেলা)] ➔ [গ্রাম (সর্বনিম্ন একক)]
১. সরকার বা জেলা প্রশাসন
শেরশাহ তাঁর সমগ্র সাম্রাজ্যকে ৪৭টি সরকার বা জেলায় বিভক্ত করেন। প্রতিটি সরকারের মূল দায়িত্ব দুইজন প্রধান রাজকীয় কর্মকর্তার হাতে ন্যস্ত থাকত:
- শিকদার-ই-শিকদারান: তিনি ছিলেন জেলার সর্বোচ্চ নির্বাহী ও আইনশৃঙ্খলা কর্মকর্তা। তাঁর অধীনে একটি ছোট সামরিক বাহিনী থাকত, যা জেলার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিধান করত এবং পরগণার শিকদারদের কাজ তদারকি করত।
- মুন্সিফ-ই-মুন্সিফান: তিনি ছিলেন জেলার প্রধান বিচারক এবং রাজস্ব তত্ত্বাবধানকারী কর্মকর্তা। দেওয়ানি বিরোধ মীমাংসা করা এবং আমিলদের পাঠানো রাজস্ব নথি পরীক্ষা করা তাঁর মূল দায়িত্ব ছিল।
২. পরগণা বা উপজেলা প্রশাসন
প্রতিটি সরকার একাধিক পরগণা বা উপজেলায় বিভক্ত ছিল। পরগণা স্তরে প্রশাসনিক কাজকর্ম পরিচালনার জন্য নিম্নলিখিত চারজন প্রধান আধিকারিক কর্মরত ছিলেন:
- শিকদার: পরগণার স্তরে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতেন।
- আমিল (বা মুনসিফ): সরাসরি কৃষকদের সাথে যোগাযোগ রেখে রাজস্ব সংগ্রহ করতেন।
- ফতেদার: পরগণার কোষাধ্যক্ষ হিসেবে নগদ অর্থ ও রাজস্বের হিসেব রাখতেন।
- কানুনগো: এলাকার জমির রাজস্ব রেকর্ড, কৃষকদের তালিকা ও ভূমির সীমানা সংক্রান্ত নথিপত্র সংরক্ষণ করতেন।
৩. গ্রাম বা সর্বনিম্ন স্তর
প্রশাসনের সর্বনিম্ন স্তর ছিল গ্রাম। শেরশাহ গ্রামের ঐতিহ্যবাহী স্বায়ত্তশাসন প্রথাকে নষ্ট না করে তাকে সরকারি কাঠামোর সাথে যুক্ত করেন।
- মোকাদ্দম বা প্রধান: গ্রামের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত স্থানীয় প্রতিনিধি।
- পাটোয়ারী: গ্রামের কৃষিজমি ও রাজস্বের বিস্তারিত হিসাব রক্ষাকারী কর্মকর্তা।
- চৌকিদার: গ্রামের নৈশ প্রহরী ও নিরাপত্তা রক্ষী।
ভূমি ও রাজস্ব সংস্কার: পাট্টা ও কবুলিয়ত
শেরশাহ এর শাসন ব্যবস্থার সবচেয়ে উজ্জ্বল ও যুগান্তকারী দিক ছিল তাঁর ভূমি ও রাজস্ব সংস্কার। তাঁর পূর্বে মধ্যযুগীয় ভারতে কৃষকরা প্রায়শই মধ্যস্বত্বভোগীদের অত্যাচার ও অনিশ্চিত রাজস্ব ব্যবস্থার শিকার হতো। শেরশাহ রাজস্ব ব্যবস্থায় এমন এক স্বচ্ছতা আনেন, যা পরবর্তীতে মোগল ও ব্রিটিশদের রাজস্ব নীতির ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
┌─────────────────────────────────────────────────┐
│ জমি পরিমাপ (জড়ি ও রজ্জু) │
└────────────────────────┬────────────────────────┘
│
▼
┌─────────────────────────────────────────────────┐
│ কৃষি জমির ভাগ (উত্তম, মধ্যম ও নিম্নমানের জমি) │
└────────────────────────┬────────────────────────┘
│
▼
┌────────────────────────┴────────────────────────┐
│ │
▼ ▼
[পাট্টা প্রদান] [কবুলিয়ত গ্রহণ]
(সরকার কর্তৃক অধিকার) (কৃষক কর্তৃক স্বীকারোক্তি)
১. বিজ্ঞানসম্মত জমি পরিমাপ
শেরশাহ আন্দাজ বা অনুমানের ওপর ভিত্তি করে রাজস্ব ধার্য করার প্রথা একপ্রকার বন্ধ করে দেন। তিনি সমগ্র সাম্রাজ্যের আবাদযোগ্য জমি সুনির্দিষ্টভাবে মেপে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
- জমি পরিমাপের জন্য তিনি ‘গজ-ই-শেরশাহী’ (৩১ অంగుলি বিশিষ্ট স্কেল) এবং সুতি দড়ির পরিবর্তে জড়ি (লোহার রিংযুক্ত পরিমাপক শিকল) প্রবর্তন করেন।
- উর্বরতা ও ফসল উৎপাদনের ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে সমস্ত জমিকে প্রধানত তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়: উত্তম, মধ্যম ও নিম্ন।
২. পাট্টা ও কবুলিয়ত প্রথা
কৃষকদের মালিকানা সুনির্দিষ্ট করা এবং শোষণের হাত থেকে রক্ষা করতে শেরশাহ দুটি ঐতিহাসিক দলিল প্রবর্তন করেন:
- পাট্টা (Patta): সরকার থেকে কৃষককে প্রদত্ত একটি আইনি সনদ বা অধিকারপত্র। এতে কৃষকের নাম, জমির সীমানা, জমির শ্রেণী এবং রাষ্ট্রকে ঠিক কত টাকা বা শস্য কর হিসেবে দিতে হবে তা স্পষ্টাক্ষরে লেখা থাকত।
- কবুলিয়ত (Qabuliyat): পাট্টায় উল্লেখিত শর্তাবলী ও করের পরিমাণ মেনে নিয়ে কৃষক স্বজ্ঞানে ও সচ্ছায় স্বাক্ষর বা টিপসই দিয়ে সরকারকে যে প্রতিশ্রুতিপত্র জমা দিত, তাকে কবুলিয়ত বলা হতো।
৩. করের হার ও তকাভি ঋণ
গড় উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ (১/৩ অংশ) রাজস্ব হিসেবে ধার্য করা হতো। কৃষকদের সুবিধা অনুযায়ী শস্য বা নগদ অর্থে রাজস্ব দেওয়ার সুযোগ ছিল; তবে শেরশাহ নগদ অর্থে কর আদায়কে অধিক প্রাধান্য দিতেন।
বন্যা, খরা বা যুদ্ধের কারণে শস্যের ক্ষতি হলে রাজকীয় ফান্ড থেকে কর মওকুফ করা হতো। এছাড়া বীজ, বলদ ও আধুনিক কৃষি সরঞ্জাম কেনার জন্য কৃষকদের রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে ‘তকাভি’ (Takavi) নামে সুদমুক্ত কৃষি ঋণ প্রদান করা হতো।
মুদ্রা ও অর্থনৈতিক সংস্কার
শেরশাহ ধ্বংসপ্রায় এবং অস্থিতিশীল মধ্যযুগীয় মুদ্রাব্যবস্থাকে পুনর্গঠিত করে একটি মজবুত আর্থিক কাঠামোর ভিত্তি স্থাপন করেন। তাঁর মুদ্রা সংস্কার ভারতীয় উপমহাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।
| মুদ্রার নাম | ধাতুর উপাদান | ধাতব ওজন (গ্রেইন) | প্রশাসনিক গুরুত্ব ও ব্যবহার |
| রুপিয়া (Rupiya) | খাঁটি রৌপ্য (Silver) | ১৭৮ গ্রেইন | মূল প্রাতিষ্ঠানিক লেনদেনের মুদ্রা; আধুনিক রুপি-র পূর্বসূরি। |
| দাম (Dam) | খাঁটি তাম্র (Copper) | ৩৮০ গ্রেইন | সাধারণ জনগণের দৈনন্দিন কেনাকাটা ও খুচরো লেনদেনের মাধ্যম। |
| মহর (Mohur) | খাঁটি স্বর্ণ (Gold) | ১৬৯ গ্রেইন | রাজকীয় কোষাগার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যবহৃত অতি মূল্যবান মুদ্রা। |
১ রৌপ্য রুপিয়া = ৬৪ তাম্র দাম
শেরশাহ পূর্বতন বিভিন্ন জটিল মুদ্রার প্রচলন বন্ধ করে একটি সার্বজনীন অনুপাত নির্ধারণ করেন। তাঁর প্রবর্তিত ১৭৮ গ্রেইনের রৌপ্য ‘রুপিয়া’ এতটাই জনপ্রিয় ও বৈজ্ঞানিক ছিল যে তা মোগল আমলে, ব্রিটিশ আমলে এবং স্বাধীনতার পর আধুনিক ভারতেও মুদ্রার মূল নাম হিসেবে টিকে থাকে।
অভ্যন্তরীণ শুল্ক দূরীকরণ
বাণিজ্য প্রসারে শেরশাহ সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে বিদ্যমান অসংখ্য শুল্কঘাটি ও অপ্রয়োজনীয় ট্যাক্স বাতিল করেন। ব্যবসায়ীদের সমগ্র সাম্রাজ্যে কেবল দুই জায়গায় শুল্ক পরিশোধ করতে হতো:
- প্রথমত, সাম্রাজ্যের সীমান্তে পণ্য প্রবেশ করানোর সময়।
- দ্বিতীয়ত, বাজারে পণ্যটি চূড়ান্তভাবে বিক্রি করার সময়।
এর ফলে পণ্যের যাতায়াত সহজ হয়, পরিবহন খরচ কমে যায় এবং ব্যবসায়ীরা নিরাপত্তার সাথে অবাধ বাণিজ্য পরিচালনা করতে সক্ষম হন।
অবকাঠামো, সড়ক ও ডাক ব্যবস্থা
শেরশাহের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি সেকালের বাণিজ্য ও শাসনব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটায়। বিশাল সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং দ্রুত খবর আদান-প্রদানের প্রয়োজনীয়তায় তিনি সাম্রাজ্যজুড়ে চারটি প্রধান মহাসড়ক গড়ে তোলেন।
┌───────────────────────────────┐
│ শেরশাহ এর সড়ক নেটওয়ার্ক │
└──────────────┬────────────────┘
│
┌──────────────────┬────────┴─────────┬──────────────────┐
▼ ▼ ▼ ▼
সড়ক-ই-আজম আগ্রা থেকে আগ্রা থেকে লাহোর থেকে
(GT Road) বুরহানপুর যোধপুর মুলতান
১. সড়ক-ই-আজম (গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড)
শেরশাহের নির্মিত সর্বশ্রেষ্ঠ অবকাঠামোগত কীর্তি হলো ‘সড়ক-ই-আজম’। এটি পূর্ব বাংলার সোনারগাঁও থেকে শুরু হয়ে কলকাতা, বারাণসী, আগ্রা, দিল্লি ও লাহোর হয়ে একদম উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের সিন্ধু নদ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল (প্রায় ২,৫০০ কিলোমিটার বা ১,৫০০ মাইল)। ইংরেজদের শাসনামলে এই মহাসড়কের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড (GT Road)।
অন্যান্য প্রধান তিনটি সড়ক ছিল:
- আগ্রা থেকে বুরহানপুর পর্যন্ত সড়ক।
- আগ্রা থেকে যোধপুর হয়ে চিতোর পর্যন্ত সড়ক।
- লাহোর থেকে মুলতান পর্যন্ত সড়ক।
২. সরাইখানা ও ডাক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন
পথিক, ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মীদের নিরাপদ ভ্রমণের জন্য শেরশাহ প্রতিটি সড়কের পাশে দুই ক্রোশ (প্রায় ৪ মাইল) পর পর একটি করে মোট প্রায় ১,৭০০টি সরাইখানা (পান্থশালা) নির্মাণ করেন।
- এই সরাইখানাগুলোতে হিন্দু ও মুসলিম ভ্রমণকারীদের জন্য সম্পূর্ণ পৃথক থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা থাকত।
- সরাইখানাগুলোকে কেন্দ্র করে দ্রুত বার্তা প্রেরণের জন্য ডাক ব্যবস্থা (Pony Express) গড়ে তোলা হয়। প্রতিটি সরাইখানায় সর্বদা দুটি রাজকীয় ঘোড়া এবং ডাকসংগ্রাহক (ডাক-চৌকি) প্রস্তুত থাকত, যা সম্রাটের যেকোনো জরুরী বার্তা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কয়েকশ মাইল দূরে পৌঁছে দিতে পারত।
সামরিক সংস্কার
এক শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর ওপর ভর করেই শেরশাহ মোগলদের পরাস্ত করতে এবং সাম্রাজ্য সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে কেবল সামন্তপ্রভুদের বা জায়গিরদারদের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা সম্ভব নয়। তাই তিনি সরাসরি রাজকীয় নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত একটি স্থায়ী সেনাবাহিনী গঠন করেন।
┌─────────────────────────────────────────┐
│ শেরশাহ এর স্থায়ী কেন্দ্রীয় বাহিনী │
└────────────────────┬────────────────────┘
│
┌──────────────────┬──────────┴──────────┬──────────────────┐
▼ ▼ ▼ ▼
অশ্বারোহী বাহিনী পদাতিক বাহিনী হস্তী বাহিনী আধুনিক কামান বিভাগ
(Cavalry Forces) (Infantry Troops) (Elephant Corps) (Artillery Units)
১. দাগ ও হুলিয়া প্রথা পুনরুজ্জীবন
সুলতান আলাউদ্দিন খলজির পর শেরশাহ-ই একমাত্র শাসক যিনি সামরিক প্রশাসনে জালিয়াতি রুখতে দাগ ও হুলিয়া প্রথার কঠোর বাস্তবায়ন করেন:
- দাগ (Dag): সেনাবাহিনীতে নিম নিম্নমানের বা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহৃত ঘোড়া প্রদর্শন বন্ধ করতে উন্নতমানের রাজকীয় ঘোড়ার গায়ে গরম লোহার সিল দিয়ে দাগ দেওয়া হতো।
- হুলিয়া (Huliya): প্রক্সি বা ভুয়া সৈনিকের উপস্থিতি রোধ করতে প্রতিটি সৈন্যের শারীরিক চেহারার বিবরণ বা বায়ো-ডেটা সরকারি রেজিস্ট্রারে লিখিত রাখা হতো।
২. নগদ বেতন ও সরাসরি পরিদর্শন
শেরশাহ জায়গির বা জমি বরাদ্দের বদলে সৈনিকদের রাজকীয় কোষাগার থেকে সরাসরি নগদ বেতন দিতেন। তিনি স্বয়ং সেনাশিবির পরিদর্শন করে সৈন্য ও ঘোড়ার গুণগত মান পরীক্ষা করতেন। যোগ্যতার ভিত্তিতে সৈনিকদের পদোন্নতি দেওয়া হতো, ফলে বাহিনীর শৃঙ্খলা ও আনুগত্য বজায় থাকত।
বিচার ও পুলিশ প্রশাসন
শেরশাহের মতে, “বিচার কার্য হলো সর্বোত্তম ধর্মীয় কর্তব্য, যা রাজা এবং দরিদ্রের মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না।” তিনি এক নিরপেক্ষ এবং অপরাধহীন শাসনব্যবস্থা উপহার দিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
┌───────────────────────────────┐
│ শেরশাহ এর বিচার ব্যবস্থা │
└──────────────┬────────────────┘
│
┌───────────────┴───────────────┐
▼ ▼
[কাজী ও মুন্সিফ বিচার] [স্থানীয় দায়ীত্ব নীতি]
(আইনগত সিদ্ধান্ত প্রদান) (অপরাধ দমনে মোকাদ্দমদের দায়)
১. সমান বিচার নীতি
সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ কাজী ছিলেন শেরশাহ নিজে। জেলায় মুন্সিফ-ই-মুন্সিফান এবং পরগণায় কাজী ও মুনসিফ দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার বিচার করতেন। অপরাধী উচ্চবংশীয় কোনো সর্দার হোক বা রাজকীয় কর্মকর্তা, শেরশাহ কাউকেই ছাড় দিতেন না। চুরি, ডাকাতি ও ঘুষ গ্রহণের ক্ষেত্রে অ অঙ্গচ্ছেদ এবং প্রাণদণ্ডের মতো কঠোর শাস্তির বিধান ছিল।
২. স্থানীয় দায়িত্ব নীতি (Local Responsibility)
অপরাধ দমনে শেরশাহ এক বৈপ্লবিক প্রশাসনিক নীতি গ্রহণ করেন, যা ‘স্থানীয় দায়িত্ব নীতি’ নামে পরিচিত। এই নিয়ম অনুযায়ী:
- যদি কোনো গ্রামে বা পরগণায় কোনো পথিক বা ব্যবসায়ী ডাকাতির শিকার হতো বা খুন হতো, তবে সেই অঞ্চলের মোকাদ্দম (গ্রামপ্রধান) বা শিকদারকে অপরাধীকে খুঁজে বের করতে হতো এবং লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধার করে দিতে হতো।
- অপরাধীকে ধরতে ব্যর্থ হলে স্থানীয় গ্রামপ্রধান ও অধিবাসীদের সম্মিলিতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির ক্ষয়ক্ষতির টাকা জরিমানা হিসেবে দিতে হতো।
এই নীতির ফলে স্থানীয় কর্মকর্তারা অত্যন্ত সজাগ থাকতেন এবং অপরাধীরা স্থানীয় কারও আশ্রয়ে থাকার সাহস পেত না। তৎকালীন ঐতিহাসিক আব্বাস খান সারওয়ানি লিখেছেন, “শেরশাহের সময় এক বৃদ্ধা নারী সোনা-দানায় ভরা ঝুড়ি মাথায় নিয়ে কোনো ভয় ছাড়া একা একা এক শহর থেকে অন্য শহরে ভ্রমণ করতে পারত; ডাকাত বা চোরেরা তাঁর কাছে যাওয়ার সাহস পেত না।”
ধর্মীয় নীতি ও পরমতসহিষ্ণুতা
শেরশাহ একজন গোঁড়া সুন্নি মুসলিম হিসেবে নিজের ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মীয় অনুশাসন কঠোরভাবে মেনে চলতেন। কিন্তু রাষ্ট্রের শাসক হিসেবে তিনি ধর্মান্ধতার ঊর্ধ্বে উঠে নীতি নির্ধারণ করতেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে একটি হিন্দু-প্রধান দেশে শাসন সুসংহত করতে হলে পরমতসহিষ্ণুতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি অপরিহার্য।
- হিন্দুনীতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ: শেরশাহ ধর্মীয় বৈষম্য ভুলে যোগ্য হিন্দু ব্যক্তিদের সেনাবাহিনী ও উচ্চ প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দেন। তাঁর সেনাবাহিনীর অন্যতম সেরা জেনারেল ছিলেন ব্রহ্মজিৎ গৌড় (Brahmajit Gaur), যিনি একাধিক যুদ্ধে মোগলদের বিরুদ্ধে আফগান সেনার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
- ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমাজকল্যাণ: হিন্দু প্রজাদের নিজস্ব রীতিনীতি, উৎসব ও পূজা-পার্বণ পালনে রাষ্ট্র কখনো হস্তক্ষেপ করত না। সরাইখানাগুলোতে হিন্দু যাত্রীদের পানীয় জল ও খাবারের ব্যবস্থা করার জন্য বিশেষ ব্রাহ্মণ কর্মচারী নিযুক্ত রাখা হতো।
- দাতব্য কাজ: তিনি রাজ্যজুড়ে দরিদ্র ও অভাবী মানুষদের সাহায্য করার জন্য উন্মুক্ত লঙ্গরখানা (বিনামূল্যে খাবার বিতরণের স্থান) পরিচালনা করতেন, যা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য উন্মুক্ত ছিল।
শেরশাহ ও সম্রাট আকবরের শাসন ব্যবস্থার তুলনা
ইতিহাসের অনেক ঐতিহাসিক শেরশাহকে মোগল সম্রাট আকবরের “পথপ্রদর্শক” বা “পূর্বসূরি” হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। শেরশাহের রেখে যাওয়া প্রশাসনিক পরিকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে সম্রাট আকবর তাঁর বিখ্যাত মোগল শাসনযন্ত্র গড়ে তুলতে পেরেছিলেন।
| শাসনের ক্ষেত্র | শেরশাহ সূরি (১৫৪০-১৫৪৫) | মোগল সম্রাট আকবর (১৫৫৬-১৬০৫) |
| প্রশাসনিক বিভাগ | পুরো রাজ্যকে ৪৭টি সরকার এবং একাধিক পরগণায় ভাগ করেন। | রাজ্যকে সুবা (প্রদেশ), সরকার ও পরগণায় পুনর্গঠন করেন। |
| ভূমি রাজস্ব | জড়ি ও রজ্জু দিয়ে মেপে ১/৩ অংশ রাজস্ব নির্ধারণ ও পাট্টা-কবুলিয়ত প্রথা। | শেরশাহের ব্যবস্থা অনুসরণ করে পরবর্তীতে দহসালা বা জাবতি প্রথা চালুকরণ। |
| মুদ্রা ব্যবস্থা | ১৭৮ গ্রেইনের রৌপ্য রুপিয়া এবং তামার দাম চালু করেন। | শেরশাহের রুপিয়ার ওজন ও নাম হুবহু বজায় রাখেন। |
| সামরিক নীতি | দাগ ও হুলিয়া প্রথা কঠোরভাবে প্রয়োগ করেন। | দাগ-হুলিয়া অক্ষুণ্ণ রেখে এর সাথে মনসবদারী প্রথা যুক্ত করেন। |
| যোগাযোগ | সড়ক-ই-আজম (GT Road) ও ১,৭০০টি সরাইখানা নির্মাণ। | শেরশাহের সড়ক ও সরাইখানা নেটওয়ার্কের আরও সম্প্রসারণ করেন। |
কালপঞ্জি: শেরশাহ এর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী
[১৪৭২/১৪৮৬] ➔ ফরিদের জন্ম (নারনৌল/বাজওয়াদা)
│
[১৫১৮-১৫৩২] ➔ সসারামের জায়গির তদারকি ও প্রাথমিক রাজস্ব অভিজ্ঞতা
│
[১৫২২] ➔ 'শের খান' উপাধি লাভ (বাহার খান লোহানি কর্তৃক)
│
[১৫৩৯] ➔ চৌসার যুদ্ধে সম্রাট হুমায়ুনকে পরাজয় ও 'শেরশাহ' উপাধি গ্রহণ
│
[১৫৪০] ➔ কনৌজের যুদ্ধে চূড়ান্ত জয় ও দিল্লির সিংহাসনে দ্বিতীয় আফগান সাম্রাজ্য স্থাপন
│
[১৫৪০-১৫৪৫] ➔ পাট্টা-কবুলিয়ত, মুদ্রা সংস্কার, সড়ক-ই-আজম ও প্রশাসনিক পুনর্গঠন
│
[১৫৪৫] ➔ কালিন্জর দুর্গ অবরোধের সময় বারুদ বিস্ফোরণে শেরশাহ এর আকস্মিক প্রয়াণ
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর (FAQ)
১. শেরশাহ কত বছর দিল্লি শাসন করেছিলেন?
শেরশাহ ১৫৪০ খ্রিষ্টাব্দে কনৌজের যুদ্ধে মোগল সম্রাট হুমায়ুনকে পরাজিত করে সিংহাসনে বসেন এবং ১৫৪৫ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করা পর্যন্ত মাত্র ৫ বছর শাসন করেছিলেন।
২. পাট্টা ও কবুলিয়ত প্রথার মূল উদ্দেশ্য কী ছিল?
কৃষকের জমির ওপর স্বত্ব সুনির্দিষ্ট করা, রাজস্বের পরিমাণ স্বচ্ছ রাখা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের অত্যাচার থেকে কৃষককে রক্ষা করাই ছিল পাট্টা ও কবুলিয়ত প্রথার মূল উদ্দেশ্য।
৩. গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড (GT Road) এর আসল নাম কী ছিল?
শেরশাহের আমলে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড-এর নাম ছিল ‘সড়ক-ই-আজম’ (বা বাদশাহী সড়ক)। এটি সোনারগাঁও থেকে শুরু হয়ে লাহোর ও সিন্ধু নদ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
৪. আধুনিক ভারতীয় মুদ্রার নাম ‘রুপি’ হওয়ার পেছনে শেরশাহ এর অবদান কী?
শেরশাহ প্রথম ১৭৮ গ্রেইন ওজনের বিশুদ্ধ রৌপ্য মুদ্রা চালু করেন এবং এর নাম দেন ‘রুপিয়া’। এই মুদ্রাই পরবর্তীকালে ব্রিটিশ ও আধুনিক ভারতের মূল মুদ্রা ব্যবস্থা অর্থাৎ ‘রুপি’ (Rupee)-র রূপ নেয়।
৫. শেরশাহ এর সমাধি কোথায় অবস্থিত?
শেরশাহ এর সমাধি বিহারের সসারাম (Sasaram) নামক স্থানে একটি কৃত্রিম হ্রদের মাঝখানে সুন্দর ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যে নির্মিত হয়েছে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, শেরশাহ সূরি কেবল একজন দক্ষ বিজয়ী বা বীর যোদ্ধা ছিলেন না; তিনি ছিলেন মধ্যযুগীয় ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রশাসনিক দূরদর্শী। মাত্র পাঁচ বছরের সংক্ষিপ্ত শাসনকালে তিনি রাজস্ব নীতি, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, মুদ্রা ব্যবস্থা, ডাক যোগাযোগ এবং আইন-শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে যে অভাবনীয় ও গঠনমূলক সংস্কার সাধন করেছিলেন, তা মধ্যযুগের ইতিহাসে বিরল।
তিনি এমন এক প্রশাসনিক ব্যবস্থা রেখে গিয়েছিলেন যা কেবল তাঁর সুর বংশকেই রক্ষা করেনি, বরং পরবর্তীতে মোগল সাম্রাজ্য এবং ব্রিটিশ ভারতের শাসনযন্ত্রের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। প্রজাহিতৈষী দৃষ্টিভঙ্গি, কঠোর শাসননীতি এবং দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে শেরশাহ ভারতীয় ইতিহাসের পাতায় এক চিরস্মরণীয় রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে অমর হয়ে থাকবেন।
ভূমিকা:
ভারতের মধ্যযুগীয় ইতিহাসে যে কজন শাসক নিজেদের অসাধারণ শাসনদক্ষতা এবং দূরদর্শিতার কারণে অমর হয়ে রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে সম্রাট শেরশাহ সূরি (Sher Shah Suri) অন্যতম। মাত্র পাঁচ বছর (১৫৪০–১৫৪৫ খ্রিস্টাব্দ) রাজত্ব করলেও, তিনি ভারতের শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। মুঘল সম্রাট হুমায়ুনকে কনৌজের যুদ্ধে পরাজিত করে তিনি দিল্লিতে দ্বিতীয় আফগান সাম্রাজ্য বা সূরি বংশের প্রতিষ্ঠা করেন।
অধ্যাপক কে. আর. কানুনগোর মতে, “শেরশাহের শাসন ব্যবস্থা ছিল মধ্যযুগীয় ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও প্রগতিশীল শাসন ব্যবস্থা।” তিনি কেবল একজন দিগ্বিজয়ী বীরই ছিলেন না, বরং একাধারে দক্ষ প্রশাসক, দূরদর্শী সংস্কারক এবং প্রজাবৎসল সম্রাট ছিলেন। পরবর্তীকালে মুঘল সম্রাট আকবর তাঁর বিখ্যাত শাসন ব্যবস্থার বহু অংশই শেরশাহের কাঠামো থেকে ধার করেছিলেন। এই কারণে শেরশাহকে ‘আকবরের অগ্রদূত’ বলা হয়। এই নিবন্ধে আমরা শেরশাহের শাসন ব্যবস্থার প্রতিটি দিক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আলোচনা করব।
শেরশাহের কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা (Central Administration)
শেরশাহের শাসন ব্যবস্থা ছিল মূলত স্বৈরতান্ত্রিক ও কেন্দ্রাভিমুখী। সমস্ত ক্ষমতার উৎস ছিলেন স্বয়ং সম্রাট। তবে তাঁর স্বৈরতন্ত্র ছিল জনকল্যাণকামী। শাসনকার্য পরিচালনার সুবিধার্থে তিনি সমগ্র প্রশাসনকে কয়েকটি প্রধান সরকারি বিভাগে বিভক্ত করেছিলেন। প্রতিটি বিভাগের দায়িত্বে একজন করে বিশ্বস্ত মন্ত্রী বা উচ্চপদস্থ কর্মচারী নিযুক্ত থাকতেন।
প্রধান সরকারি বিভাগসমূহ:
- দিওয়ান-ই-ওয়াজিরাত (Diwan-i-Wizarat): এটি ছিল মূলত অর্থ বিভাগ। রাষ্ট্রের আয়-ব্যয় এবং রাজস্ব ব্যবস্থার তদারকি করা ছিল এই বিভাগের প্রধান কাজ। এর প্রধানকে বলা হতো ‘ওয়াজির’।
- দিওয়ান-ই-আরিজ (Diwan-i-Ariz): এটি ছিল সামরিক বিভাগ। সেনাবাহিনীর নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, রসদ সরবরাহ এবং শৃঙ্খলার দায়িত্ব ছিল এই বিভাগের ওপর।
- দিওয়ান-ই-রসালাত (Diwan-i-Rasalat): এই বিভাগটি বিদেশি রাষ্ট্র ও রাজদূতদের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা এবং পররাষ্ট্র নীতি দেখাশোনা করত।
- দিওয়ান-ই-ইনশা (Diwan-i-Insha): এটি ছিল সরকারি চিঠিপত্র এবং রাজকীয় আদেশ (ফরমান) লিখন ও নথিবদ্ধকরণের বিভাগ।
প্রাদেশিক ও স্থানীয় শাসন ব্যবস্থা (Provincial & Local Administration)
শেরশাহ তাঁর বিশাল সাম্রাজ্যকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার জন্য একটি বিকেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করেছিলেন। তিনি সমগ্র সাম্রাজ্যকে কয়েকটি প্রশাসনিক স্তরে ভাগ করেন:
┌────────────────────────┐
│ সাম্রাজ্য (Emperor) │
└───────────┬────────────┘
▼
┌────────────────────────┐
│ সরকার (Sarkar) │
└───────────┬────────────┘
▼
┌────────────────────────┐
│ পরগনা (Pargana) │
└───────────┬────────────┘
▼
┌────────────────────────┐
│ গ্রাম (Village) │
└────────────────────────┘
সরকার (Sarkar)
সাম্রাজ্যকে কয়েকটি জেলা বা ‘সরকার’-এ বিভক্ত করা হয়েছিল। শেরশাহের অধীনে মোট ৪৭টি ‘সরকার’ ছিল (মতান্তরে পাঞ্জাবের বাইরে ৬৬টি)। প্রতিটি সরকারের প্রধান দুই কর্মকর্তা ছিলেন:
- শিকদার-ই-শিকদারান: তিনি ছিলেন প্রধান সামরিক কর্মকর্তা। জেলার শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করা তাঁর প্রধান দায়িত্ব ছিল।
- মুন্সিফ-ই-মুন্সিফান: তিনি ছিলেন প্রধান দেওয়ানি বিচারক ও রাজস্ব পরিদর্শক।
পরগনা (Pargana)
প্রতিটি ‘সরকার’ আবার কয়েকটি ‘পরগনা’ বা থানায় বিভক্ত ছিল। পরগনার প্রধান কর্মকর্তারা হলেন:
- শিকদার: পরগনার শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং রাজস্ব আদায়ে সাহায্য করা।
- আমিন বা মুন্সিফ: ভূমি জরিপ ও রাজস্ব নির্ধারণ করা।
- ফতেদার: পরগনার কোষাধ্যক্ষ বা ক্যাশিয়ার।
- কারকুন: ফার্সি ও হিন্দি ভাষায় হিসাবরক্ষক।
গ্রামীণ শাসন ব্যবস্থা (Village Administration)
শাসনের সর্বনিম্ন স্তর ছিল গ্রাম। শেরশাহ গ্রামীণ স্বায়ত্তশাসনকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। গ্রামের প্রধান বা ‘মুকদ্দম’ বা ‘চৌধুরী’ এবং হিসাবরক্ষক ‘পাটওয়ারী’ গ্রামীণ শান্তি-শৃঙ্খলা ও রাজস্ব আদায়ের কাজ দেখাশোনা করতেন।
ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা ও কৃষি সংস্কার (Land Revenue Reforms)
শেরশাহের শাসন ব্যবস্থার সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক ছিল তাঁর ভূমি রাজস্ব সংস্কার। কৃষকদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি প্রজাহিতৈষী নীতি গ্রহণ করেন।
| সংস্কারের বিষয় | বিস্তারিত বিবরণ |
| ১. জমি জরিপ | শেরশাহ সিকান্দরি গজ (৩২ ইঞ্চি) এবং জরিব (রশি) ব্যবহার করে সাম্রাজ্যের সমস্ত চাষযোগ্য জমি সঠিকভাবে পরিমাপ করার ব্যবস্থা করেন। |
| ২. জমির শ্রেণীবিভাগ | উর্বরতার ওপর ভিত্তি করে জমিকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়—উত্তম, মধ্যম ও অনুত্তম। |
| ৩. রাজস্বের হার | উৎপাদিত ফসলের গড় মূল্যের ১/৩ অংশ (এক-তৃতীয়াংশ) রাজস্ব হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। কৃষকরা নগদ টাকা বা শস্য—যেকোনো মাধ্যমে এই রাজস্ব দিতে পারত। |
| ৪. রায়তওয়ারী ব্যবস্থা | মধ্যস্বত্বভোগীদের অত্যাচার বন্ধ করতে শেরশাহ সরাসরি কৃষকদের সাথে রাষ্ট্রের যোগাযোগ স্থাপন করেন, যা ‘রায়তওয়ারী ব্যবস্থা’ নামে পরিচিত। |
কবুলিয়ত ও পাট্টা (Kabubliyat & Patta)
কৃষকদের অধিকার সুরক্ষায় শেরশাহ দুটি ঐতিহাসিক দলিল প্রবর্তন করেন:
- পাট্টা: এটি ছিল রাষ্ট্র কর্তৃক কৃষককে দেওয়া একটি অধিকারপত্র বা সরকারি দলিল, যেখানে কৃষকের নাম, জমির পরিমাণ এবং নির্দিষ্ট রাজস্বের হার লিখিত থাকত।
- কবুলিয়ত: পাট্টা পাওয়ার পর কৃষকরা নির্দিষ্ট রাজস্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরকারকে যে সম্মতিপত্র সই করে দিত, তাকে ‘কবুলিয়ত’ বলা হতো।
সামরিক সংস্কার ও দাগ-হুলিয়া প্রথা (Military Reforms)
একটি শক্তিশালী ও সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনী ছাড়া সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব অসম্ভব—এটি শেরশাহ ভালোভাবেই জানতেন। তাই তিনি সামরিক বাহিনীতে ব্যাপক রদবদল ঘটান:
- স্থায়ী সেনাবাহিনী: তিনি সুলতানি আমলের জায়গিরদারি প্রথার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে সরাসরি কেন্দ্রের অধীনে একটি বিশাল স্থায়ী সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন।
- দাগ ও হুলিয়া প্রথা (Dag and Huliya): আলাউদ্দিন খিলজীর সামরিক নীতি অনুসরণ করে শেরশাহ সেনাবাহিনীতে দুর্নীতি রুখতে ঘোড়া চিহ্নিতকরণের জন্য ‘দাগ’ প্রথা এবং প্রতিটি সৈনিকের শারীরিক বিবরণ নথিবদ্ধ করার জন্য ‘হুলিয়া’ প্রথার কড়াকড়ি পুনর্নবীকরণ করেন।
- নগদ বেতন: সৈন্যদের জায়গিরের পরিবর্তে সরাসরি রাজকোষ থেকে নগদ অর্থ বা বেতনের ব্যবস্থা করা হয়।
যোগাযোগ ব্যবস্থা ও গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড (Communication and Transport)
ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতি এবং দ্রুত সামরিক যাতায়াতের জন্য শেরশাহ ভারতের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন।
গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড (Grand Trunk Road / GT Road)
শেরশাহের যোগাযোগ ব্যবস্থার শ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো ‘সড়ক-ই-আজম’, যা আজকের দিনে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড (Grand Trunk Road) নামে বিশ্ববিখ্যাত। এটি পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশ) সোনারগাঁও থেকে শুরু করে কলকাতা, দিল্লি ও লাহোর হয়ে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের পেশোয়ার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল (প্রায় ১৫০০ মাইল)। এছাড়া তিনি আগ্রা থেকে বোরহানপুর, আগ্রা থেকে যোধপুর এবং লাহোর থেকে মূলতান পর্যন্ত বহু সংযোগকারী সড়ক নির্মাণ করেন।
সরাইখানা ও ডাক চৌকি (Sarais and Postal System)
- সরাইখানা: পথিক ও ব্যবসায়ীদের বিশ্রামের জন্য সড়কের ধারে প্রতি দুই ক্রোশ (প্রায় ৪ মাইল) অন্তর অন্তর প্রায় ১,৭০০টি সরাইখানা বা পান্থশালা নির্মাণ করা হয়। এখানে হিন্দু ও মুসলিমদের জন্য পৃথক থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল।
- ডাক যোগাযোগ ব্যবস্থা: এই সরাইখানাগুলো একই সাথে ‘ডাক চৌকি’ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ঘোড়সওয়ার ডাকবাহকদের মাধ্যমে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে রাজকীয় খবরাখবর আদান-প্রদান করা হতো।
বিচার ও পুলিশ ব্যবস্থা এবং জননিরাপত্তা
শেরশাহের বিচার ব্যবস্থা ছিল নিরপেক্ষ ও কঠোর। আইনের চোখে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই সমান ছিল।
- বিচার ব্যবস্থা: সুলতান নিজে প্রতি বুধবার সুপ্রিম কোর্ট বা সর্বোচ্চ আদালতে বিচার করতেন। পরগনা স্তরে ‘মুন্সিফ’ এবং সরকার স্তরে ‘মুন্সিফ-ই-মুন্সিফান’ দেওয়ানি মামলার বিচার করতেন। ফৌজদারি মামলার জন্য কাজি ও মুফতিরা নিযুক্ত ছিলেন।
- পুলিশ ব্যবস্থা ও যৌথ দায়িত্ব নীতি: শেরশাহ পৃথক কোনো পুলিশ বাহিনী গঠন করেননি; সামরিক কর্মকর্তারাও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজ করতেন। তবে তিনি ‘যৌথ দায়িত্ব নীতি’ চালু করেন। কোনো গ্রামে চুরি বা ডাকাতি হলে, সেই গ্রামের প্রধান বা ‘মুকদ্দম’-কে চোর ধরতে হতো। চোর ধরতে না পারলে প্রধানকে সেই ক্ষতির জরিমানা দিতে হতো। এই কঠোর নিয়মের ফলে সাম্রাজ্যে অপরাধের সংখ্যা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছিল।
মুদ্রা ও বাণিজ্য সংস্কার (Currency & Trade)
ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে শেরশাহ পুরনো জরাজীর্ণ মুদ্রা ব্যবস্থা বাতিল করে এক নতুন ও বৈজ্ঞানিক মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করেন।
- টাকা ও দাম: তিনি ১৭৮ গ্রেন ওজনের খাঁটি রুপোর মুদ্রা চালু করেন, যার নাম দেওয়া হয় ‘রুপিয়া’ বা ‘টাকা’ (Rupia)। এর পাশাপাশি তিনি কপার বা তামার তৈরি ‘দাম’ (Dam) নামক মুদ্রারও প্রচলন করেন। এই মুদ্রা ব্যবস্থা এতটাই নিখুঁত ছিল যে পরবর্তীকালে মুঘল এবং ব্রিটিশ আমলেও এর কাঠামো বজায় রাখা হয়েছিল।
- শুল্ক মুক্ত বাণিজ্য: শেরশাহ সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে যত্রতত্র শুল্ক আদায় বন্ধ করে দেন। কেবল পণ্য উৎপাদনের স্থানে এবং দেশের সীমান্তে—এই দুই জায়গায় শুল্ক নেওয়া হতো, যা বাণিজ্যের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
শেরশাহ ও আকবরের শাসন ব্যবস্থার তুলনামূলক
| শাসনের ক্ষেত্র | শেরশাহের অবদান | আকবরের পরবর্তী রূপান্তর |
| ভূমি রাজস্ব | জমি জরিপ করে ফসলের ১/৩ অংশ রাজস্ব নির্ধারণ করেন (পাট্টা ও কবুলিয়ত)। | শেরশাহের এই ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করেই টোডরমল ‘জাবতি প্রথা’ বা দহশালা ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। |
| সামরিক বাহিনী | ‘দাগ’ ও ‘হুলিয়া’ প্রথার আধুনিকীকরণ করেন। | এই ব্যবস্থার পরিমার্জন করে আকবর ‘মনসবদারি প্রথা’ চালু করেন। |
| মুদ্রা ব্যবস্থা | খাঁটি রুপোর ‘রুপিয়া’ বা মুদ্রা প্রবর্তন করেন। | মুঘল মুদ্রা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে এটিই গৃহীত হয়। |
উপসংহার:
মাত্র পাঁচ বছরের সংক্ষিপ্ত রাজত্বকালে শেরশাহ যে অসাধারণ শাসন কাঠামো তৈরি করেছিলেন, তা শুধু মধ্যযুগীয় ভারতের ইতিহাসেই নয়, আধুনিক ভারতের অনেক প্রশাসনিক সংস্কারের অনুপ্রেরণা। ইংরেজ ঐতিহাসিক এইচ. জি. কিন (H.G. Keene) যথার্থই বলেছেন:
“কোনো মহান রাজাই শেরশাহের চেয়ে বেশি প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে পারেননি।”
তিনি সংকীর্ণ ধর্মীয় গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে উঠে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা তৈরি করেছিলেন। তাঁর তৈরি ভূমি রাজস্ব, মুদ্রা এবং সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারতকে সমৃদ্ধ করেছে। তাই বলা যায়, শেরশাহ কেবল দিল্লির সুলতানই ছিলেন না, তিনি ছিলেন প্রজাদের প্রকৃত হিতৈষী এক মহান রাষ্ট্রনায়ক।