ভূমিকা:
ভারত মূলত একটি ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ু -র দেশ। আরবি শব্দ ‘মৌসুম’ থেকে উদ্ভূত এই বায়ুপ্রবাহ ভারতের জনজীবন, প্রকৃতি এবং অর্থনীতির প্রধান নিয়ন্ত্রক। ভারতের ভৌগোলিক অবস্থানে হিমালয় পর্বতমালার উপস্থিতি এবং ভারত মহাসাগরের প্রভাব মৌসুমি বায়ুকে এক অনন্য বৈশিষ্ট্য দান করেছে। প্রতি বছর জুন মাসে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর আগমনের মাধ্যমেই ভারতের ঋতুচক্রের প্রকৃত আবর্তন শুরু হয়। ভারতের প্রায় ৮০ শতাংশ বৃষ্টিপাত এই বায়ুর প্রভাবেই ঘটে থাকে, যা দেশের রুক্ষ ধরিত্রীকে শস্য-শ্যামলা করে তোলে।
ভারতের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে মৌসুমি বায়ুর গুরুত্ব অপরিসীম। এদেশের বিশাল জনসংখ্যা এবং তাদের জীবনজীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল, আর সেই কৃষিব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণভাবে মৌসুমি বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। এই বায়ুর খামখেয়ালিপনা বা অনিশ্চয়তার ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হয় ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা ও মুদ্রাস্ফীতির গতিপ্রকৃতি। তাই ভারতীয় অর্থনীতিকে অনেক সময় ‘মৌসুমি বায়ুর জুয়াখেলা’ (Gamble of the Monsoon) বলে অভিহিত করা হয়। কেবল কৃষি নয়, ভারতের নদ-নদীর জলপ্রবাহ, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন, বনাঞ্চলের প্রকৃতি এবং এমনকি মানুষের সাংস্কৃতিক উৎসবগুলোও এই মৌসুমি বায়ুর ছন্দে বাঁধা। এক কথায়, মৌসুমি বায়ু ভারতের প্রাণস্পন্দন; যা দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করার পাশাপাশি কোটি কোটি মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে।
মৌসুমী বায়ু কাকে বলে?
আরবী ‘মওসুম’ শব্দ হতে মৌসুমি শব্দের উৎপত্তি। মওসুম শব্দের অর্থ ঋতু।এ বায়ুর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে এর দিক পরিবর্তন হয়। আবার কারো কারো মতে এ মালয়ী শব্দ ‘মনসিন’ হতে উদ্ভব হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার যে বায়ুপ্রবাহ ছয়মাস উত্তর-পূর্ব দিক হতে এবং ছয়মাস দক্ষিণ-পশ্চিম দিক হতে প্রবাহিত হয় তাকে মৌসুমী বায়ু বলে। আবার শীত ও গ্রীষ্মকালের সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী বায়ুপ্রবাহকে মৌসুমি বায়ু বলে।
মৌসুমী বায়ু দুই প্রকার যেমন:
- গ্রীষ্মকালীন মৌসুমি বায়ু।
- শীতকালীন মৌসুমি বায়ু।
গ্রীষ্মকালীন মৌসুমি বায়ু বলতে কী বোঝ?
গ্রীষ্মকালে উত্তর গোলার্ধে কর্কটক্রান্তি রেখার ওপর সূর্য লম্বভাবে কিরণ দেয়। এতে মধ্য এশিয়া, উত্তর-পশ্চিম ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থলভাগ উত্তপ্ত হয় এবং সেখানকার বায়ু উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এজন্য ঐ সময় নিম্ন চাপের সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরের জলভাগ সেই সময় অপেক্ষাকৃত কম গরম থাকায় সেখানে উচ্চচাপের সৃষ্টি হয়।এই উচ্চচাপযুক্ত জলভাগ এলাকা থেকে বায়ু এশিয়ার স্থলভাগে সৃষ্ট নিম্নচাপের দিকে প্রবাহিত হয়।
ফেরেলের সূত্রানুসারে নিরক্ষরেখা অতিক্রম করে উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে বেঁকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে প্রবাহিত হয়। এ বায়ু বছরের এক নির্দিষ্ট সময়ে বা ঋতুতে প্রবাহিত হয় বলে একে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বলা হয়। এই বায়ু দীর্ঘপথ সমুদ্রের ওপর দিয়ে আসে বলে জলীয়বাষ্পপূর্ণ থাকে এবং হিমালয় ও অন্যান্য উচ্চ পর্বতগাত্রে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়।
এর প্রভাবে বাংলাদেশে গ্রীষ্মকালে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটে এবং কৃষির উন্নতি হয়। দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু দুটি শাখায় বিভক্ত, (ক) আরবসাগরীয় শাখা এবং (খ) বঙ্গোপসাগরীয় শাখা। আরবসাগরীয় শাখা আরব সাগর থেকে এবং বঙ্গোপসাগরীয় শাখা বঙ্গোপসাগর থেকে উৎপত্তি হয়।
শীতকালীন মৌসুমি বায়ু বলতে কী বোঝ?
সূর্যের দক্ষিণায়নের সাথে সাথে উত্তর গোলার্ধে উত্তাপ কমতে থাকে ও উচ্চচাপের সৃষ্টি হয়। এ সময় সূর্য দক্ষিণে মকরক্রান্তি রেখার নিকট অগ্রসর হয়ে লম্বভাবে কিরণ দেয়। ফলে মকরক্রান্তির নিকটবর্তী দেশগুলোতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়।এই সময় মধ্য এশিয়ার উচ্চচাপযুক্ত অঞ্চল থেকে শীতল, ভারী ও শুষ্ক বায়ু সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত হতে থাকে। একে উত্তর-পূর্ব মৌসুমী বায়ু বলা হয়।
এ বায়ুর একটি অংশ জাপান সাগর ও বঙ্গোপসাগর অতিক্রম করার পর যথাক্রমে জাপান ও তামিলনাডুতে বৃষ্টিপাত ঘটায়। উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু নিরক্ষরেখা অতিক্রম করে দক্ষিণ গোলার্ধে এসে পৌঁছলে ফেরেলের সূত্র অনুসারে বেঁকে উত্তর-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু নামে অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশ করে। সেখানে এ বায়ু গ্রীষ্মকালীন মৌসুমি রূপে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়।
মৌসুমি বিস্ফোরণ কাকে বলে?
কোন কোন বছর দেখা যায় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ভারত তথা অন্যান্য মৌসুমি বায়ুর প্রভাবিত অঞ্চল গুলিতে প্রচুর পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয় যা স্বাভাবিকের থেকে অনেক বেশি। ফলস্বরূপ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। একেই বলা হয় মৌসুমি বিস্ফোরণ। সাধারণত যে যে বছর প্রশান্ত মহাসাগরের এল নিনো উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় না সে সে বছর দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু যথেষ্ট সক্রিয় হয়ে প্রবল বৃষ্টিপাত ঘটায়।
মৌসুমি বায়ুর ছেদ বা বিরাম বলতে কী বোঝ?
দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু আরব সাগরীয় শাখা হতে ভারতে প্রবেশ করে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়। কিন্তু এই বৃষ্টি সব সময় একই রকম হয় না বলে কখনো কখনো ৭ থেকে ১৫ দিন বিরাম নেওয়ার পর আবার বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। একেই মৌসুমী বায়ুর ছেদ বা বিরাম বলা হয়।
ভারত কে কেন মৌসুমি বায়ুর দেশ বলা হয়?
‘মৌসিম’ শব্দে এর অর্থ হল ঋতু। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মৌসুমি বায়ু প্রবাহেরও পরিবর্তন হয়। স্থলভাগ ও জলভাগের উত্তাপের পার্থক্যের ফলে সমুদ্র বায়ু এবং স্থল বায়ুর মতো মৌসুমি বায়ুরও সৃষ্টি হয়। ভারতের জলবায়ু ও বৃষ্টিপাতে মৌসুমি বায়ুর বিরাট প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এইজন্য ভারতকে মৌসুমি বায়ুর দেশ বলা হয়।
ভারতের মৌসুমি জলবায়ু -র চারটি প্রধান ঋতু:
শীতকাল (ডিসেম্বর – ফেব্রুয়ারি):
- শীতল ও শুষ্ক আবহাওয়া।
- উত্তর ভারতে রাতের তাপমাত্রা অনেক কমে যায়।
- পশ্চিমা ঝড় বয়ে নিয়ে আসে কিছু বৃষ্টিপাত, বিশেষ করে পাঞ্জাব ও কাশ্মীর অঞ্চলে।
গ্রীষ্মকাল (মার্চ – মে):
- অত্যন্ত গরম ও শুষ্ক সময়।
- অনেক স্থানে তাপমাত্রা ৪০°C-এর ওপরে পৌঁছে যায়।
- খরার প্রবণতা দেখা যায়।
বর্ষাকাল (জুন – সেপ্টেম্বর):
- দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু প্রবেশ করে এবং ভারি বৃষ্টিপাত ঘটায়।
- কৃষিকাজের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়।
- পশ্চিমঘাট ও আসাম অঞ্চলে সর্বাধিক বৃষ্টি হয়।
পশ্চাৎ বর্ষা বা শরৎকাল (অক্টোবর – নভেম্বর):
- মৌসুমি বায়ু ধীরে ধীরে পশ্চাদপসরণ করে।
- দক্ষিণ ভারতে কিছু বৃষ্টি হয় পূর্ব-উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ুর কারণে।
- আবহাওয়া ধীরে ধীরে শীতল হতে থাকে।
ভারতের মৌসুমি জলবায়ু -র বৈশিষ্ট্য:
ভারতের মৌসুমি জলবায়ু অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় এবং দেশের কৃষি থেকে শুরু করে অর্থনীতি—সবকিছুর ওপর এর গভীর প্রভাব রয়েছে। ভারতের মৌসুমি জলবায়ুর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:
ঋতু পরিবর্তন
ভারতের জলবায়ুর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো ঋতুচক্রের সুষ্পষ্ট পর্যায়। মৌসুমি বায়ুর আসা এবং যাওয়ার ওপর ভিত্তি করে মূলত চারটি প্রধান ঋতু দেখা যায়:
- শীতকাল: ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি।
- গ্রীষ্মকাল: মার্চ থেকে মে।
- বর্ষাকাল: জুন থেকে সেপ্টেম্বর (মৌসুমি বায়ুর আগমন)।
- শরৎকাল: অক্টোবর থেকে নভেম্বর (মৌসুমি বায়ুর প্রত্যাবর্তন)।
বায়ুর দিক পরিবর্তন
মৌসুমি শব্দের অর্থ হলো ‘ঋতু’। ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে বায়ুর প্রবাহের দিক সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী হয়ে যায়।
- গ্রীষ্মকালে: দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু সমুদ্র থেকে স্থলের দিকে প্রবাহিত হয়, যা প্রচুর জলীয় বাষ্প নিয়ে আসে।
- শীতকালে: উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু স্থলভাগ থেকে সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত হয়, তাই এই বায়ু শুষ্ক থাকে।
বৃষ্টিপাতের অনিশ্চয়তা ও অসম বণ্টন
ভারতের বৃষ্টিপাত সম্পূর্ণভাবে মৌসুমি বায়ুর ওপর নির্ভরশীল, তবে এতে দুটি প্রধান সমস্যা দেখা যায়:
- অনিশ্চয়তা: মৌসুমি বায়ু কোনো বছর সময়মতো আসে, আবার কোনো বছর দেরি করে। কোনো বছর অতিবৃষ্টির ফলে বন্যা হয়, আবার কোনো বছর বৃষ্টি কম হওয়ায় খরা দেখা দেয়।
- অসম বণ্টন: ভারতের সব জায়গায় সমান বৃষ্টি হয় না। যেমন—মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জি বা মৌসিনরামে অত্যধিক বৃষ্টি হয়, অন্যদিকে রাজস্থানের থর মরুভূমি অঞ্চলে বৃষ্টিপাত অত্যন্ত কম।
পর্বতের প্রভাব (শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত)
ভারতের বৃষ্টিপাতে ভূ-প্রকৃতি বা পাহাড়-পর্বতের ভূমিকা অপরিসীম। দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু যখন পশ্চিমঘাট পর্বতমালা বা হিমালয়ে বাধা পায়, তখন সেই ঢালে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়। একে শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত বলা হয়।
আর্দ্র গ্রীষ্মকাল ও শুষ্ক শীতকাল
মৌসুমি জলবায়ু -র প্রভাবে ভারতের গ্রীষ্মকাল ও বর্ষাকাল সাধারণত আর্দ্র থাকে, অর্থাৎ বাতাসে প্রচুর জলীয় বাষ্প ও বৃষ্টিপাত থাকে। বিপরীতভাবে, শীতকালে উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আকাশ পরিষ্কার থাকে এবং বৃষ্টিপাত প্রায় হয় না বললেই চলে (তামিলনাড়ুর করমণ্ডল উপকূল বাদে)।
উষ্ণতার প্রভাব
মৌসুমি বায়ুর আগমনের আগে (এপ্রিল-মে মাসে) ভারতের তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যায়। কিন্তু জুন মাসে বৃষ্টি শুরু হওয়ার সাথে সাথেই তাপমাত্রার প্রকোপ কিছুটা কমে আসে এবং আবহাওয়া আরামদায়ক হয়।
ভারতের মৌসুমি জলবায়ু -র প্রভাব:
- ভারত ‘আন্তঃ মৌসুমি জলবায়ু -র দেশ‘ হওয়ায় ভারতের অধিকাংশ বৃষ্টিপাত মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ঘটে থাকে। বর্ষাকালে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু, শরৎকালে প্রত্যাবর্তনকারী মৌসুমি বায়ু এবং শীতকালে উত্তর–পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাব ভারতের জলবায়ু ও বৃষ্টিপাতের উপর সবচেয়ে বেশি থাকে। গ্রীষ্মকালে দক্ষিণ-পূর্ব এবং শীতকালে উত্তর-পূর্ব এই দুটি বিপরীতমুখী বায়ুপ্রবাহের ফলে ভারতে আর্দ্র গ্রীষ্মকাল এবং শুষ্ক শীতকাল এই দুটি প্রধান ঋতুর সৃষ্টি হয়েছে।
- দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে সমুদ্রের উপর দিয়ে আগত মৌসুমি বায়ুতে প্রচুর জলীয় বাস্প থাকে বলে বর্ষাকালের জুন মাস থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ভারতের বিভিন্ন স্থানে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটে।
- বর্ষাকালে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু -র প্রভাবে ভারতে পশ্চিম উপকূলের উত্তরাংশ, অসম, মিজোরাম, পূর্ব হিমালয়, তরাই অঞ্চল এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়।
- দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর বঙ্গোপসাগরীয় শাখার প্রভাবে উত্তর–পূর্ব ভারতের গারো, খাসি ও পূর্ব হিমালয়ের পাদদেশবর্তী অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হলেও এই সব অঞ্চলের দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে বৃষ্টিপাত ক্রমশ কমে যেতে থাকে।
- দক্ষিণ–পশ্চিম মৌসুমি বায়ু -র আরব সাগরীয় শাখার প্রভাবে দক্ষিণ থেকে উত্তর ও উত্তর পশ্চিমে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ক্রমশ কমতে থাকে।
- মৌসুমি বায়ু -র প্রভাবে খাসি, গারো, পূর্ব হিমালয় এবং পশ্চিমঘাট পর্বতের প্রতিবাত ঢালে প্রবল শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত হলেও অনুবাত ঢালে বৃষ্টিহীন বা অল্পবৃষ্টিযুক্ত বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলের সৃষ্টি হয়েছে।
- অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে শরৎকাল অথবা শীতকালের শুরুতে প্রত্যাবর্তনকারী মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হয় এবং করমণ্ডল উপকূলে বৃষ্টিপাত ঘটে।
- উত্তর–পূর্ব মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে শীতকালে ভারতে বৃষ্টিপাত খুব একটা হয় না, কেবল মাত্র করমণ্ডল উপকূলে ডিসেম্বর মাসে কিছুটা বৃষ্টিপাত হয়।
- দক্ষিণ–পশ্চিম মৌসুমি বায়ু -র প্রভাবে ভারতে গ্রীষ্মকালীন উষ্ণতা কিছুটা কমে যায়।
- মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ফলে হিমালয় পর্বত সহ ভারতের বিভিন্ন অংশে চিরহরিৎ, পর্ণমোচী এবং সরলবর্গীয় বৃক্ষের গভীর অরণ্যে সৃষ্টি হয়েছে। এইসব অরণ্য থেকে মুল্যবান কাঠ এবং অন্যান্য অরণ্য সম্পদ পাওয়া যায়।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, ভারতের সামগ্রিক জীবনযাত্রায় মৌসুমি জলবায়ু -র প্রভাব অপরিসীম ও বহুমুখী। ভারতের কৃষি, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতি—এই তিনটি স্তম্ভই মৌসুমি বায়ু -র ছন্দে স্পন্দিত হয়। যদিও এই বায়ুর খামখেয়ালিপনা, অর্থাৎ অনাবৃষ্টি বা অতিবৃষ্টির ফলে খরা ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় ভারতের জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে, তবুও এর গুরুত্ব কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। পর্যাপ্ত মৌসুমি বৃষ্টিপাত যেমন দেশের খাদ্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে এবং কৃষকের মুখে হাসি ফোটায়, তেমনি শিল্প ও বাণিজ্যের চাকাকে সচল রেখে জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে।
আধুনিক যুগে উন্নত সেচব্যবস্থা এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাস প্রদানের প্রযুক্তির উন্নতি সত্ত্বেও, ভারতের বিশাল ভূখণ্ডে মৌসুমি বায়ুই হলো প্রকৃত প্রাণশক্তি। এটি কেবল একটি বায়ুপ্রবাহ নয়, বরং ভারতের জলবায়ুগত ভারসাম্যের মূল ভিত্তি। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা থেকে শুরু করে ভূগর্ভস্থ জলস্তর পুনর্ভরণ পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই মৌসুমি বায়ুর অবদান অনস্বীকার্য। তাই সঙ্গত কারণেই মৌসুমি বায়ুকে ভারতের ‘অর্থনৈতিক ভাগ্যবিধাতা’ বলা হয়, যা এদেশের বৈচিত্র্যময় প্রকৃতির বুকে জীবনের স্পন্দন টিকিয়ে রেখেছে।