সমভূমি কাকে বলে? সমভূমির শ্রেণীবিভাগ ও বৈশিষ্ট্য: What is a plain? Classification and characteristics of plains.
ভূমিকা:
ভূপৃষ্ঠের বৈচিত্র্যময় ভূমিরূপের মধ্যে সমভূমি হলো সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ এবং জীবনদায়ী একটি অংশ। সাধারণত সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে খুব বেশি উঁচুতে অবস্থিত নয় এমন বিস্তীর্ণ সমতল ভূভাগকে আমরা সমভূমি হিসেবে চিনি। পৃথিবীর মোট স্থলভাগের অর্ধেকেরও বেশি অঞ্চল জুড়ে এই সমতল ভূমির বিস্তার। পলিমাটি সমৃদ্ধ উর্বর মৃত্তিকা এবং অনুকূল জলবায়ুর কারণে প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ বসবাসের জন্য পাহাড় বা মালভূমির তুলনায় সমভূমিকেই প্রধান হিসেবে বেছে নিয়েছে।
মূলত উৎপত্তি ও গঠনের প্রক্রিয়া অনুসারে সমভূমি অঞ্চলকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। যার মধ্যে নদী বিধৌত পলল সমভূমি বা সঞ্চয়জাত সমভূমি সবচাইতে উর্বর হয়। কৃষিকাজের অভাবনীয় সাফল্য, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং দ্রুত শিল্পায়নের কারণে সমভূমি অঞ্চলকে মানব সভ্যতার ‘লীলাভূমি’ বলা হয়ে থাকে। আজকের এই ব্লগে আমরা সমভূমির সংজ্ঞা, এর অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ এবং মানব জীবনে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। আপনি যদি সমভূমির শ্রেণীবিভাগ এবং এর ভৌগোলিক গুরুত্ব সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পেতে চান, তবে এই আর্টিকেলটি আপনার জন্য অত্যন্ত সহায়ক হবে।
সমভূমি কাকে বলে?
স্থলভাগের যেসব বিস্তীর্ণ এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠের চেয়ে সামান্য উঁচু (৩০০ মিটারের কম) এবং সামান্য ঢেউ খেলানো, সেই ভূভাগকে সমভূমি বলে।
সমভূমি শ্রেণীবিভাগ করো:
উৎপত্তি ও গঠনের প্রক্রিয়া অনুসারে সমভূমিকে প্রধানত তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। নিচে এর বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
সঞ্চয়জাত সমভূমি (Depositional Plain)
প্রাকৃতিক শক্তির (নদী, বায়ু, হিমবাহ) দ্বারা বয়ে আনা পলি, বালি বা ধূলিকণা কোনো নিচু স্থানে দীর্ঘকাল ধরে সঞ্চিত হয়ে এই সমভূমি গঠিত হয়। এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণি। এর কয়েকটি উপবিভাগ হলো:
পলিগঠিত সমভূমি:
সাধারণত নদী দ্বারা বয়ে আসা পলি, বালি কাদা ইত্যাদি নদীর দু – পাশে বা মোহানায় সঞ্চিত হয়ে পলিগঠিত সমভূমি গঠিত হয়।
উদাহরণ: সিন্ধু-গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের সমভূমি।
লাভা গঠিত সমভূমি:
ভূগর্ভের উত্তপ্ত তরল পদার্থ ভূপৃষ্ঠের ফাটল বা দুর্বল স্থান দিয়ে বাইরে বেরিয়ে ভূপৃষ্ঠের বিস্তীর্ণ অংশে জমাট বেঁধে লাভা সমভূমি গঠিত হয়। উদাহরণ: আইসল্যান্ডের সমভূমি।
লোয়েস সমভূমি:
মরু অঞ্চলের অতিসূক্ষ্ম বালুকণা বায়ুর দ্বারা বয়ে গিয়ে অনেক দূরে কোনো নীচু স্থানে দীর্ঘদিন ধরে সঞ্চিত হয়ে লোয়েস সমভূমি গঠন করে।উদাহরণ: গোবি মরুভূমির লোয়েস দ্বারা চিনের হোয়াংহো নদী অববাহিকায় লোয়েস সমভূমি গড়ে উঠেছে।
এছাড়াও…
- প্লাবন সমভূমি: বর্ষাকালে নদীর দুকূল প্লাবিত হয়ে পলি জমার মাধ্যমে তৈরি হয়।
- বদ্বীপ সমভূমি: নদীর মোহনায় পলি জমে মাত্রাহীন ‘ব’ বা গ্রিক অক্ষর ডেল্টার ($\Delta$) মতো আকৃতি ধারণ করে।
ক্ষয়জাত সমভূমি (Erosional Plain)
দীর্ঘকাল ধরে বায়ু, নদী বা হিমবাহের মতো প্রাকৃতিক শক্তির ক্রমাগত ক্ষয়কাজের ফলে উচ্চভূমি বা মালভূমি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে নিচু সমতলে পরিণত হলে তাকে ক্ষয়জাত সমভূমি বলে।
- পেনিপ্লেন (Peneplain) বা প্রায় সমভূমি: দীর্ঘকাল নদী ক্ষয়ের ফলে কোনো উচ্চভূমি প্রায় সমতলে পরিণত হলে তাকে পেনিপ্লেন বলে। এর মাঝে মাঝে কঠিন শিলায় গঠিত ছোট পাহাড় বা ‘মোনাডনক’ দেখা যায়।
- পেডিমেন্ট (Pediment): মরু অঞ্চলে বায়ু ও জলধারার ক্ষয়কাজে পাহাড়ের পাদদেশে তৈরি হওয়া সমভূমি।
- হিমবাহ ক্ষয়জাত সমভূমি: হিমবাহের ঘর্ষণে কঠিন শিলা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে এই সমভূমি সৃষ্টি হয় (যেমন: কানাডিয়ান শিল্ড অঞ্চল)।
ভূ-গাঠনিক সমভূমি (Structural Plain)
পৃথিবীর অভ্যন্তরে ভূ-আলোড়নের ফলে যখন ভূখণ্ডের কোনো অংশ উপরে উঠে আসে বা নিচে বসে গিয়ে সমতলে পরিণত হয়, তাকে ভূ-গাঠনিক সমভূমি বলে।
- উন্নত সমভূমি: সমুদ্রের অগভীর তলদেশ ভূ-আলোড়নের ফলে উপরে উঠে এসে সমভূমি গঠন করে।
- অবনত সমভূমি: কোনো উচ্চভূমি নিচু হয়ে সমতলে পরিণত হলে তাকে অবনত সমভূমি বলে।
| প্রধান শ্রেণি | উদাহরণ | প্রধান কারণ |
| সঞ্চয়জাত | সিন্ধু-গাঙ্গেয় সমভূমি | পলি ও বালি সঞ্চয় |
| ক্ষয়জাত | ছোটনাগপুর মালভূমির অংশ | নদী বা বায়ুর ক্ষয়কাজ |
| ভূ-গাঠনিক | রাশিয়ার সমভূমি | ভূ-আলোড়ন |
মানব জীবনের সমভূমির প্রভাব:
মানব জীবনে সমভূমির প্রভাব অপরিসীম। পৃথিবীর অধিকাংশ উন্নত সভ্যতা এবং জনবসতি সমভূমি অঞ্চলেই গড়ে উঠেছে। নিচে মানব জীবনে সমভূমির প্রধান প্রভাবগুলো আলোচনা করা হলো:
কৃষিকাজের সুবিধা
সমভূমি অঞ্চলের মাটি সাধারণত পলি গঠিত এবং অত্যন্ত উর্বর হয়। সমতল ভূপ্রকৃতির কারণে এখানে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা এবং জলসেচ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সহজ। ফলে ধান, গম, পাটের মতো ফসলের ব্যাপক উৎপাদন সম্ভব হয়, যা ওই অঞ্চলের মানুষের প্রধান খাদ্য ও জীবিকার উৎস হয়ে দাঁড়ায়।
উন্নত পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা
সমতল ভূমি হওয়ায় এখানে রাস্তাঘাট, রেলপথ এবং খাল খনন করা অনেক সহজ ও ব্যয়সাধ্য কম। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য দ্রুত প্রসার লাভ করে এবং মানুষের গতিশীলতা বৃদ্ধি পায়।
ঘন জনবসতি
কৃষির সুযোগ, উন্নত যোগাযোগ এবং অনুকূল জলবায়ুর কারণে সমভূমি অঞ্চলে জীবনধারণের সুবিধা সবচেয়ে বেশি। তাই মালভূমি বা পার্বত্য অঞ্চলের তুলনায় সমভূমিতে জনবসতির ঘনত্ব অনেক বেশি থাকে।
শিল্প ও নগরায়ন
কাঁচামালের সহজলভ্যতা এবং উন্নত পরিবহন ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে সমভূমি অঞ্চলে বড় বড় শিল্পকারখানা গড়ে ওঠে। এর ফলে দ্রুত নগরায়ন ঘটে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। কোলকাতা বা ঢাকা—এরকম বড় বড় শহরগুলো মূলত সমভূমি অঞ্চলেই অবস্থিত।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশ
সহজ জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক সচ্ছলতার কারণে সমভূমি অঞ্চলের মানুষের মধ্যে শিক্ষা, সাহিত্য এবং সংস্কৃতির দ্রুত বিকাশ ঘটে। প্রাচীনকাল থেকেই গঙ্গা বা সিন্ধু নদের অববাহিকার মতো সমভূমিগুলো বিভিন্ন মহান সংস্কৃতির মিলনস্থল হিসেবে পরিচিত।
পানীয় জলের সহজলভ্যতা
সমভূমি অঞ্চলে সাধারণত বড় বড় নদী প্রবাহিত হয় এবং ভূগর্ভস্থ জলস্তর খুব একটা গভীরে থাকে না। ফলে পানীয় জল এবং কৃষিকাজের জন্য প্রয়োজনীয় জল সহজেই পাওয়া যায়।
সমভূমির বৈশিষ্ট্য:
সমভূমির বৈশিষ্ট্যগুলি হল—
স্বল্প উচ্চতা ও সমতল ভূপ্রকৃতি
সমভূমি সাধারণত সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে খুব বেশি উঁচুতে অবস্থিত হয় না (সাধারণত ৩০০ মিটারের নিচে)। এর উপরিভাগ অত্যন্ত সমতল বা সামান্য তরঙ্গায়িত হয়, যেখানে ভূমির ঢাল খুব একটা বোঝা যায় না।
উর্বর মৃত্তিকা
অধিকাংশ সমভূমি নদীর পলি সঞ্চিত হয়ে গঠিত হয়। এই পলিমাটি অত্যন্ত উর্বর হওয়ায় সমভূমি অঞ্চল কৃষিকাজের জন্য পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়।
ধীরগতির নদীপ্রবাহ
সমভূমি অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলোর গতিবেগ খুব কম থাকে। ঢাল কম হওয়ার কারণে নদীগুলো আঁকাবাঁকা পথে চলে এবং অনেক সময় অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ বা প্লাবন ভূমি তৈরি করে।
জলবায়ুর স্থিতিশীলতা
পার্বত্য অঞ্চলের মতো এখানে আবহাওয়ার চরমভাব লক্ষ্য করা যায় না। অধিকাংশ সমভূমি অঞ্চলে মানব বসবাসের উপযোগী নাতিশীতোষ্ণ বা অনুকূল জলবায়ু বিরাজ করে।
ভূগর্ভস্থ জলস্তর
সমভূমি অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ জলস্তর সাধারণত মাটির খুব কাছাকাছি থাকে। ফলে কূপ বা নলকূপের মাধ্যমে পানীয় ও সেচের জল সংগ্রহ করা সহজ হয়।
উন্নত যোগাযোগ ও পরিকাঠামো
ভূমিরূপ সমতল হওয়ায় এখানে রাস্তাঘাট, রেলপথ এবং বড় বড় ইমারত নির্মাণ করা সহজ ও সাশ্রয়ী। এই কারণে সমভূমি অঞ্চলে পরিবহন ব্যবস্থা ও নগরায়ন দ্রুত ঘটে।
ঘন জনবসতি
জীবনধারণের সবরকম অনুকূল সুযোগ-সুবিধা থাকায় পৃথিবীর অধিকাংশ বড় শহর ও ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল এই সমভূমিগুলোতেই গড়ে উঠেছে।
উৎপত্তি অনুসারে সমভূমিকে মূলত তিনভাগে ভাগ করা যায়:
- ক্ষয়জাত সমভূমি: দীর্ঘকাল ধরে প্রাকৃতিক শক্তির (বায়ু, জল) প্রভাবে ক্ষয় পেয়ে গঠিত হয়।
- সঞ্চয়জাত সমভূমি: নদী, হিমবাহ বা বায়ুর দ্বারা পলি ও বালি সঞ্চিত হয়ে গঠিত হয় (যেমন—গাঙ্গেয় সমভূমি)।
- উন্নত বা অবনত সমভূমি: ভূ-আন্দোলনের ফলে সমুদ্রের তলদেশ উপরে উঠে বা ভূখণ্ড নিচে বসে গিয়ে গঠিত হয়।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, সমভূমি কেবল একটি বিস্তীর্ণ সমতল ভূখণ্ড নয়, বরং এটি পৃথিবীর প্রাণস্পন্দন এবং মানব সভ্যতার ধারক ও বাহক। উর্বর পলিমাটি, কৃষিকাজের অনুকূল পরিবেশ এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত জনপদ ও বড় বড় শহর এই সমভূমি অঞ্চলেই গড়ে উঠেছে। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা থেকে শুরু করে বিশ্বের অন্যান্য প্রধান সমভূমিগুলো আজও কোটি কোটি মানুষের খাদ্য ও বাসস্থানের প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করছে।
প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সমভূমি অঞ্চলের ভূমি ও জলজ সম্পদের সঠিক ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি। ক্রমবর্ধমান নগরায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আজ অনেক সমভূমি অঞ্চল সংকটের মুখে, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে। তাই এই উর্বর ভূমির টেকসই রক্ষণাবেক্ষণ আমাদের সকলের দায়িত্ব। আশা করি, আজকের আলোচনার মাধ্যমে আপনারা সমভূমির বৈশিষ্ট্য, শ্রেণীবিভাগ এবং মানব জীবনে এর প্রভাব সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা লাভ করেছেন। ভূগোল বিষয়ক এরকম আরও তথ্যবহুল আর্টিকেলের জন্য আমাদের সাথেই থাকুন।মৌসুমি বায়ু কাকে বলে? ভারতের মৌসুমি জলবায়ু -র প্রভাব: Monsoon Climate.