নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও আজাদ হিন্দ ফৌজ: Netaji Subhas Chandra Bose and the Azad Hind Fauj.
ভূমিকা:
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও আজাদ হিন্দ ফৌজ এক অনন্য ও গৌরবময় অধ্যায়। Subhas Chandra Bose ছিলেন এমন এক বিপ্লবী নেতা যিনি বিশ্বাস করতেন যে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তি অর্জন সম্ভব। তাঁর নেতৃত্বে গঠিত Azad Hind Fauj বা ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (INA) ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে নতুন দিশা এনে দেয়। “তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব” – এই আহ্বান লক্ষ লক্ষ ভারতীয়কে স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগে অনুপ্রাণিত করেছিল। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বসবাসকারী ভারতীয়দের নিয়ে গঠিত এই বাহিনী ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ করে ভারতকে মুক্ত করার লক্ষ্য নিয়েছিল। তাই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে নেতাজি ও আজাদ হিন্দ ফৌজের অবদান চিরস্মরণীয় ও অনস্বীকার্য।
নেতাজির সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিল আজাদ হিন্দ ফৌজ বা ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (INA) পুনর্গঠন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে ভারতীয়রাও একটি সুশৃঙ্খল এবং আধুনিক সেনাবাহিনী তৈরি করতে সক্ষম, যা বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ব্রিটিশ বাহিনীর মুখোমুখি দাঁড়াতে পারে। ১৯৪৩ সালে তাঁর দেওয়া ‘দিল্লি চলো’ ডাক এবং “তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেবো” এই অমর বাণী আজও কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে দেশপ্রেমের মশাল হয়ে জ্বলে।
ব্রিটিশদের ভারত ত্যাগের পেছনে ১৯৪৬ সালের নৌ-বিদ্রোহ এবং আইএনএ-র প্রভাব ছিল অনস্বীকার্য। এই নিবন্ধে আমরা নেতাজির বাল্যকাল থেকে শুরু করে তাঁর রাজনৈতিক বিবর্তন, আজাদ হিন্দ ফৌজের বীরত্বগাথা এবং তাঁর রহস্যময় অন্তর্ধান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

সুভাষচন্দ্র বসুর জন্ম ও প্রাথমিক জীবন:
সুভাষচন্দ্র বসু ১৮৯৭ সালের ২৩শে জানুয়ারি বঙ্গ প্রদেশের উড়িষ্যা বিভাগের কটকে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা জানকীনাথ বসু ছিলেন একজন বিশিষ্ট আইনজীবী এবং মা প্রভাবতী দত্ত বসু।
- শিক্ষা ও জাতীয়তাবাদ: প্রাথমিক শিক্ষার পর তিনি কটকের রাভেনশ কলেজিয়েট স্কুলে যোগ দেন। এরপর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হলেও তাঁর জাতীয়তাবাদী কর্মকাণ্ডের কারণে সেখান থেকে বহিষ্কৃত হন। পরবর্তীতে তিনি স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে স্নাতক হন এবং উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যান।
- সিভিল সার্ভিস ত্যাগ: ১৯১৯ সালে তিনি ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসেস (ICS) পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান অধিকার করে উত্তীর্ণ হন। কিন্তু ব্রিটিশদের গোলামি করতে অস্বীকার করে তিনি এই লোভনীয় পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে ভারতে ফিরে আসেন।
রাজনৈতিক জীবন ও আধ্যাত্মিক প্রেরণা:
সুভাষচন্দ্র বসু স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষা দ্বারা অত্যন্ত প্রভাবিত ছিলেন এবং তাঁকে নিজের আধ্যাত্মিক গুরু মানতেন। রাজনৈতিক জীবনে তাঁর মেন্টর বা পরামর্শদাতা ছিলেন চিত্তরঞ্জন দাস।
- ফরোয়ার্ড পত্রিকা: ১৯২১ সালে তিনি সি.আর. দাসের ‘স্বরাজ পার্টি’ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ‘ফরোয়ার্ড’ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব নেন।
- কারাবাস ও ইউরোপ সফর: বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের জন্য ১৯২৫ সালে তাঁকে বার্মার মান্দালে কারাগারে পাঠানো হয়। ১৯৩০-এর দশকে ইউরোপে থাকাকালীন তিনি তাঁর বিখ্যাত বই “The Indian Struggle” রচনা করেন।
কংগ্রেসের সভাপতিত্ব ও গান্ধীর সাথে আদর্শিক সংঘাত:
১৯৩৮ সালে (হরিপুরা) তিনি কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৩৯ সালে (ত্রিপুরী) তিনি পুনরায় মহাত্মা গান্ধীর মনোনীত প্রার্থী পট্টভী সীতারাম্মায়াকে পরাজিত করে সভাপতি নির্বাচিত হন। তবে গান্ধীর অহিংস নীতির সাথে তাঁর সশস্ত্র লড়াইয়ের আদর্শিক সংঘাত তৈরি হওয়ায় তিনি পদত্যাগ করেন এবং কংগ্রেসের ভেতরেই ‘অল ইন্ডিয়া ফরওয়ার্ড ব্লক’ গঠন করেন।
আজাদ হিন্দ ফৌজের (INA) উত্থান ও বীরত্ব:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে নেতাজি একে সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখেন। তিনি গৃহবন্দী অবস্থা থেকে পালিয়ে বার্লিন হয়ে সিঙ্গাপুরে পৌঁছান। সেখানে তিনি রাসবিহারী বসুর থেকে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
আইএনএ-র প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- মুক্ত ভারত কেন্দ্র: বার্লিনে তিনি ভারতীয় যুদ্ধবন্দীদের নিয়ে ‘ইন্ডিয়ান লিজিয়ন’ তৈরি করেন।
- নারী বাহিনী: তিনি নারীদের জন্য ‘ঝাঁসির রানী রেজিমেন্ট’ গঠন করেন, যা সেই সময়ের জন্য ছিল এক বিপ্লবী পদক্ষেপ।
- অসাম্প্রদায়িক চেতনা: আইএনএ-তে হিন্দু, মুসলিম, শিখ সকল ধর্মের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিলেন।
- আজাদ হিন্দ রেডিও: ১৯৪৪ সালের ৬ই জুলাই এই রেডিও থেকেই তিনি মহাত্মা গান্ধীকে প্রথম ‘জাতির জনক’ বলে সম্বোধন করেন।
মৃত্যু রহস্য ও অমীমাংসিত সত্য:
অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৫ সালের ১৮ই আগস্ট তাইওয়ানে এক বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজি মারা যান। তবে এই মৃত্যু নিয়ে আজও অনেক বিতর্ক রয়েছে।
- ফিগেস ও শাহ নওয়াজ কমিটি: বিমান দুর্ঘটনার তত্ত্বকে সমর্থন করে।
- মুখার্জি কমিশন (২০০৫): এই কমিশন জানায় যে বিমান দুর্ঘটনার কোনো প্রমাণ নেই, তবে সরকার এই রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করে।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু কেবল একজন ব্যক্তি ছিলেন না, তিনি ছিলেন ভারতের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার এক জীবন্ত প্রতীক। তাঁর লড়াই কেবল ব্রিটিশদের তাড়ানোর জন্য ছিল না, বরং একটি বৈষম্যহীন এবং শক্তিশালী ভারত গড়ার স্বপ্ন ছিল তাঁর চোখে। আজাদ হিন্দ ফৌজের অভিযান হয়তো সামরিকভাবে পুরোপুরি সফল হয়নি, কিন্তু ব্রিটিশ ভারতের সেনাবাহিনীতে যে দেশপ্রেমের আগুন তা জ্বালিয়ে দিয়েছিল, তা দমন করার সাধ্য ব্রিটিশদের ছিল না।
১৯৪৬ সালের নৌ-বিদ্রোহ এবং আইএনএ-র বন্দীদের বিচারের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ প্রমাণ করেছিল যে ব্রিটিশদের বিদায় ঘণ্টা বেজে গেছে। নেতাজির আদর্শ, তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা এবং আত্মত্যাগ আজও প্রতিটি ভারতীয়র জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। যদিও তাঁর মৃত্যু আজও একটি অমীমাংসিত রহস্য, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া ‘জয় হিন্দ’ স্লোগান আজও ভারতের আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত হয়। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এবং আজাদ হিন্দ ফৌজ এক অম্লান অধ্যায় হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।