উদারনীতিবাদ কাকে বলে? | উদারনীতিবাদের সংজ্ঞা, রূপ, বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব: Liberalism.
ভূমিকা:
আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনের ইতিহাসে উদারনীতিবাদ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী মতবাদ। মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের স্বীকৃতির মধ্য দিয়েই এই মতবাদের বিকাশ ঘটেছে। মধ্যযুগীয় স্বৈরতন্ত্র, ধর্মীয় কর্তৃত্ববাদ ও রাজকীয় নিরঙ্কুশতার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবেই উদারনীতিবাদের উদ্ভব ঘটে। এই মতবাদ মানুষের ব্যক্তি-সত্তাকে রাষ্ট্রের চেয়ে অগ্রাধিকার দেয় এবং মনে করে যে ব্যক্তির স্বাধীন বিকাশের মাধ্যমেই সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব।
উদারনীতিবাদ শুধু একটি রাজনৈতিক মতবাদ নয়, বরং এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক দর্শনও বটে। আইনের শাসন, গণতন্ত্র, মৌলিক অধিকার, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির স্বীকৃতি—এই সবকিছুই উদারনীতিবাদের মূল আদর্শের অন্তর্ভুক্ত। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি নির্মাণে উদারনীতিবাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাই উদারনীতিবাদের ধারণা, বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা রাজনৈতিক বিজ্ঞান অধ্যয়নের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
উদারনীতিবাদ কাকে বলে?
উদারনীতিবাদ (Liberalism) আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মতবাদ। ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের শাসন, গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকারের ওপর জোর দেওয়াই এই মতবাদের প্রধান লক্ষ্য। ব্যক্তির স্বাধীন চিন্তা, বিশ্বাস ও মতপ্রকাশের অধিকারকে রক্ষা করাই উদারনীতিবাদের মূল দর্শন।
উদারনীতিবাদের সংজ্ঞা:
উদারনীতিবাদের ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো Liberalism। বুৎপত্তিগত অর্থে Liberalism শব্দটি এসেছে Liberty বা স্বাধীনতা শব্দ থেকে।
সাধারণভাবে বলা যায়—
সব ধরনের কর্তৃত্ববাদ ও স্বৈরতন্ত্রের বিরোধিতা করে, ব্যক্তিগত স্বাধীন চিন্তা, বিশ্বাস, মতপ্রকাশ এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকারকে মানবব্যক্তিত্ব বিকাশের প্রধান উপায় বলে যে রাজনৈতিক দর্শন সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে স্বাধীন মৌলিক নীতি প্রতিষ্ঠার কথা বলে— তাকেই উদারনীতিবাদ বলা হয়।
উদারনীতিবাদের মুখ্য প্রবক্তা:
উদারনীতিবাদের বিকাশে যাঁদের অবদান অনস্বীকার্য, তাঁরা হলেন—
- জেরেমি বেন্থাম (Jeremy Bentham).
- জন স্টুয়ার্ট মিল (J. S. Mill).
- টি. এইচ. গ্রিন (T. H. Green).
- হ্যারল্ড ল্যাস্কি (Harold Laski).
- রবার্ট ডাল (Robert Dahl).
উদারনীতিবাদের রূপ:
উদারনীতিবাদ একক ও অপরিবর্তনীয় কোনো মতবাদ নয়। সময়ের প্রয়োজনে ও সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উদারনীতিবাদ বিভিন্ন রূপে বিকশিত হয়েছে। মূলত উদারনীতিবাদকে তিনটি প্রধান রূপে ভাগ করা যায়—
সনাতন উদারনীতিবাদ (Classical Liberalism):
সনাতন উদারনীতিবাদের বিকাশ ঘটে অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকে ইউরোপে। এই মতবাদের মূল কথা হলো—রাষ্ট্রের ক্ষমতা সীমিত থাকবে এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা সর্বাধিক গুরুত্ব পাবে।
এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হল—
- ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব।
- রাষ্ট্রের ন্যূনতম হস্তক্ষেপ (Laissez-faire নীতি)।
- ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার স্বীকৃতি।
- অবাধ বাণিজ্য ও মুক্ত বাজার অর্থনীতির সমর্থন।
জন লক, অ্যাডাম স্মিথ ও জেরেমি বেন্থাম সনাতন উদারনীতিবাদের প্রধান প্রবক্তা ছিলেন।
নয়া উদারনীতিবাদ (Neo-Liberalism):
বিশ শতকের শেষভাগে উদ্ভূত নয়া উদারনীতিবাদ মূলত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উদারনীতিবাদের একটি আধুনিক রূপ। এই মতবাদে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে বাজারব্যবস্থাকে আরও মুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হল—
- বেসরকারিকরণ ও উদারীকরণ।
- বিশ্বায়নের সমর্থন।
- মুক্ত বাজার ও প্রতিযোগিতার প্রসার।
- কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা।
ফ্রিডরিখ হায়েক ও মিল্টন ফ্রিডম্যান নয়া উদারনীতিবাদের অন্যতম প্রবক্তা।
সংশোধনমূলক উদারনীতিবাদ (Welfare বা Reformist Liberalism):
সনাতন উদারনীতিবাদের সীমাবদ্ধতার প্রতিক্রিয়ায় সংশোধনমূলক উদারনীতিবাদের উদ্ভব ঘটে। এখানে কেবল ব্যক্তিস্বাধীনতাই নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হল—
- রাষ্ট্রের কল্যাণমূলক ভূমিকার স্বীকৃতি।
- অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাসের চেষ্টা।
- সামাজিক নিরাপত্তা ও ন্যূনতম জীবিকা নিশ্চিতকরণ।
- ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সামাজিক কল্যাণের সমন্বয়।
টি. এইচ. গ্রিন, হ্যারল্ড ল্যাস্কি প্রমুখ এই ধারার প্রবক্তা।
উদারনীতিবাদের মূল বৈশিষ্ট্য:
উদারনীতিবাদ এমন এক রাজনৈতিক দর্শন যা ব্যক্তিস্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করে। এই মতবাদের কতকগুলি মৌলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যেগুলি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি রচনা করেছে। উদারনীতিবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপ—
আইনের শাসন:
উদারনীতিবাদে আইনের শাসন (Rule of Law) সর্বাধিক গুরুত্ব পায়। এখানে আইন সকলের ঊর্ধ্বে— শাসক ও শাসিত উভয়েই আইনের দ্বারা সমানভাবে নিয়ন্ত্রিত। ব্যক্তির পৌর স্বাধীনতা রক্ষার জন্য আইনকে নিরপেক্ষ ও সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।
ব্যক্তিস্বাধীনতার স্বীকৃতি:
উদারনীতিবাদ ব্যক্তির স্বাধীন চিন্তা, মতপ্রকাশ, বিশ্বাস ও ধর্ম পালনের অধিকারকে অপরিহার্য বলে স্বীকার করে। ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে মানবিক বিকাশের প্রধান শর্ত হিসেবে গণ্য করা হয়। একই সঙ্গে সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার কথাও এখানে স্বীকৃত।
রাজনৈতিক সাম্য ও গণতন্ত্র:
উদারনীতিবাদ রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেয়। এই মতবাদ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে সমর্থন করে এবং জনগণের সম্মতি ও শাসিতের সম্মতির ভিত্তিতে সরকার গঠনের কথা বলে।
পৌর ও রাজনৈতিক অধিকারের স্বীকৃতি:
উদারনীতিবাদ নাগরিকদের মৌলিক পৌর অধিকার ও রাজনৈতিক অধিকার স্বীকার করে।
- পৌর অধিকার: জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, মতপ্রকাশ, ধর্ম পালনের অধিকার।
- রাজনৈতিক অধিকার: ভোটাধিকার, নির্বাচিত হওয়ার অধিকার।
সাংবিধানিক পদ্ধতিতে সরকারের পরিবর্তন:
এই মতবাদ বিপ্লব ও হিংসার পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ ও সাংবিধানিক পদ্ধতিতে, বিশেষত নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের নীতিকে সমর্থন করে।
স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা:
উদারনীতিবাদে বিচারব্যবস্থাকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ রাখা অপরিহার্য বলে মনে করা হয়। বিচারব্যবস্থা নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষার পাশাপাশি সংবিধানের ব্যাখ্যাকারী ও অভিভাবক হিসেবে কাজ করে।
প্রাপ্তবয়স্কের সর্বজনীন ভোটাধিকার:
জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, শিক্ষা বা সম্পদের ভেদাভেদ না করে সকল সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের ভোটাধিকার প্রদান উদারনীতিবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার:
উদারনীতিবাদ ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। মনে করা হয়, সম্পত্তির অধিকার ব্যক্তিকে কাজের উৎসাহ জোগায় এবং এর মাধ্যমে ব্যক্তিগত ও জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব হয়।
অবাধ বাণিজ্য ও মুক্ত বাজারনীতি:
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উদারনীতিবাদ অবাধ বাণিজ্য ও মুক্ত প্রতিযোগিতার নীতিকে সমর্থন করে। অ্যাডাম স্মিথের মতে, মুক্ত বাজার ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাজের সর্বাধিক কল্যাণ সাধিত হয়।
উদারনীতিবাদের সীমাবদ্ধতা:
যদিও উদারনীতিবাদ আধুনিক গণতন্ত্র, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মানবাধিকারের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, তবুও এই মতবাদের কিছু গুরুতর সীমাবদ্ধতা ও সমালোচনা রয়েছে। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে উদারনীতিবাদের সীমাবদ্ধতাগুলি নিচে আলোচনা করা হলো—
অর্থনৈতিক সাম্যের অভাব:
উদারনীতিবাদ মূলত রাজনৈতিক ও নাগরিক স্বাধীনতার ওপর জোর দিলেও অর্থনৈতিক সাম্যের প্রশ্নকে উপেক্ষা করেছে। এর ফলে সমাজে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ব্যবধান ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
একচেটিয়া পুঁজিবাদের প্রসার:
ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও অবাধ বাজারনীতির সমর্থনের কারণে উদারনীতিবাদ একচেটিয়া পুঁজিবাদ (Monopoly Capitalism) গড়ে ওঠার পথ সুগম করেছে। এতে ক্ষুদ্র ও দুর্বল শ্রেণি অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রাজনৈতিক সাম্য কার্যত অর্থহীন:
যদিও উদারনীতিবাদ প্রাপ্তবয়স্কের সর্বজনীন ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক সাম্যের কথা বলে, বাস্তবে অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে দরিদ্র শ্রেণির পক্ষে রাজনৈতিক ক্ষমতা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হয় না। ফলে রাজনৈতিক সাম্য অনেক ক্ষেত্রে কেবল তাত্ত্বিক হয়ে পড়ে।
সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণে ব্যর্থতা:
উদারনীতিবাদ সামাজিক ন্যায় ও শ্রেণিভিত্তিক বৈষম্য দূর করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেনি। জাতি, বর্ণ ও লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য অনেক সময় অটুট থেকে গেছে।
রাষ্ট্রের সীমিত ভূমিকার সমস্যা:
সনাতন উদারনীতিবাদ রাষ্ট্রের ভূমিকা সীমিত রাখতে চেয়েছে। এর ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকার অভাব দেখা যায়, যা সমাজকল্যাণের পরিপন্থী।
বাস্তব স্বাধীনতার অভাব:
উদারনীতিবাদ কেবল নেতিবাচক স্বাধীনতা (Negative Liberty) বা রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপহীনতাকে গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও বেকারত্বের কারণে বহু মানুষ বাস্তবে স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে না।
বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ:
অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী শ্রেণি অনেক সময় বিচারব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়। ফলে উদারনীতিবাদের ঘোষিত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা বাস্তবে সবসময় কার্যকর থাকে না।
কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণার অভাব:
সনাতন উদারনীতিবাদ কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি। এর ফলে দুর্বল ও বঞ্চিত শ্রেণির সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
উদারনীতিবাদের গুরুত্ব:
আধুনিক রাজনৈতিক দর্শন ও রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে উদারনীতিবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ। ব্যক্তিস্বাধীনতা, মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশে এই মতবাদের অবদান অনস্বীকার্য। সমাজ, রাষ্ট্র ও ব্যক্তিজীবনের নানা ক্ষেত্রে উদারনীতিবাদের গুরুত্ব নিচে আলোচনা করা হলো—
ব্যক্তিস্বাধীনতার বিকাশ:
উদারনীতিবাদ মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিশ্বাস ও ধর্মীয় স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এর ফলে ব্যক্তি নিজস্ব মত ও জীবনপথ স্বাধীনভাবে নির্ধারণ করার সুযোগ পেয়েছে।
মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকারের প্রতিষ্ঠা:
উদারনীতিবাদের মাধ্যমে জীবনের অধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা, সমতা ও ন্যায়বিচারের মতো মানবাধিকার ধারণা সুসংহত হয়েছে। আধুনিক সংবিধানগুলিতে মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্তির পেছনে এই মতবাদের বড় ভূমিকা রয়েছে।
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বিকাশ:
উদারনীতিবাদ গণতন্ত্রকে সমর্থন করে। জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে সরকার গঠন, প্রাপ্তবয়স্কের সর্বজনীন ভোটাধিকার এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের ধারণা উদারনীতিবাদ থেকেই শক্তিশালী হয়েছে।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা:
আইনের শাসন উদারনীতিবাদের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান। এর ফলে শাসক ও শাসিত সকলেই আইনের অধীন থাকে এবং স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অবসান ঘটে।
স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা:
উদারনীতিবাদ স্বাধীন বিচারব্যবস্থার ধারণা প্রদান করেছে। বিচারব্যবস্থা নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষায় এবং সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ধর্মীয় সহনশীলতা ও মানবতাবাদ
উদারনীতিবাদ ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও কুসংস্কারের বিরোধিতা করে। এটি ধর্মীয় সহনশীলতা, মানবতাবাদ ও যুক্তিবাদী চিন্তার প্রসার ঘটিয়েছে।
সামাজিক অগ্রগতি ও ব্যক্তিত্ব বিকাশ:
ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সমতার পরিবেশে মানুষের সৃজনশীলতা ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের সুযোগ তৈরি হয়, যা সমাজের সামগ্রিক অগ্রগতিতে সহায়ক।
আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি নির্মাণ:
আধুনিক সাংবিধানিক রাষ্ট্র, মৌলিক অধিকার, ক্ষমতার বিভাজন এবং দায়িত্বশীল সরকারের ধারণা উদারনীতিবাদের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
উপসংহার:
সার্বিক আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায় যে, উদারনীতিবাদ আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী মতবাদ। ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের শাসন, মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বিকাশে এই মতবাদের অবদান অনস্বীকার্য। মধ্যযুগীয় স্বৈরতন্ত্র ও কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবেই উদারনীতিবাদের উদ্ভব ঘটে এবং কালক্রমে এটি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক ভিত্তি রচনা করে।
তবে উদারনীতিবাদ প্রধানত রাজনৈতিক স্বাধীনতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করলেও অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। ধনী–দরিদ্র বৈষম্য, একচেটিয়া পুঁজিবাদের প্রসার এবং বাস্তব স্বাধীনতার অভাব এই মতবাদের দুর্বল দিক হিসেবে চিহ্নিত। এই সীমাবদ্ধতার ফলেই পরবর্তীকালে সংশোধনমূলক উদারনীতিবাদ ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণার বিকাশ ঘটে।
অতএব বলা যায়, কিছু ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তিস্বাধীনতা, মানবতাবাদ, ধর্মীয় সহনশীলতা ও গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠায় উদারনীতিবাদের গুরুত্ব অপরিসীম। আধুনিক রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থাকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হলে উদারনীতিবাদের ধারণা ও অবদান সম্পর্কে সচেতন হওয়া একান্ত প্রয়োজন।
উদারনীতিবাদ SAQ:
১) উদারনীতিবাদ কাকে বলে?
উত্তর: উদারনীতিবাদ হলো এমন একটি রাজনৈতিক মতবাদ যা ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের শাসন, মৌলিক অধিকার ও গণতন্ত্রের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করে এবং সব ধরনের কর্তৃত্ববাদের বিরোধিতা করে।
২) Liberalism শব্দটির অর্থ কী?
উত্তর: Liberalism শব্দটি Liberty বা স্বাধীনতা শব্দ থেকে এসেছে। এর মূল অর্থ হলো ব্যক্তির স্বাধীন চিন্তা, বিশ্বাস ও মতপ্রকাশের অধিকার।
৩) উদারনীতিবাদের প্রধান প্রবক্তা কারা?
উত্তর: জন স্টুয়ার্ট মিল, জেরেমি বেন্থাম, টি. এইচ. গ্রিন, হ্যারল্ড ল্যাস্কি ও রবার্ট ডাল উদারনীতিবাদের প্রধান প্রবক্তা।
৪) সনাতন উদারনীতিবাদ কী?
উত্তর: যে উদারনীতিবাদ রাষ্ট্রের ভূমিকা সীমিত রেখে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও অবাধ বাজারনীতিকে সমর্থন করে, তাকে সনাতন উদারনীতিবাদ বলা হয়।
৫) নয়া উদারনীতিবাদ বলতে কী বোঝো?
উত্তর: নয়া উদারনীতিবাদ হলো উদারনীতিবাদের আধুনিক রূপ, যেখানে বেসরকারিকরণ, বিশ্বায়ন ও মুক্ত বাজারনীতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
৬) সংশোধনমূলক উদারনীতিবাদ কী?
উত্তর: যে উদারনীতিবাদ ব্যক্তিস্বাধীনতার পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রের কল্যাণমূলক ভূমিকা স্বীকার করে, তাকে সংশোধনমূলক উদারনীতিবাদ বলা হয়।
৭) উদারনীতিবাদে আইনের শাসনের গুরুত্ব কী?
উত্তর: উদারনীতিবাদে আইন সকলের ঊর্ধ্বে। আইনের শাসন ব্যক্তিস্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার রক্ষার প্রধান উপায়।
৮) পৌর অধিকার কী?
উত্তর: নাগরিকদের জীবন, স্বাধীনতা, মতপ্রকাশ ও ধর্ম পালনের অধিকারকে পৌর অধিকার বলা হয়।
৯) রাজনৈতিক অধিকার কী?
উত্তর: নাগরিকদের ভোট দেওয়া ও নির্বাচিত হওয়ার অধিকারকে রাজনৈতিক অধিকার বলা হয়।
১০) উদারনীতিবাদের একটি সীমাবদ্ধতা লেখো।
উত্তর: উদারনীতিবাদ অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ, যার ফলে ধনী–দরিদ্র বৈষম্য বৃদ্ধি পায়।
উদারনীতিবাদ MCQ:
১) Liberalism শব্দটির মূল অর্থ কী?
(a) সাম্য
(b) কর্তৃত্ব
(c) স্বাধীনতা
(d) শাসন
উত্তর: (c) স্বাধীনতা
২) উদারনীতিবাদের প্রধান বিষয় কোনটি?
(a) রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতা
(b) ব্যক্তিস্বাধীনতা
(c) সমাজতন্ত্র
(d) সামরিক শাসন
উত্তর: (b) ব্যক্তিস্বাধীনতা
৩) সনাতন উদারনীতিবাদ কোন নীতিকে সমর্থন করে?
(a) রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি
(b) সমাজতন্ত্র
(c) অবাধ বাজারনীতি
(d) সাম্যবাদ
উত্তর: (c) অবাধ বাজারনীতি
৪) নয়া উদারনীতিবাদের সঙ্গে কোন ধারণাটি যুক্ত?
(a) রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ বৃদ্ধি
(b) বেসরকারিকরণ
(c) পরিকল্পিত অর্থনীতি
(d) সাম্যবাদ
উত্তর: (b) বেসরকারিকরণ
৫) উদারনীতিবাদ কোন শাসনব্যবস্থাকে সমর্থন করে?
(a) স্বৈরতন্ত্র
(b) সামরিক শাসন
(c) গণতন্ত্র
(d) রাজতন্ত্র
উত্তর: (c) গণতন্ত্র
৬) প্রাপ্তবয়স্কের সর্বজনীন ভোটাধিকার কোন মতবাদের বৈশিষ্ট্য?
(a) ফ্যাসিবাদ
(b) সাম্যবাদ
(c) উদারনীতিবাদ
(d) সামন্তবাদ
উত্তর: (c) উদারনীতিবাদ
৭) ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার কোন মতবাদে স্বীকৃত?
(a) উদারনীতিবাদ
(b) সাম্যবাদ
(c) নৈরাজ্যবাদ
(d) সামন্তবাদ
উত্তর: (a) উদারনীতিবাদ
৮) উদারনীতিবাদের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রবক্তা কে?
(a) কার্ল মার্কস
(b) লেনিন
(c) জন স্টুয়ার্ট মিল
(d) মাও সেতুং
উত্তর: (c) জন স্টুয়ার্ট মিল



Post Comment