ভারতের হাইকোর্ট: গঠন, নিয়োগ, ক্ষমতা ও কার্যপ্রণালী | High Court of India.

ভারতের হাইকোর্ট: গঠন, নিয়োগ, ক্ষমতা ও কার্যপ্রণালী | High Court of India.

ভারতের বিচারব্যবস্থায় হাইকোর্ট একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। সুপ্রীম কোর্টের পরই ভারতের সর্বোচ্চ আদালত হলো হাইকোর্ট, যা মূলত রাজ্য পর্যায়ে বিচারকার্য পরিচালনা করে। ভারতীয় সংবিধানের ধারা ২১৪ থেকে ২৩১ পর্যন্ত হাইকোর্টের সংগঠন, বিচারপতিদের যোগ্যতা, ক্ষমতা, বদলি, পদচ্যুতি ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিত বিধান দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে ভারতের ২৮টি রাজ্য ও ৮টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের জন্য ২৫টি হাইকোর্ট কার্যরত রয়েছে। সপ্তম সংবিধান সংশোধনী (১৯৫৬) অনুযায়ী দুটি বা ততোধিক রাজ্যের জন্য একটি হাইকোর্ট গঠন করা যায়।

Table of Contents

হাইকোর্টের গঠন (Composition of High Court).

সংবিধানের ২১৬ নং ধারা অনুযায়ী—

  • প্রত্যেক হাইকোর্টে একজন প্রধান বিচারপতি (Chief Justice) এবং
  • রাষ্ট্রপতির প্রয়োজনে নিয়োজিত অন্যান্য বিচারপতি (Judges) থাকবেন।

কার্যনির্বাহী প্রধান বিচারপতি (Acting Chief Justice) – 223 ধারা:

প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হলে বা তিনি অনুপস্থিত থাকলে—

  • সংশ্লিষ্ট হাইকোর্টের বিচারপতিদের মধ্য থেকে রাষ্ট্রপতি একজনকে
    Acting Chief Justice হিসেবে নিয়োগ করেন।

অতিরিক্ত বিচারপতি (Additional Judges) – 224 ধারা:

যখন—

  • মামলার সংখ্যা হঠাৎ বৃদ্ধি পায়, অথবা
  • দীর্ঘদিন বিচার বকেয়া পড়ে থাকে

তখন রাষ্ট্রপতি সর্বোচ্চ দুই বছরের জন্য অতিরিক্ত বিচারপতি নিয়োগ করতে পারেন।

হাইকোর্টের বিচারপতিদের নিয়োগ (Appointment of High Court Judges) – 217 ধারা:

হাইকোর্টের বিচারপতি নিয়োগ করেন রাষ্ট্রপতি। তবে রাষ্ট্রপতির এই নিয়োগ প্রক্রিয়া পরামর্শ নির্ভর—

প্রধান বিচারপতির নিয়োগের ক্ষেত্রে পরামর্শ করতে হয়:

  1. সংশ্লিষ্ট রাজ্যের রাজ্যপাল
  2. সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি

অন্যান্য বিচারপতির নিয়োগে অতিরিক্ত পরামর্শ:

  • সংশ্লিষ্ট হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি

Collegium System:

১৯৯৩ সালের বিচার বিভাগীয় রায় অনুযায়ী—

  • সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কলেজিয়াম
    বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করে।
  • রাষ্ট্রপতি কলেজিয়ামের পরামর্শ অমান্য করতে পারেন না।

হাইকোর্টের বিচারপতিদের যোগ্যতা (Eligibility of Judges).

সংবিধান অনুযায়ী হাইকোর্টের বিচারপতি হতে হলে—

  1. ভারতের নাগরিক হতে হবে।
  2. কোনো হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট হিসেবে অন্তত ১০ বছর অভিজ্ঞতা,
    অথবা
  3. বিচার বিভাগীয় পদে ১০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক।
  4. অ্যাডভোকেট ও বিচারবিভাগীয় পদের অভিজ্ঞতা মিলিয়েও দশ বছর গণ্য করা যায়।

হাইকোর্ট বিচারপতিদের কার্যকাল (Tenure of Judges).

  • হাইকোর্টের বিচারপতিরা ৬২ বছর বয়স পর্যন্ত পদে আসীন থাকেন
  • অবসর গ্রহণের পর হাইকোর্টের বিচারপতিরা সুপ্রীম কোর্ট বা অন্যান্য হাইকোর্টে ওকালতি করতে পারেন না (২২০ ধারা)
  • সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতিরা অবসর পরবর্তী কোনো আদালতে ওকালতি করতে পারেন না

বেতন কাঠামো:

  • প্রধান বিচারপতি: ₹2,50,000
  • অন্যান্য বিচারপতি: ₹2,25,000
    বেতন প্রদান করা হয় Consolidated Fund of the State থেকে।

হাইকোর্টের ক্ষমতা (Powers of High Court).

হাইকোর্টের ক্ষমতা মূলত চার ভাগে ভাগ করা যায়—

মূল এখতিয়ার (Original Jurisdiction).

  • রাজ্যের মধ্যে সংবিধানগত বিষয়
  • বিবাদপূর্ণ নির্বাচন মামলার শুনানি
  • বিশিষ্ট দেওয়ানি মামলা

আপীল এখতিয়ার (Appellate Jurisdiction).

হাইকোর্ট অধস্তন আদালতগুলির বিরুদ্ধে—

  • দেওয়ানি মামলা
  • ফৌজদারি মামলা
  • প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের রায়

—এসবের আপিল শুনানি করে।

রিট জারি করার ক্ষমতা – 226 ধারা:

সুপ্রীম কোর্টের মতো হাইকোর্টও নাগরিক অধিকার রক্ষার জন্য Writ জারি করতে পারে—

  • হেবিয়াস কর্পাস
  • ম্যান্ডামাস
  • প্রোহিবিশন
  • কো–ওয়ারেন্টো
  • সার্টিওরারি

হাইকোর্টের রিট ক্ষমতা সুপ্রীম কোর্টের তুলনায় বিস্তৃত, কারণ এটি মৌলিক অধিকার ছাড়াও অন্যান্য অধিকার সংরক্ষণে রিট জারি করতে পারে।

অভিলেখ আদালত (Court of Record) – 215 ধারা:

হাইকোর্ট—

  • গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তকে রেকর্ড হিসেবে সংরক্ষণ করে
  • আদালত অবমাননার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে

হাইকোর্টের বিচারপতিদের বদলি (Transfer of Judges) – 222 ধারা:

সংবিধান অনুযায়ী—

  • রাষ্ট্রপতি বিচারপতিদের এক হাইকোর্ট থেকে অন্য হাইকোর্টে বদলি করতে পারেন
  • ১৯৯৩ সালের রায় অনুযায়ী, এই বদলি হবে সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতির পরামর্শক্রমে
  • প্রধান বিচারপতির মতামত চূড়ান্ত

এটি কলেজিয়াম সিস্টেমকেও শক্তিশালী করেছে।

হাইকোর্টের বিচারপতিদের অপসারণ (Removal/Impeachment).

হাইকোর্টের বিচারপতিকে অপসারণ করা যায়—

  • সংসদের উভয় কক্ষে ২/৩ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে
  • রাষ্ট্রপতি ওই বিচারপতিকে পদচ্যুত করতে পারেন

অপসারণের কারণ:

  • প্রমাণিত অসদাচরণ
  • অক্ষমতা

এটি একটি অত্যন্ত কঠোর ও দীর্ঘ প্রক্রিয়া, যাতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বজায় থাকে।

ভারতের হাইকোর্টের সংখ্যা:

বিভাগসংখ্যা
রাজ্য২৮
কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল
হাইকোর্ট২৫

অনেক রাজ্য একই হাইকোর্ট শেয়ার করে, যেমন—

  • পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্ট
  • গৌহাটি হাইকোর্ট উত্তর–পূর্বাঞ্চলের একাধিক রাজ্যের জন্য প্রতিষ্ঠিত

উপসংহার:

ভারতের বিচারব্যবস্থায় হাইকোর্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, যা রাজ্যস্তরে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন রক্ষা এবং নাগরিক অধিকার সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সংবিধানের ধারাগুলো হাইকোর্টকে এমনভাবে নির্মিত করেছে যাতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা বজায় থাকে। বিচারপতি নিয়োগ, বদলি, ক্ষমতা এবং অপসারণের সুস্পষ্ট বিধান হাইকোর্টের মর্যাদা ও দায়িত্বকে আরও দৃঢ় করে।

সর্বোপরি, হাইকোর্ট ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর অপরিহার্য অংশ—যা সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচারের শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে।

GKpathya.in হল সাধারণ জ্ঞান, সমসাময়িক বিষয় ও পরীক্ষামুখী তথ্যের ভাণ্ডার। আমি সুকান্ত দাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে এম.এ এবং পেশায় শিক্ষক। এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ও শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে সহায়তা করার জন্য সহজ ও নির্ভরযোগ্য কনটেন্ট শেয়ার করি।

error: Content is protected !!